
দীর্ঘ কয়েক মাসের সংঘাত ও উত্তেজনার পর অবশেষে কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটল আমেরিকা ও ইরান। দুই দেশের মধ্যে চলা বিরোধ মেটাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ MoU আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাক্ষরিত হল। সই করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এই চুক্তিকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, বুধবার দুই রাষ্ট্রপ্রধান ডিজিটাল মাধ্যমে নথিতে সই করেন। এর আগে রবিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের মুখ্য আলোচক মহম্মদ বাকের কালিবাফ ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রাথমিক অনুমোদন দেন। ফলে চুক্তিটি অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে এবং সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আর প্রয়োজন পড়ছে না।
এদিকে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রোর সঙ্গে এক নৈশভোজে অংশ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তির হার্ড কপিতেও সই করেছেন বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। সেই স্বাক্ষরের ভিডিওও প্রকাশ করা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, স্বাক্ষরিত নথির ছবি ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলির কাছে পাঠানো হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই সমঝোতার মূল লক্ষ্য প্রায় ৪ মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটানো এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণ পথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া।
ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, ইরানকে যাতে কোনও পরিবহণ বা বিমা-সংক্রান্ত বাধা ছাড়াই তেল বিক্রি করতে দেওয়া হয় এবং সেই বিক্রির অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর দাবি, আমেরিকা তেল সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা দ্রুত প্রত্যাহার করে ৬০ দিনের একটি অন্তর্বর্তী সময়ে ইরানকে পুনরায় তেল রফতানির সুযোগ দেওয়ার কথা চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। চুক্তিতে ৬০ দিনের একটি প্রতিশ্রুতি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কোনও পক্ষই এমন পদক্ষেপ নেবে না, যা চুক্তিকে দুর্বল করতে পারে। নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি থেকেও বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এখনও অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হিসেবেই রয়ে গিয়েছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের মধ্যেই থাকবে এবং বিদেশে পাঠানো হবে না। যদিও ইউরেনিয়ামকে কম সমৃদ্ধ করার একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। একইসঙ্গে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে কোনও ধরনের আলোচনা করতে রাজি নয়।
হরমুজ প্রণালী খুলবে?
হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়েও নতুন ব্যবস্থার কথা জানিয়েছেন ইরানের মুখ্য আলোচক মহম্মদ বাকের কালিবাফ। তাঁর মতে, যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতি পুরোপুরি ফিরবে না। তবে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন মেনেই ইরান প্রণালীর পরিচালনা করবে। পাশাপাশি ওই জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলির কাছ থেকে পরিষেবা বাবদ নির্দিষ্ট ফি নেওয়া হবে।
মহম্মদ বাকের কালিবাফ আরও জানান, এই সমঝোতার আওতায় ইরানে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর একটি বড় অংশ যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রকল্পে ব্যয় করা হবে।
ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে নমনীয় ট্রাম্প
অন্যদিকে, প্যারিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'যদি সৌদি আরব, কাতার এবং অন্যান্য দেশগুলির কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকে, তাহলে ইরানকে সম্পূর্ণভাবে তা থেকে বঞ্চিত করা ন্যায্য হবে না।' যদিও তিনি স্পষ্ট করেছেন, চুক্তি কার্যকর হলেও মার্কিন সেনাবাহিনী কিছু সময়ের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থান করবে।
এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই চুক্তিকে ‘ইসলামাবাদ মেমোরান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ বলে উল্লেখ করেছেন। এক্স-এ করা পোস্টে তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। তাঁর মতে, ইরানের তরফে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং আমেরিকার নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, এই দুই পদক্ষেপই উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
আন্তর্জাতিক মহলের মতে, এই সমঝোতা সফলভাবে কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।