
আব্বাস আরাঘাচি ও ডোনাল্ড ট্রাম্পইরান যুদ্ধ অবশেষে থামছে। যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ করার পক্ষে তেহরানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হোয়াইট হাউসের কর্তাব্যক্তিরা সরব হয়েছেন। ট্রাম্পের কথায়, 'ফের দুই পক্ষ থেকেই তেল বইবে, গোটা বিশ্ব তেল পাবে।' কিন্তু ট্রাম্পের এই ইতিবাচক ঘোষণার পরেও ঠিক কী চুক্তি হল, তা এখনও কিন্তু খুব একটা স্পষ্ট নয়। ইরান ও আমেরিকার মউ (MoU) এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে হরমুজ প্রণালীতে নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচল, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও লেবানন, মূলত যে বিষয়গুলি এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ইস্যু, সেই ব্যাপারে কী চুক্তি হল, তা এখনও স্পষ্ট জানা যায়নি। শুধুমাত্র ট্রাম্প ঘোষণা করলেন, চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে ও হরমুজে তেলভর্তি জাহাজের অবাধ যাতায়াত ফের শুরু হচ্ছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস-কে ট্রাম্প জানিয়েছেন, যদি ইরান পরমাণু চুক্তি না মানে, তাহলে ফের তেহরানে হামলা শুরু করা হবে। বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক, ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ করার যে চুক্তি, তার খুঁটিনাটি, কী জানা গিয়েছে, কী জানা যায়নি।
হরমুজ প্রণালী
রবিবার সন্ধ্যায় হরমুজ প্রণালী নিয়ে মুখ খোলেন ট্রাম্প। তিনি ঘোষণা করেন, 'আমি এই মর্মে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণভাবে টোলমুক্ত ও উন্মুক্ত করার অনুমোদন দিচ্ছি। একই সঙ্গে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবরোধ অবিলম্বে তুলে নেওয়ারও নির্দেশ দিচ্ছি। বিশ্বের সব জাহাজ, আপনারা ইঞ্জিন চালু করুন। তেল প্রবাহিত হতে দিন!' তার একঘণ্টা পরে ট্রাম্প জানান, বিশ্বের মোট তেল পরিবহণের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে হয়, সেই হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়টি শুক্রবার স্বাক্ষরিত হতে চলা একটি চুক্তির উপর নির্ভর করছে। তাঁর কথায়, প্রণালীটি আপাতত মাইন অপসারণের উদ্দেশ্যে খুলে দেওয়া হবে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শান্তি চুক্তির মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ তাঁর প্রথম ঘোষণায় হরমুজ প্রণালীর প্রসঙ্গ একবারও উল্লেখ করেননি। অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘মেহর’-এর দাবি, দুই পক্ষের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক (MoU) হয়েছে, তাতে ‘ইরানের তত্ত্বাবধানে’ আগামী ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার কথা বলা হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই স্পষ্ট করে আসছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের উপর কোনও ধরনের টোল বা ফি আরোপের ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে ওমানের সঙ্গে এ ধরনের কোনও আলোচনা হয়ে থাকলে, তাতেও আপত্তি রয়েছে ওয়াশিংটনের। মার্কিন প্রেসিডেন্টও গত মাসে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালী সবার জন্য খোলা থাকবে। এর নিয়ন্ত্রণ কোনও একক পক্ষের হাতে থাকবে না। অন্যদিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালির নেতারাও দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে স্পষ্ট করেছেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু হলে তা অবশ্যই নিঃশর্ত হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
তবে পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তা সত্ত্বেও এই খবর প্রকাশ্যে আসার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত কমে যায়। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেলের দাম যে উচ্চতায় পৌঁছেছিল, তা নেমে এসে মার্চ মাসের শুরুর দামের কাছাকাছি চলে যায়।
যদিও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস, এমনকী কয়েক বছরও লাগতে পারে। কারণ তেল ও গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র পুনরায় চালু করা অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। উপরন্তু, ড্রোন হামলায় ওই অঞ্চলের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া আরেকটি বড় প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থা এবং বিমা কোম্পানিগুলি আদৌ হরমুজ প্রণালীকে পর্যাপ্ত নিরাপদ বলে মনে করবে কি না। সেই আস্থা ফিরে না এলে প্রণালী খুললেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে।

লেবানন
ইরান যুদ্ধের আরও একটি বড় ইস্যু হল লেবানন। ইরানের ডেপুটি বিদেশ মন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি রবিবার চুক্তির ঘোষণার পরে বলেন, 'লেবানন-সহ সমস্ত যুদ্ধক্ষেত্রে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ঘোষণা করা হয়েছে।' এই চুক্তির মধ্যস্থতাকারী পাক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টে দাবি করেন, 'লেবানন-সহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই পক্ষ।'
এই পরিস্থিতি ইজরায়েলের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে। কারণ, ইরান সংক্রান্ত শান্তি আলোচনায় ইজরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং চুক্তির খবর প্রকাশ্যে আসার পরও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নিজেরও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে, যার জন্য তিনি ইরান ও তার বন্ধু গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে সংঘাত চালিয়ে যেতে আগ্রহী। এর মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ-ও রয়েছে। ফলে ইজরায়েলের নতুন কোনও সামরিক পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাকে ভেস্তে দিতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর আগে রবিবার ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি ঘোষণা করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ইজরায়েলের এক হামলায় সেই পরিকল্পনা ব্যাহত হয়। বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠে চালানো ওই হামলায় একটি বহুতল ভবন ধ্বংস হয়ে যায়। এতে তিনজন নিহত এবং ছয়জন আহত হন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, ওই হামলার কারণে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া 'কয়েক ঘণ্টার জন্য পিছিয়ে যায়'।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও নেতানিয়াহুর মধ্যে লেবাননে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে বারবার মতবিরোধ দেখা গিয়েছে। যদিও লেবাননকে ঘিরে একটি পৃথক যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর ছিল, তবুও ইজরায়েল সেখানে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছিল। জানা গিয়েছে, দু’সপ্তাহ আগে বৈরুতে এক হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। সাম্প্রতিক বেইরুটে হামলার পরও তিনি নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা নিয়ে কঠোর অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
ইরানের পরমাণু প্রকল্প
ইরান আদৌ পরমাণু অস্ত্র বানাচ্ছে কিনা, তার কোনও প্রমাণ এখনও মেলেনি। কিন্তু ইরান, ইজরায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধের অন্যতম মূল কারণই হল, ইরানের পরমাণু অস্ত্র প্রকল্প। যা সম্ভাব্য পর্যায়েই রয়েছে এখনও। রবিবারও মার্কিন প্রেসিডেন্ট হুঁশিয়ারি দেন, ইরান কখনও পরমাণু অস্ত্র বানাবে না। যদি পরমাণু যুক্তি না মানে তেহরান, তাহলে ফের হামলা চালাবে আমেরিকা। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালিকে নিয়ে গঠিত E4 গোষ্ঠীও এক যৌথ বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানায়। তারা জানায়, ইরান যদি তার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে স্পষ্ট এবং যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে তার প্রতিক্রিয়ায় আমরা সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞাগুলি প্রত্যাহার করতে প্রস্তুত।
অন্যদিকে, ইরান বরাবরই দাবি করে এসেছে যে তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। এছাড়া, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগ করার ব্যাপারে তেহরান এখনও প্রকাশ্যে কোনও প্রতিশ্রুতি দেয়নি। মনে করা হয়, এই ইউরেনিয়ামের একটি বড় অংশ তিনটি পরমাণু চুল্লির নীচে সংরক্ষিত রয়েছে, যেগুলি গত বছর মার্কিন হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।