
এক সময় জাপানে মসজিদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪টি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংখ্যা বেড়ে এখন প্রায় ১৫০-এ পৌঁছেছে। মাত্র এক দশকের কিছু বেশি সময়ে মুসলিম জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি এবং মসজিদ নির্মাণের এই প্রবণতা ঘিরে দেশে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও আলোড়ন।
সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের সময়ই এই বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসে। বিভিন্ন জায়গায় প্রস্তাবিত মসজিদ ও মুসলিম কবরস্থানের বিরুদ্ধে সরব হন অনেক স্থানীয় বাসিন্দা। ফলে ধীরে ধীরে জাপানজুড়ে মুসলিম-বিরোধী মনোভাবের এক প্রবল স্রোত তৈরি হয়েছে। নতুন সরকারও অভিবাসী ও বিদেশিদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কঠোর নীতি নেওয়ায় এই বিতর্ক আরও উসকে উঠেছে।
বিশেষ করে ইয়োকোহামাতে একটি প্রস্তাবিত মসজিদকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা হয়। কেউ কেউ এই বিরোধিতাকে বিদেশি বিদ্বেষ হিসেবে দেখছেন, আবার অন্য অংশের মতে এটি স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষার প্রশ্ন।
এমন ঘটনাও সামনে এসেছে, যেখানে রাজনৈতিক নেতারা সরাসরি মসজিদ নির্মাণ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। ফুজিসাওয়াতে প্রস্তাবিত একটি মসজিদ ঘিরে বড়সড় বিতর্ক তৈরি হয়। যদিও কিছু রাজনৈতিক দল ও নাগরিক এর বিরোধিতা করেছেন, তবু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এর বিপক্ষে মত দিয়েছেন।
শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, দৈনন্দিন জীবনেও এই প্রভাব পড়ছে। কিতাকিউশু-তে স্কুলে হালাল খাবার চালু করা নিয়ে বিতর্ক ছড়ায়। এর জেরে বহু অভিযোগ জমা পড়ে এবং বিক্ষোভও হয়। অন্যদিকে, ইবারাকি-র কিছু এলাকায় মুসলিম শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে হালাল খাবার চালু করা হয়েছে, যা আবার সহাবস্থানের একটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরে।
পরিসংখ্যান বলছে, পরিবর্তনটা যথেষ্ট বড়। বিশেষজ্ঞ হিরোফুমি তানাদা-র অনুমান অনুযায়ী, ২০১০ সালে জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১,১০,০০০। ২০২৪ সালের শুরুতে তা বেড়ে প্রায় ৩,৫০,০০০-এ পৌঁছেছে, অর্থাৎ তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি। এর মধ্যে প্রায় ৫৪,০০০ জাপানি নাগরিক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
এই পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে জাপানের হ্রাসমান জন্মহার এবং বাড়তে থাকা বিদেশি শ্রমশক্তির উপর নির্ভরতা। কিন্তু একই সঙ্গে এই পরিবর্তন স্থানীয়দের একাংশের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও সাংস্কৃতিক উদ্বেগও বাড়াচ্ছে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এই বিতর্ককে বাড়িয়ে তুলেছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি অভিবাসন ও বিদেশিদের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নীতির পক্ষে সওয়াল করছেন। স্থায়ী বসবাস, নাগরিকত্ব এবং সামাজিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম আরও কড়া করার পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মসজিদ নির্মাণের প্রশ্নটি এখন শুধু ধর্মীয় নয়, এটি সমাজ, রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক জটিল আলোচনায় পরিণত হয়েছে।