ভারতের উপর ক্রমেই চাপ বাড়াতে চাইছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা যতই চোখ রাঙাক। যেখানে সস্তায় পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই তেল কিনবে ভারত। আগেই দেশের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। আর সেই স্ট্র্যাটেজিতেই রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণে তেল কিনছে ভারত। তবে এই সিদ্ধান্তে বেজায় অখুশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সেনেটে(আমাদের সংসদের মতো) এমন একটি বিল অনুমোদিত হয়েছে, যেখানে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল বা গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে। ফলে এই বিল শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হলে ভারতও তার আন্ডারে পড়তে পারে।
মার্কিন সেনেটে ৮৬-১১ ভোটে বিলটি পাশ হয়েছে। এখন সেটি যাবে আমেরিকার হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসে। সেখানেও অনুমোদন মিললে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে রাশিয়ার বড় জ্বালানি ক্রেতা দেশগুলির উপর অতিরিক্ত শুল্ক বসানোর ক্ষমতা চলে আসবে। তবে বিল পাশ হলেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলির উপর অটোম্যাটিকালি ১০০ শতাংশ শুল্ক বসবে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে প্রেসিডেন্টের হাতে।
কোন কোন দেশ নিশানায় পড়তে পারে?
প্রস্তাবিত আইনে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা কয়েকটি দেশকে বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছে ভারত, চিন, তুরস্ক, হাঙ্গেরি এবং স্লোভাকিয়ার মতো দেশ। অর্থাৎ, রাশিয়ার জ্বালানি কেনার সঙ্গে যুক্ত দেশগুলির উপর আমেরিকার চাপ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এই বিল এমন সময়ে সামনে এল, যখন ভারত এবং আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। দু’দেশের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে বলে দুই পক্ষের তরফেই ইঙ্গিত মিলেছে। ফলে রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতের উপর নতুন শুল্ক বসানোর সম্ভাবনা তৈরি হলে সেই আলোচনাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাশিয়া থেকে কত তেল কেনে ভারত?
রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা ভারত। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে ভারত রাশিয়া থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৭ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। এই পরিমাণ ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির অর্ধেকেরও বেশি।
জুলাই মাসেও রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি ছিল প্রায় ২৮ লক্ষ ব্যারেল প্রতিদিন। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া ভারতের জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে রয়েছে।
তবে রাশিয়ার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এখনও চিন। ফলে রুশ তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হলেও একেবারে শীর্ষে নয়।
রুশ তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা কারা?
দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বেশি অংশ কিনছে চিন। মোট রুশ তেল রফতানির প্রায় ৫০ শতাংশ চিনে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তার পরেই রয়েছে ভারত, যার অংশ প্রায় ৩৬ শতাংশ।
এর পরে তুরস্ক প্রায় ৬ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় ৫ শতাংশ রুশ অপরিশোধিত তেল কিনছে। বাকি দেশগুলির সম্মিলিত অংশ প্রায় ৩ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, রাশিয়ার তেল বাণিজ্যে ভারত এবং চিনের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
কেন রাশিয়ার তেল কেনা দেশগুলির উপর চাপ দিচ্ছে আমেরিকা?
রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকার মূল অভিযোগ, জ্বালানি বিক্রি থেকে বিপুল রাজস্ব আসছে মস্কোয়। আর সেই অর্থ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে রাশিয়াকে সাহায্য করছে বলে দাবি ওয়াশিংটনের।
এই কারণেই রাশিয়ার জ্বালানি কিনছে এমন দেশগুলির উপর চাপ তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। শুধু তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলিই নয়, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় রাশিয়ার নেতা, সরকারি আধিকারিক, ধনী ব্যবসায়ী এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয়?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপাবেন কি না। কারণ বিলটি এখনও পুরোপুরি আইন হয়নি এবং সেটি লাগু হলেও শুল্ক বসানো বাধ্যতামূলক নয়।
তবে ভারত যেহেতু রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কিনছে, তাই নতুন মার্কিন নীতির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্যচুক্তি যখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে, তখন রুশ তেল কেনার বিষয়টি নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
অন্য দিকে, রাশিয়া থেকে তুলনামূলক সস্তায় তেল পাওয়া ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এক দিকে আমেরিকার সম্ভাব্য শুল্ক, অন্য দিকে সস্তা জ্বালানি; দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন দিল্লির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।