
ভেনেজুয়েলার কাছে রাশিয়ার সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, আমেরিকার সঙ্গে কি সরাসরি সংঘর্ষের পথে হাঁটছে মস্কো? উত্তর আটলান্টিকে তৈরি হয়েছে এক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে একটি নিষিদ্ধ তেল ট্যাঙ্কার আটকানোর চেষ্টা করছিল, সেটিকে রক্ষা করতে রাশিয়া সাবমেরিন ও একাধিক নৌযান মোতায়েন করেছে বলে খবর। আগে ‘বেলা-১’ নামে পরিচিত ওই ট্যাঙ্কারটি বর্তমানে রাশিয়ার পতাকা নিয়ে ‘মেরিনেরা’ নামে চলাচল করছে। এই ঘটনায় আমেরিকা-রাশিয়া সম্পর্ক নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
কীভাবে শুরু হল এই ঘটনা?
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা গোপন তেলবাহী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে কড়া অবরোধ জারি করেন। এই জাহাজগুলি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরান, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলা থেকে গোপনে তেল পরিবহণ করে।
‘বেলা-১’ ট্যাঙ্কারটি ভেনেজুয়েলায় অপরিশোধিত তেল বোঝাই করতে যাচ্ছিল। মার্কিন উপকূলরক্ষী বাহিনী জাহাজটিকে আটকানোর চেষ্টা করলে ক্রুরা জাহাজে ওঠা এড়িয়ে যায় এবং উত্তর দিকে পালিয়ে যায়। পালানোর সময়ই ট্যাঙ্কারটির নাম বদলে রাখা হয় ‘মেরিনেরা’, রাশিয়ার পতাকা তোলা হয় এবং রাশিয়ান রেজিস্ট্রেশন নেওয়া হয়। বর্তমানে এটি আইসল্যান্ডের প্রায় ৩০০ মাইল দক্ষিণে অবস্থান করে রাশিয়ার মুরমানস্ক বন্দরের দিকে এগোচ্ছে।
রাশিয়ার কড়া প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার পর রাশিয়া তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আমেরিকাকে ধাওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানায়। কিন্তু মার্কিন উপকূলরক্ষী বাহিনী পিছু না হটায়, রাশিয়া ট্যাঙ্কারটির নিরাপত্তায় সাবমেরিন ও অন্যান্য নৌসম্পদ মোতায়েন করে। রুশ সংবাদমাধ্যম আরটি-তে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, মার্কিন জাহাজকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে ‘মেরিনেরা’।
কী এই ‘শ্যাডো ফ্লিট’?
‘শ্যাডো ফ্লিট’ বলতে মূলত পুরনো, অস্পষ্ট মালিকানার তেল ট্যাঙ্কার বোঝায়, যেগুলি নিষিদ্ধ দেশগুলোর তেল বহন করে। এই জাহাজগুলি প্রায়ই নিজেদের ট্র্যাকিং সিস্টেম (AIS) বন্ধ রাখে বা ভুয়ো অবস্থান দেখায়। শত শত এমন জাহাজ রাশিয়ার অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে বড় ভূমিকা নিচ্ছে। ‘মেরিনেরা’ অতীতে ইরান ও ভেনেজুয়েলার তেল চিনে পৌঁছে দিয়েছে এবং ২০২৪ সালেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় পড়ে।
কী কী মোতায়েন করেছে রাশিয়া?
রাশিয়া ঠিক কোন শ্রেণির সাবমেরিন বা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে, তা প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে শুধু ‘একটি সাবমেরিন ও অন্যান্য নৌসম্পদ’-এর কথা বলা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলি রাশিয়ার উত্তর নৌবহরের অংশ। এই ধরনের সরাসরি সামরিক পাহারা দেওয়া রাশিয়া-আমেরিকা উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এরপর কী হতে পারে?
আগেও আমেরিকা একাধিক নিষিদ্ধ ট্যাঙ্কার আটক করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক জলসীমায় রাশিয়ার পতাকাবাহী জাহাজে হস্তক্ষেপ করা অত্যন্ত জটিল। মার্কিন বাহিনী যদি জাহাজে ওঠার চেষ্টা করে, তবে বড় সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। রাশিয়া ইতিমধ্যেই বিষয়টিকে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন বলে ব্যাখ্যা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ‘শ্যাডো ফ্লিট’ এখন ক্রমশ রাশিয়ার পতাকা ব্যবহার করছে। স্পষ্টতই, নিষেধাজ্ঞার এই লড়াই এখন কূটনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে সমুদ্রের বুকে প্রকাশ্য শক্তি প্রদর্শনে পরিণত হচ্ছে। যদিও এখনও পর্যন্ত সরাসরি সংঘর্ষ হয়নি, তবে দুই পরাশক্তিই যে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।