ক্যালিফোর্নিয়ার পেট্রলের দাম বাড়লIndia Fuel Price Hike: বিশ্বায়নের যুগে ভূ-রাজনীতি যে কতটা জটিল, তা আরও একবার হাতেনাতে প্রমাণিত হলো। ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীর (Strait of Hormuz) সাম্প্রতিক চরম উত্তেজনা বিশ্বজুড়ে এমন এক নজিরবিহীন জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে, যার একপ্রান্তে রয়েছে ভারতের হেঁশেল আর অন্যপ্রান্তে আমেরিকার বিলাসবহুল জীবনযাত্রা। আপাতদৃষ্টিতে এই ঘটনাগুলির মধ্যে কোনো মিল নেই মনে হলেও, নেপথ্যের অর্থনৈতিক সমীকরণটি রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে এই রুট দিয়ে তেল ও এলপিজি (LPG) সরবরাহ মারাত্মকভাবে ধাক্কা খেয়েছে। সমস্যা হলো, ভারত তার রান্নার গ্যাসের চাহিদার সিংহভাগই আমদানি করে উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে। ফলে এই সংকটে স্বাভাবিকভাবেই টান পড়েছে দেশের এলপিজি ভাণ্ডারে। পরিস্থিতির সামাল দিতে ভারতীয় শোধনাগার বা রিফাইনারিগুলি তড়িঘড়ি পেট্রোলিয়ামজাত অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন কমিয়ে রান্নার গ্যাস বা এলপিজি তৈরিতে বাড়তি জোর দিতে বাধ্য হয়। আর ঠিক এখানেই লুকিয়ে রয়েছে আসল টুইস্ট।
ভারতীয় রিফাইনারিগুলি রান্নার গ্যাস উৎপাদনে অগ্রাধিকার দেওয়ায় আচমকাই কমে যায় ‘অ্যালকাইলেট’ (Alkylate) নামক একটি বিশেষ ফুয়েল অ্যাডিটিভের উৎপাদন। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া প্রদেশে দূষণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম অত্যন্ত কড়া। সেখানকার বাতাসে বিষ ছড়ানো রুখতে পেট্রোলে এই পরিবেশবান্ধব ‘অ্যালকাইলেট’ মেশানো বাধ্যতামূলক। ক্যালিফোর্নিয়ার এই বিশেষ জ্বালানি মিশ্রণের জন্য এশিয়ার, বিশেষ করে ভারতের রিফাইনারিগুলির ওপর চাতক পাখির মতো ভরসা করে থাকতে হয় মার্কিন প্রশাসনকে। ভারত থেকে অ্যালকাইলেট সরবরাহ কমতেই ক্যালিফোর্নিয়ার বাজারে পেট্রোলের হাহাকার শুরু হয়ে গেছে। ফলে সেখানে পেট্রোলের দাম হুহু করে বেড়ে প্রতি গ্যালনে ৬ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। সামনেই গরমের ছুটি তথা ‘সামার ড্রাইভিং সিজন’, ফলে মার্কিন মুলুকে জ্বালানির দাম আরও আকাশছোঁয়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব যে এক ভয়ঙ্কর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের (Global Energy Crisis) দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ভারতে ইতিমধ্যেই তরল গ্যাসের দাম একলাফে অনেকটা বেড়েছে, বহু জায়গায় বুকিং করার পরও রান্নার গ্যাস পেতে চরম দেরি হচ্ছে। আমজনতার পকেটে কোপ মেরে দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের দামও লিটার প্রতি ৩ টাকা করে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আসলে ভারতের এলপিজি আমদানির প্রায় পুরো অংশটাই আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে। পরিস্থিতি কতটা জটিল তা বোঝা যায় একটি খবরে। হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়া ২০টি ভারতীয় ট্যাঙ্কারকে সুরক্ষিতভাবে বের করে আনার জন্য নয়াদিল্লিকে খোদ ইরানের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা চালাতে হয়েছে।
যদিও উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে ময়দানে নেমেছেন কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী। তিনি জানিয়েছেন, আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ভারতের কাছে বর্তমানে ৬৯ দিনের অপরিশোধিত তেল (Crude Stock) এবং ৪৫ দিনের এলপিজি মজুত রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক যুদ্ধ কীভাবে ভারতের রিফাইনারির উৎপাদন বদলে দিয়ে সুদূর আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় পেট্রোলের দাম বাড়িয়ে দিল। এই ‘বাটারফ্লাই এফেক্ট’ দেখে চোখ কপালে উঠেছে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের।