জাফর পানাহি।-ফাইল ছবিইরানের উপর সাম্প্রতিক হামলা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাড়তে থাকা অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আবার আলোচনায় উঠে এসেছে এক নাম, জাফর পানাহি। তিনি শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা নন; বরং শিল্পের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক প্রতিবাদী কণ্ঠ। 'স্বৈরশাসকের মৃত্যু' স্লোগান তুলে তিনি প্রকাশ্যেই ইরানের শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তিনি এমন সব চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, যা ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।
ক্ষমতার সঙ্গে সংঘাতের শুরু
জাফর পানাহি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের সরকারি নীতির সমালোচক। ২০০৯ সালের নির্বাচনী বিক্ষোভের পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১০ সালে ইরানের একটি আদালত তাঁর উপর ২০ বছরের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ, সাক্ষাৎকার দেওয়া এবং দেশ ত্যাগের নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
কিন্তু তিনি নীরব থাকেননি। সেন্সরশিপ যখন চরমে, ভিন্নমতকে যখন রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছিল, তখন নিজের বাড়িকেই তিনি স্টুডিও বানান। ২০১১ সালে নির্মাণ করেন 'দিস ইজ নট এ ফিল্ম', যে ছবি পেন ড্রাইভে করে গোপনে দেশ থেকে বাইরে পাঠানো হয় এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। ছবিটি শুধু একটি সৃজনশীল কাজ নয়, বরং প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
ক্যামেরার আড়ালে প্রতিবাদ
২০১৫ সালে নির্মিত 'ট্যাক্সি' ছবিতে পানাহি নিজেই ট্যাক্সিচালকের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ট্যাক্সির যাত্রীদের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে সমাজের নানা স্তরের বাস্তবতা, ভয়, দমননীতি, এবং সাধারণ মানুষের নীরব ক্ষোভ।
পরবর্তী সময়ে 'থ্রি ফেসেস' এবং 'নো বিয়ারস'-এর মতো ছবিতেও তিনি তুলে ধরেছেন ক্ষমতার চাপ, সামাজিক শ্বাসরোধ এবং শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশ্ন। তাঁর সিনেমা বারবার জানতে চেয়েছে, একজন শিল্পীকে কি আদৌ স্তব্ধ করা যায়? ক্যামেরা বন্ধ করলেই কি সত্য থেমে যায়?
উত্তপ্ত ইরান ও বদলে যাওয়া পরিবেশ
সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা ও হামলার জেরে ইরানের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও কঠোর হয়েছে। বিরোধী কণ্ঠের উপর নজরদারি ও চাপ বেড়েছে বলেই খবর। এমন পরিস্থিতিতে পানাহির মতো শিল্পীর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
তাঁর ছবির অস্বস্তি, দমবন্ধ করা আবহ এবং অন্তর্লীন ভয় আসলে সমকালীন ইরানের প্রতিচ্ছবি। বাইরের আক্রমণের সময় ভিন্নমতকে প্রায়শই “জাতীয়তাবিরোধী” বলে দমন করা হয়। কিন্তু পানাহির বিশ্বাস, দেশপ্রেম মানে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
দেশে নিষেধাজ্ঞা, বিশ্বে সম্মান
ইরানে নিষিদ্ধ হলেও আন্তর্জাতিক মহলে তিনি সম্মানিত। কান, বার্লিন ও ভেনিসের মতো চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর কাজ প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্ব সিনেমায় তিনি হয়ে উঠেছেন প্রতিরোধের এক প্রতীক। তবু নিজের দেশে তাঁকে কারাবাস ও নজরবন্দির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
আজ, যখন ইরান রাজনৈতিক ও সামরিক চাপে আবদ্ধ, জাফর পানাহির গল্প কেবল একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার কাহিনি নয়। এটি শিল্প ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ইতিহাস। ক্ষেপণাস্ত্র সীমান্ত ভাঙতে পারে, কিন্তু ক্যামেরা ভাঙে চিন্তার প্রাচীর। সম্ভবত সেই কারণেই, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তৈরি তাঁর চলচ্চিত্রগুলো আজও শাসকদের জন্য অস্বস্তির কারণ। আর বিশ্ববাসীর কাছে স্বাধীন কণ্ঠের এক অনন্য দলিল।