মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদ - এএফপি ফাইল ছবিমক্কায় একে অপরকে চুমু খাওয়ার অপরাধে দুই বাংলাদেশি নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে সৌদি আরব। নজরুল ইসলাম আব্দুল বসির ও সুইটি আখতারের পরিবার তো দূর, বাংলাদেশের সরকারকেও এ বিষয়ে অগ্রিম জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি সৌদি প্রশাসন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের চুম্বন ভাইরাল।
মৃতদেহগুলি এখনও বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনাও হয়নি। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে সৌদি আরবের উপর চাপ বাড়াচ্ছে ঢাকা। এরই মধ্যে এক ভারতীয় ব্যক্তির এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায় একই ধরনের একাধিক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ছে। এই দাবিগুলির সত্যতা এখনও যাচাই করা যায়নি।
ঠিক কী হয়েছে মক্কায়?
জাড্ডায় বাংলাদেশের কনসুলেট জেনারেলের থেকে পাওয়া একটি কনফিডেন্সিয়াল মেমো প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম 'ডেইলি স্টার'-এ। সেই মেমো অনুযায়ী, নজরুল ও সুইটি সৌদি সংস্থা আল মজলে সাফাইকর্মীর কাজ করতেন। ৩০ সেপ্টেম্বর কনসুলেটের হাতে আসা বন্দিদের একটি তালিকা থেকে জানা যায়, সৌদি আরবের সাইবার অপরাধ আইনে ২০২৩ সালের ১ অগাস্ট নজরুলকে আটক করা হয়েছিল। পরকীয়ার অভিযোগে তার পরের দিন অর্থাৎ ২ অগাস্ট আটক করা হয় সুইটিকে।
সরকারি স্তরে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবকে কেন্দ্র করে নজরুল ও সুইটি ঠিক কী করেছিলেন বলে অভিযোগ এবং তাঁদের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক ছিল, তা নিয়ে নানা জল্পনা ছড়ায়। এর আগে এই ঘটনা নিয়ে ইন্ডিয়া টুডে ডিজিটালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করা হচ্ছে, নজরুল ও সুইটি বিবাহিত ছিলেন। এমনকী মক্কায় একে অপরের কপালে চুম্বন করা ছাড়া তাঁদের অপরাধ বলতে আর কিছুই ছিল না বলেও দাবি। কিন্তু দুই পরিবারের সদস্যদের দাবি, নজরুল ও সুইটি একে অপরকে চিনতেন না।
পাকিস্তানভিত্তিক একটি এক্স (X) অ্যাকাউন্ট থেকে প্রথমে একটি পোস্ট করা হয়। পরে বাংলাদেশের পাশাপাশি পাকিস্তান ও আফ্রিকার একাধিক দেশের অ্যাকাউন্ট থেকে হুবহু একই পোস্টই ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ওই পোস্টে আরও কয়েকটি অভিযোগের পাশাপাশি দাবি করা হয়েছে, নজরুল ও সুইটির মৃত্যুর জন্য দায়ী নাকি এক ভারতীয় ব্যক্তি।
I had no intention of discussing this filthy and shameful matter, but I am compelled to post in protest against the spread of false and fabricated stories. Two individuals from Bangladesh, Nazrul Islam and Sathi Akhtar. Both worked for the Bin Laden Company and were cleaners at the Masjid al-Haram in Mecca Mukarramah. The girl resided in Villa Batha Quraish, while the boy lived in Villa Hayy al-Iskan. During their duty, a romantic relationship developed between the two, and they committed adultery in a deserted room located on the stairs between gates 85 and 87 of the Masjid al-Haram. Nazrul Islam had instructed one of his Indian friends to stand guard below. That friend recorded a video of the incident. Later, when he himself expressed a desire to commit adultery with the girl but was unable to do so, or when neither consented, he made the video public. After that, the incident came into the public eye. Saudi authorities succeeded in arresting all three individuals. The Indian youth was sentenced to 20 years in prison and remains in jail. The other two were also kept in prison. Nazrul Islam had arrived in Saudi Arabia from Bangladesh between November 10 and 13, 2022. He committed this wrongful act in May 2023, after which Saudi authorities arrested him. He remained in prison from May 2023 to October 2026. The judicial proceedings of this case lasted approximately three and a half to four years. During this time, it is the responsibility of the Saudi government to inform the sponsor and the company. It is not their responsibility to notify people from other countries about it. Many people are claiming that the two had gone for Umrah and had merely kissed there. All these stories are completely false and fabricated. It is true that both were unmarried. But the question here is: even though they were unmarried, why were they sentenced to death? Do you know why? Because this is the Masjid al-Haram. The matter here is not limited to just the punishment for adultery; rather, the individual also violated the sanctity and honor of the Masjid al-Haram. For this very reason, to set an exemplary punishment, the senior judges of the Supreme Court deemed the death penalty appropriate as a deterrent measure and pronounced the same sentence. This punishment is in accordance with the Quran and Sunnah. The most astonishing thing is that even today, we continue to shamelessly spread lies about this matter. Atheist individuals from both the right and left wings in Bangladesh are saying all this, and even some of those who advocate for the implementation of Islamic law in Bangladesh are opposing this decision. May Almighty Allah guide us, Ameen.
— $ULTAN☠️𝕏 (@Sarki_sultan) October 20, 2026
পাকিস্তানি অ্যাকাউন্টগুলি থেকে ছড়ানো পোস্টে কী দাবি করা হয়েছে?
গত ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার থেকে ছড়িয়ে পড়া ওই পোস্টগুলিতে দাবি করা হয়েছে, মক্কার মসজিদ আল-হারামে সাফাইকর্মী হিসেবে কাজ করতেন নজরুল ও সুইটি। তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং মসজিদের ৮৫ ও ৮৭ নম্বর গেটের মাঝামাঝি একটি নির্জন ঘরে তাঁরা ঘনিষ্ঠতায় লিপ্ত হয়েছিলেন বলে অভিযোগ। পোস্টগুলিতে আরও দাবি করা হয়েছে, নজরুল ও সুইটি যখন একসঙ্গে ছিলেন, তখন পাহারা দেওয়ার জন্য নজরুল তাঁর এক ভারতীয় বন্ধুকে সেখানে দাঁড় করিয়েছিলেন। ওই ভারতীয় বন্ধুই তাঁদের সেই মুহূর্তের ভিডিও রেকর্ড করেন বলে অভিযোগ।
একাধিক ভাইরাল পোস্টে ভারতীয় ব্যক্তিকে জড়ানো হচ্ছে
পোস্টে আরও দাবি করা হয়েছে, নজরুলের ওই ভারতীয় বন্ধুই ভিডিও আপলোড করে তা ভাইরাল করে দেয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ তিনজনকেই গ্রেফতার করে। ভারতীয় ব্যক্তিকে ২০ বছরের কারাদণ্ড ও নজরুল, সুইটিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। মক্কার মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘন করার অপরাধে এই শাস্তি বলে জানায় সৌদির আদালত। পোস্টগুলিতে আরও জোর দিয়ে দাবি করা হয়েছে, ওমরাহের সময় নজরুল ও সুইটি শুধুমাত্র একে অপরকে চুম্বন করেছিলেন বলে যে কথা ছড়িয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও মনগড়া। তাঁদের কথিত কাজের জন্য মৃত্যুদণ্ডকেই উপযুক্ত ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি’ বলে মনে করেছিল সৌদি আরবের সুপ্রিম কোর্ট।
বেশির ভাগ পোস্ট ভাইরাল করা হচ্ছে পাকিস্তান থেকে
এই দাবিগুলির কোনওটিরই সত্যতা এখনও যাচাই করা যায়নি। রিয়াধের তরফে সীমিত তথ্য দেওয়ায় গোটা ঘটনা সম্পর্কে একাধিক প্রশ্নের উত্তর অধরা রয়ে গিয়েছে। আর সেই সুযোগেই নানা জল্পনা ছড়াচ্ছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টগুলিতে যে বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তার অনেকটাই এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা তথ্যের বাইরে। ওই ভারতীয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সমর্থনে কোনও সরকারি নথি পাওয়া যায়নি। এমনকী, তাঁকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলেও যে দাবি করা হচ্ছে, তারও কোনও সরকারি প্রমাণ নেই। ঘটনার যে বিস্তারিত বিবরণ পোস্টগুলিতে তুলে ধরা হয়েছে, তা স্বাধীনভাবেও যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রথমে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিভিন্ন ফেসবুক এবং এক্স (X) অ্যাকাউন্ট থেকে এই পোস্টগুলি ছড়িয়ে পড়ে। যাঁরা এই দাবিগুলি ভাগ করে নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ফারহান কিয়ানিও। তাঁকে রিয়াধে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের যুব শাখার সভাপতি হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। পরে নাইজেরিয়া ও আফগানিস্তান-সহ অন্যান্য দেশের অ্যাকাউন্ট থেকেও একই বয়ানের পোস্ট হুবহু ছড়িয়ে পড়ে।
নজরুল ও সুইটির মৃত্যদণ্ড ঘিরে একাধিক প্রশ্ন
সৌদি আরবের নিউজ পোর্টালেও এই খবরের প্রতিবেদনে ভারতীয় নাগরিকের জড়িত থাকার দাবি করা হলেও স্বপক্ষে কোনও প্রমাণ দিতে পারেনি। এখন প্রশ্ন উঠছে, দুই বাংলাদেশি নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে কেন ঢাকাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করল না রিয়াধ? কেন ঢাকা নজরুল ও সুইটির মামলাটি সম্পর্কে জানলেও কোনও রকম কূটনৈতিক পদক্ষেপ করেনি? একাধিক প্রশ্নের উত্তর অধরা। রহস্যও।