
নিউ জার্সির দুর্গাপুজো বিদেশে থাকলেও দুর্গাপুজো নিয়ে বাঙালির আবেগে ভাঁটা পড়ে না। যেমন আমেরিকা। সেদেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতি বছরই জমে ওঠে দুর্গাপুজো। কোথাও সাবেকি আয়োজন, কোথাও আবার মণ্ডপ জুড়ে অভিনব থিম। নিউ জার্সির ত্রিনয়নীর পুজোয় এ বার সেই থিমের মধ্যেই মিলছে অন্যরকম চমক। আমেরিকার মাটিতে তৈরি হচ্ছে 'স্বপ্নের শহর প্যারিস'। আর সেই প্যারিসের বিখ্যাত লুভর মিউজিয়ামের উঠোনেই বসতে চলেছে মা দুর্গার আসন।
ত্রিনয়নীর দুর্গাপুজো এ বার পঞ্চম বছরে পা দিচ্ছে। পাঁচ বছরের এই যাত্রাকে স্মরণীয় করে তুলতেই এ বার তাদের ভাবনা 'প্যারিস'। শুধু নামেই প্যারিস নয়, মণ্ডপের সাজসজ্জাতেও উঠে আসবে ফ্রান্সের রাজধানীর পরিচিত ছবি। থাকবে আইফেল টাওয়ার, লুভর মিউজিয়াম, ভার্সাই প্যালেস, মনমার্ত্রের মতো একাধিক আইকনিক স্থাপত্য ও এলাকার আদল। আর গোটা আয়োজনের কেন্দ্রে থাকবে লুভর মিউজিয়ামের উঠোনের ভাবনা। সেখানেই অধিষ্ঠান করবেন দশভূজা।
নিউ জার্সিতেই তৈরি হচ্ছে এক টুকরো প্যারিস
প্যারিসের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আইফেল টাওয়ার। বিশ্বের অন্যতম পরিচিত এই স্থাপত্যই এ বার নিউ জার্সির ত্রিনয়নীর পুজোমণ্ডপে প্যারিসের আবহ তৈরির অন্যতম অংশ। তার সঙ্গে থাকছে লুভর মিউজিয়ামের আদল। তবে উদ্যোক্তাদের ভাবনা শুধু কয়েকটি পরিচিত স্থাপত্যের প্রতিরূপ তৈরি করেই থেমে থাকছে না।
লুভর মিউজিয়ামের চত্বরকে দুর্গাপুজোর বেদীর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়াই এবারের মূল পরিকল্পনা। ত্রিনয়নীর অন্যতম উদ্যোক্তা শিবাজি চন্দ্র জানিয়েছেন, আইফেল টাওয়ার, লুভর মিউজিয়াম-সহ বিভিন্ন স্থাপত্য কাটআউটের আকারে তৈরি করা হচ্ছে। এমন ভাবে গোটা জায়গাটি সাজানো হবে, যাতে মনে হয় লুভরের চত্বরই হয়ে উঠেছে পুজোর বেদী।
যে জায়গায় এই আয়োজন হচ্ছে, সেটি আসলে ত্রিনয়নীর স্কুল ও জিম সংলগ্ন এলাকা। সেই জায়গাকেই পরিকল্পনা ও পরিশ্রমে বদলে দেওয়া হচ্ছে প্যারিসের আবহে।

পাঁচ বছরের পথচলা
কয়েকজন বন্ধু ও পরিবারের উদ্যোগে ছোট পরিসরে শুরু হয়েছিল ত্রিনয়নীর পথচলা। পাঁচ বছরে সেই পুজোই নিউ জার্সির অন্যতম প্রধান দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়ে উঠেছে বলে উদ্যোক্তাদের দাবি। প্রতি বছরই নতুন কোনও থিম, মণ্ডপের সাজসজ্জা, খাওয়াদাওয়া এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উৎসবকে আলাদা করে তোলার চেষ্টা করা হয়।
পঞ্চম বছরে সেই ভাবনাই পৌঁছে যাচ্ছে প্যারিসে।
ত্রিনয়নীর সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, এ বারের থিম ‘স্বপ্নের শহর প্যারিস’। ছোট-বড় সমস্ত সদস্য মিলে দিনরাত এক করে সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেওয়ার কাজ করছেন। সপ্তাহের কর্মব্যস্ততার পর ছুটির দিনগুলিতে সবাই মিলে মণ্ডপের বিভিন্ন অংশ তৈরির কাজে হাত লাগাচ্ছেন।
কেউ তৈরি করছেন কাটআউট, কেউ মণ্ডপের নকশা নিয়ে কাজ করছেন, কেউ আবার সাজসজ্জার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। পেশাগত জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও পুজোর জন্য সময় বের করে নেওয়াই হয়ে উঠেছে তাঁদের উৎসবের অন্যতম আনন্দ।
মণ্ডপে থাকবে আইফেল, লুভর, ভার্সাই, মনমার্ত্র
প্যারিসের থিমকে পূর্ণাঙ্গ করে তুলতেই একাধিক পরিচিত স্থাপত্যকে মণ্ডপসজ্জার অংশ করা হচ্ছে। আইফেল টাওয়ার থেকে লুভর মিউজিয়াম, ভার্সাই প্যালেস থেকে মনমার্ত্র- প্যারিসের একাধিক পরিচিত ছবি উঠে আসবে এই পুজোয়। তবে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ লুভর। পৃথিবীর অন্যতম পরিচিত এই মিউজিয়ামের সঙ্গে দুর্গাপুজোর মণ্ডপকে মিশিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাই এ বারের থিমের বিশেষত্ব।

সাধারণত দুর্গাপুজোর থিমে কোনও নির্দিষ্ট জায়গা বা স্থাপত্যকে তুলে ধরা হলেও এখানে সেই জায়গার সঙ্গে পুজোর বেদিকে মিলিয়ে দেওয়ার ভাবনা নেওয়া হয়েছে। ফলে দর্শকদের সামনে শুধু একটি মণ্ডপ নয়, তৈরি হবে একটি নির্দিষ্ট শহরের আবহ।
শুধু পুজো নয়, প্রবাসী বাঙালির পুনর্মিলন
বিদেশে দুর্গাপুজোর গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। বছরের এই কয়েকটা দিন প্রবাসী বাঙালিদের কাছে অনেকটা পুনর্মিলনের সময়। কাজের সূত্রে বছরের অন্য সময়ে যাঁদের সঙ্গে দেখা হয় না, পুজোর সময় তাঁদের অনেকেই এক জায়গায় জড়ো হন।
দেশে ফিরে পুজো কাটানোর সুযোগ না থাকলে স্থানীয় দুর্গাপুজোই হয়ে ওঠে বাংলার উৎসবের সঙ্গে যোগাযোগের জায়গা। নিউ জার্সিতেও সেই আবহ তৈরি হয় পুজোর সময়। বাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষ তো বটেই, বিভিন্ন বয়সের উৎসবপ্রেমী মানুষও যোগ দেন এই সব আয়োজনে।
ত্রিনয়নীর পুজোতেও সেই মিলনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পঞ্চম বছরে পুজোর পাশাপাশি থাকছে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। চন্দ্রবিন্দুর নস্ট্যালজিয়া এবং বম্বে ভাইকিংসের জমজমাট অনুষ্ঠান থাকছে এ বারের আয়োজনের অংশ হিসেবে।
অর্থাৎ দিনের পুজো থেকে সন্ধের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মণ্ডপের প্যারিস-থিম থেকে খাওয়াদাওয়া- সব মিলিয়ে দুই দিনের আয়োজনকে আরও বড় করে তোলার প্রস্তুতি চলছে।
উদ্যোক্তাদের দাবি, ইতিমধ্যেই বহু মানুষ এই পুজোয় যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। ত্রিনয়নীর পথচলা শুরু হয়েছিল কয়েকজন বন্ধু ও পরিবারের উদ্যোগে। সেই ছোট্ট আয়োজনই পাঁচ বছরে বড় হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর নতুন থিমের ভাবনা সেই যাত্রাকে আরও আলাদা করে তুলেছে।
এবার সেই গল্পের কেন্দ্রেই প্যারিস।
আমেরিকার মাটিতে তৈরি হচ্ছে ফ্রান্সের রাজধানীর আবহ। আইফেল টাওয়ার, ভার্সাই প্যালেস, মনমার্ত্রের সঙ্গে থাকছে লুভর মিউজিয়ামের আদল। আর লুভরের সেই চত্বরেই বসবে দুর্গাপুজোর বেদি।
দূর আমেরিকায় দাঁড়িয়েও তাই এ বার ত্রিনয়নীর পুজোয় মিলবে এক অদ্ভুত সংযোগ- প্যারিসের স্থাপত্যের আবহ আর বাংলার দুর্গাপুজোর আবেগ। পাঁচ বছরের পুজোয় নিউ জার্সির মাটিতে ত্রিনয়নীর ‘স্বপ্নের শহর প্যারিস’ কতটা বাস্তব হয়ে ওঠে, সেটাই এখন দেখার।