পারস্য উপসাগর এবং খার্গ দ্বীপের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিশাল কালো তেলের স্তর দেখা যাচ্ছে।অপরিশোধিত তেল ইরানের সমুদ্রেই ফেলে দিল শিপিং সংস্থা। স্যাটেলাইট ছবি বলছে, পারস্য উপসাগর এবং খার্গ দ্বীপের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিশাল কালো তেলের স্তর দেখা যাচ্ছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই ঘটনায় শুধু ইরানের অর্থনীতি জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জ্বালানি বাজার এবং সামুদ্রিক পরিবেশও বিপদের মুখে পড়েছে।
বর্তমানে ইরান প্রতিদিন ৩০ লক্ষ ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। এই তেলের বড় অংশ রফতানি করা হয় খার্গ দ্বীপের প্রধান টার্মিনাল থেকে। কিন্তু হরমুজ প্রণালী এবং ইরানি বন্দর ঘিরে আমেরিকার কড়া নজরদারি ও নৌ অবরোধের কারণে তেলবাহী ট্যাঙ্কার সহজে বেরোতে পারছে না। ফলে উৎপাদন চললেও বিদেশে তেল বিক্রি কার্যত ব্যাহত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেল উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ করাও ইরানের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ সময় তেল কূপ বন্ধ থাকলে ভূগর্ভস্থ তেলস্তরে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। পাইপলাইনে সমস্যা তৈরি হতে পারে এবং পরে উৎপাদন ফের শুরু করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেই কারণেই উৎপাদন চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে তেহরান। কিন্তু উৎপাদিত তেল রাখার জায়গা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রথমে খার্গ দ্বীপের স্থলভাগের স্টোরেজ ট্যাঙ্কগুলি পূর্ণ হয়ে যায়। পরে পুরনো তেলবাহী জাহাজকে ভাসমান স্টোরেজ হিসেবে ব্যবহার শুরু করে ইরান। তবুও অতিরিক্ত তেল জমতে থাকায় নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে। ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির সেন্টিনেল স্যাটেলাইট এবং একাধিক আন্তর্জাতিক রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, পারস্য উপসাগরের জলে বড় বড় তেলের স্তর ভাসছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫ মার্চ কুয়েত উপকূলের কাছে, ১০ এপ্রিল লাভান দ্বীপের আশপাশে, ২২ এপ্রিল কেশম দ্বীপের কাছে এবং ৬ মে খার্গ দ্বীপের পশ্চিমে সমুদ্রে বিশাল তেলের দাগ দেখা যায়। খার্গ দ্বীপের কাছে দেখা যাওয়া একটি তেলের স্তর প্রায় ১২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা রাডার ডেটা বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, সমুদ্রের উপর ভাসমান তেল ঢেউয়ের স্বাভাবিক গতি কমিয়ে দেয়। ফলে স্যাটেলাইট ছবিতে কালো ও মসৃণ অংশ হিসেবে তা ধরা পড়ে।
তবে শুধুমাত্র স্যাটেলাইট ছবির উপর ভিত্তি করে নিশ্চিত ভাবে বলা যাচ্ছে না যে, ওই কালো স্তর সম্পূর্ণ তেলই। কখনও কখনও শৈবাল, পলি বা সূর্যের আলোর প্রতিফলন থেকেও এমন ছবি তৈরি হতে পারে। তবুও তেল পরিবহণের গুরুত্বপূর্ণ রুট এবং ইরানের প্রধান তেল টার্মিনালের কাছাকাছি এই ধরনের দাগ দেখা যাওয়ায় সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, যদি সত্যিই সমুদ্রে তেল ফেলা হয়ে থাকে, তাহলে তা ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। পারস্য উপসাগরের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, মৎস্যজীবী এবং প্রবাল প্রাচীরের উপর এর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই ওমানের ধোফার উপকূলে বিপুল পরিমাণ মৃত চিংড়ি ভেসে আসার খবর সামনে এসেছে। যদিও বিজ্ঞানীরা অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া এবং সমুদ্রস্রোতের পরিবর্তনকে এর কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন, তবুও দূষণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব ভারত-সহ গোটা বিশ্বের উপর পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। কারণ বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। ফলে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে জ্বালানি, পরিবহণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের উপরও।
এদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ইরান এখনও গোপনে তেল বিক্রির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের কাছে সমুদ্রে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের ঘটনাও সামনে এসেছে। অনুমান, সেই তেলের বড় অংশ চিনে পৌঁছেছে। তবে আমেরিকার লাগাতার অবরোধের কারণে ইরানের উপর চাপ আরও বাড়ছে বলেই মনে করা হচ্ছে।