
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ২০২২ সালের শেষ দিকে রাশিয়াকে পরমাণু বোমা ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এমনটাই দাবি করলেন পোল্যান্ডের উপ-বিদেশমন্ত্রী ভ্লাদিস্লাভ তেওফিল বারতোশেভস্কি। তাঁর দাবি, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এমন অল্প কয়েকজন বিশ্বনেতার পরামর্শ গুরুত্ব দিয়ে শোনেন, যাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
সোমবার নয়াদিল্লিতে ভারত-পোল্যান্ড যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের বৈঠকের পর সাংবাদিক বৈঠকে বারতোশেভস্কি বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত পরিচিত ও সম্মানিত রাষ্ট্রনায়ক। ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার এবং তার আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের, দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। সেই কারণেই প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রধানমন্ত্রী মোদীর পরামর্শকে গুরুত্ব দেন।'
এরপরই ইউক্রেন যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ তুলে ধরে পোল্যান্ডের উপ-বিদেশমন্ত্রী দাবি করেন, '২০২২ সালের শেষ দিকে ইউক্রেনে পুতিন যাতে পরমাণু বোমা ব্যবহার না করেন, সেই ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী মোদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী এমন কয়েকজন নেতার মধ্যে একজন, যিনি সত্যিই প্রেসিডেন্ট পুতিনের উপর কিছুটা চাপ ও প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এই সংঘাত থামানোর ক্ষেত্রেও ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।"
বারতোশেভস্কির এই মন্তব্যের ফলে ইউক্রেন যুদ্ধে ভারতের কূটনৈতিক ভূমিকা ফের আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উজবেকিস্তানে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছিলেন, 'এটা যুদ্ধের যুগ নয়।' সেই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল।
এরপর থেকে ভারত ধারাবাহিকভাবে আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধানের পক্ষে সওয়াল করে এসেছে। একইসঙ্গে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমের দেশগুলির নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেয়নি নয়াদিল্লি। প্রধানমন্ত্রী মোদী যেমন প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন, তেমনই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গেও নিয়মিত আলোচনা করেছেন। ২০২৪ সালে তিনি কিয়েভ সফর করেন এবং বিভিন্ন বহুপাক্ষিক সম্মেলনের ফাঁকেও জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন।
আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলির চাপ সত্ত্বেও ভারত রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, গত মাসেই প্রেসিডেন্ট পুতিন ভারতকে 'একটি মহান দেশ' বলে উল্লেখ করেন এবং ভারতের স্বাধীন বিদেশনীতির প্রশংসা করেন।
শুধু ইউক্রেন নয়, ইরান ইস্যুতেও ভারতের অবস্থানের প্রশংসা করেছেন বারতোশেভস্কি। তাঁর মতে, 'ইরানের ক্ষেত্রেও ভারত কৌশলগত স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রেখে সংযম, উত্তেজনা প্রশমন এবং কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ভারত যেমন সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করেছে, তেমনই আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের উপর জোর দিয়েছে। পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষেও সওয়াল করেছে, কারণ ভারত তার অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল ওই অঞ্চল থেকেই আমদানি করে।'
পোল্যান্ডের উপ-বিদেশমন্ত্রী বলেন, 'ভারত একটি বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ দেশ। আপনারা অবাধে পণ্য, বিশেষ করে তেল আমদানির সুবিধা পান এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাসের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। পোল্যান্ডও এখনও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে। আমরা তাদের জানিয়েছি, আমাদের পছন্দের সমাধান কূটনৈতিক পথেই। প্রধানমন্ত্রী মোদীও একই কাজ করছেন। আমরাও যুক্তির মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করছি, যদিও তার প্রভাব সীমিত।'
এছাড়াও, রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের জন্য ভারতের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি পোল্যান্ডের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন ভ্লাদিস্লাভ তেওফিল বারতোশেভস্কি।