শি জিনপিং, ডোনাল্ড ট্রাম্প, শেহবাজ শরিফমঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে উদ্দেশ করে একপ্রকার প্রলয় ঘটানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'যদি যুদ্ধবিরতি না হয় তবে রাতেই একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।' ইরানও পাল্টা জানায়, তারা আমেরিকার সঙ্গে সমস্ত কূটনৈতিক যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছিল। কিন্তু মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যেই ঘটে যায় নাটকীয় পরিবর্তন। একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয় এবং ইরান গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ পুনরায় খুলতে সম্মত হয়।
এই ১০ ঘণ্টায় কী কী বদলাল?
আমেরিকা যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব দিয়েছে পাকিস্তানকে। তবে জানা যাচ্ছে, শেষ মুহুর্তে চিনের হস্তক্ষেপই চুক্তিকে বাস্তবে রূপ দেয়। এক মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে ইরানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশ হওয়া সত্ত্বেও চিন প্রথমে নীরব ছিল। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার কাজ করার সময়েই বেজিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এর ফলে চিনের সামনে শান্তি স্থাপনের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ক্রমে স্পষ্ট হয়, যুদ্ধবিরতির পিছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল চিন। এমনকী, ট্রাম্পও পরোক্ষ ভাবে তা স্বীকার করেন। তিনি সংবাদ সংস্থাকে বলেন, 'হ্যাঁ, শুনেছি চিন জড়িত ছিল।' শুরুতে চিন, পাকিস্তান, তুরস্ক এবং মিশরের মতো দেশগুলির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে কাজ করছিল, কিন্তু ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষের দিকে এগোতেই এবং পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হতেই চিন সরাসরি ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে।
এই ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে ইরানের উপর চিনের সরাসরি প্রভাব রয়েছে, যা পাকিস্তানের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে চিন ও রাশিয়া মিলে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পর্ষদে একটি প্রস্তাব আটকে দেয় যা হরমুজ প্রণালী খুলতে বলপ্রয়োগের অনুমতি দিত। ইরানের নিয়ন্ত্রণের ফলে এই জলপথ দিয়ে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। চিনের মতে, ওই প্রস্তাবটি ইরানের বিরুদ্ধে সঠিক হতো না।
যদিও চিন আনুষ্ঠানিক ভাবে এই যুদ্ধবিরতিতে নিজের ভূমিকা নিয়ে কিছু বলেনি। তবে মঙ্গলবার এক সরকারি মুখপাত্র জানান, বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই ইরান, ইজরায়েল, রাশিয়া ও উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে মোট ২৬ বার ফোনে কথা বলেছেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে চিনের বিশেষ দূতও কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন। চিনের এই নীরব ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে নজর এড়ায়নি। যদিও ট্রাম্প মৌখিকভাবে চিনের ভূমিকা স্বীকার করেছিলেন, তাঁর সরকারি বিবৃতিতে তার উল্লেখ ছিল না। সেখানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার কথা বলা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রান আসিম মুনিরের নাম উল্লেখ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইচ্ছাকৃত ভাবে চিনের ভূমিকা আড়াল করা একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
এদিকে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার আগে শেহবাজ শরিফ সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট করেন, যেখানে তিনি ট্রাম্পকে সামরিক পদক্ষেপের সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ জানান এবং ইরানকে হরমুজ প্রণালী খুলতে বলেন। কিন্তু ওই পোস্টের প্রথম সংস্করণে 'Draft - Pakistan's PM message on X' লেখা থাকায় তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, 'Pakistan's PM' শব্দবন্ধটি ইঙ্গিত দেয় যে বার্তাটি সম্ভবত অন্য কোনও দেশ লিখে দিয়েছিল।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করলেও, মূল ভূমিকা ছিল দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনা, আর সেই জায়গায় চিনের হস্তক্ষেপই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।