ইরানে আমেরিকা হামলা করলে কী কী হতে পারেইরানে যে কোনও মুহূর্তে হামলা চালাতে পারে আমেরিকা। বারবারই হুমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখনও পর্যন্ত খবর, ট্রাম্প ইরানকে ১০ দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছেন। এই ১০ দিনে ডিল না মানলে, আমেরিকা হামলা চালাবে। ২০০৩ সালে ইরাকে যেভাবে সেনা ঢুকিয়েছিল আমেরিকা, ঠিক সেই ভাবেই ইরানে এন্ট্রি নিতে পারে আমেরিকা। সে ক্ষেত্রে ইরানের বর্তমান শাসককে ক্ষমতাচ্যূত করাই লক্ষ্য হবে আমেরিকার।
যদি ইরানে আমেরিকা হামলা চালায়, তা হলে ঠিক কী কী হতে পারে?
যদি আমেরিকার সঙ্গে ইরানের ১০ দিনের ডেডলাইনে সমঝোতা চুক্তি ফেল হয়ে যায়, তাহলে ইরানে হামলা চালাতে পারে আমেরিকা। তাহলে যা যা হতে পারে...
১. শাসকের পতন, সাধারণ মানুষের কম মৃত্যু, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক
আমেরিকার বায়ুসেনা ও নৌসেনা ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ডস কর্পোরেশন ও বসিজ ইউনিটের নির্দিষ্ট কিছু ঘাঁটিতে হামলা চালাতে পারে। সে ক্ষেত্রে তা হবে, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। বসিজ ইউনিটে হামলা হলে ইরানের চাপ আছে। কারণ, ওই ইউনিট ইরানের পরমাণু কর্মসূচির স্টোরেজ সাইট ও ব্যালেস্টিক মিসাইল লঞ্চ করে ইরান। ইরানে আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই শাসনের অবসান হতে পারে। মোদ্দা বিষয়, সরকার পড়ে যাবে ও শাসন ক্ষমতায় বড় বদলের সম্ভাবনা।
২. শাসক বদল হল না কিন্তু নীতি বদল হল
খামেনেই শাসনের অবসান হয়তো হল না। কিন্তু নীতিগত বদল ঘটল। আমেরিকা ভেনেজুয়েলায় যেমন করল। ভেনেজুয়েলান মডেলে সরকারের নীতি পরিবর্তন হতে পারে। ঠিক যেমন ভেনেজুয়েলায় মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে তুলে আনল আমেরিকা। কিন্তু সরকার বদল করল না। ইরানের ক্ষেত্রে হবে, ইসলামিক গণতন্ত্র থেকে গেল, কিন্তু বহু ইরানির কাছে সন্তোষজনক না-ও হতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন কমাতে বাধ্য হবে। পাশাপাশি দেশের পরমাণু ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত বা বন্ধ করতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ দমনও কিছুটা শিথিল করতে হবে। তবে এটাকে এখনও সম্ভাবনার তালিকায় বেশ কম সম্ভাবনাময় পরিস্থিতি হিসেবেই ধরা হচ্ছে। গত ৪৭ বছর ধরে ইসলামিক রিপাবলিকের নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অনড় থেকেছে এবং আপোসহীন অবস্থান বজায় রেখেছে। এখন হঠাৎ নীতি বদলানোর ক্ষমতা বা ইচ্ছা তাদের আছে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই, যিনি এখন আশির কোঠায়,পরিবর্তন বা সমঝোতার প্রতি আরও বেশি অনাগ্রহী।
৩. শাসকের পতন ও সেনা শাসন
এই সম্ভাবনাটি জোরাল। তা হল, ইরানে খামেনেইয়ের নেতৃত্বে ইসলামিক রিপাবলিকের পতন ঘটল ও ক্ষমতার দখল নিল সেনা। কারণ, ইরানে খামেনেই শাসনের বিরুদ্ধে বহু মানুষ। অনেক বছর ধরেই নানা রকম প্রতিবাদ চলছে। সে ক্ষেত্রে আমেরিকার হামলার জেরে এই শাসনের পতন হলে ক্ষমতার দখল নিতে পারে IRGC। ইরানের অর্থনীতির সঙ্গে IRGC-র গভীর সম্পর্ক।
৪. ইরান পাল্টা আক্রমণ করবে আমেরিকায়
এই ঘটনা ঘটার সম্ভাবনাই সবচেয়ে জোরাল। কারণ আমেরিকার হামলার প্রসঙ্গে আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই বলেছিলেন, 'আমাদের আঙুল ট্রিগারেই রয়েছে। যদি হামলা করে, আমেরিকার সেনা সজোরে থাপ্পড় খাবে। ছাড়ব না।' যদিও আমেরিকার বায়ুসেনা ও নৌসেনার বহরের সঙ্গে ইরানের তুলনাই হয় না। তবুও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভাণ্ডার ব্যবহার করে পাল্টা আঘাত হানতে পারে ইরান। যার অনেকগুলিই গুহা, ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি বা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে রাখা। গাল্ফে আরব উপকূলজুড়ে আমেরিকার সেনা ঘাঁটি ছড়িয়ে রয়েছে, বিশেষ করে বাহরিন ও কাতারে। ২০১৯ সালে সৌদি আরামকোর পেট্রোকেমিক্যালে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছিল। যার জন্য ইরান-সমর্থিত ইরাকের একটি গোষ্ঠীকে দায়ী করা হয়েছিল। সৌদি আরবকে বুঝিয়ে দিয়েছিল তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সামনে কতটা অসহায়। উপসাগরীয় অঞ্চলের ইরানের প্রতিবেশী আরব দেশগুলি, যারা সবাই আমেরিকার বন্ধু, এখন স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ উদ্বিগ্ন। কারণ তারা আশঙ্কা করছে, আমেরিকার যেকোনও সামরিক পদক্ষেপের পাল্টা প্রতিক্রিয়া শেষ পর্যন্ত তাদের গায়েই এসে পড়তে পারে।
৫. গাল্ফ অঞ্চলে মাইন পুঁতে ইরান পাল্টা জবাব দিতে পারে
১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় থেকেই বিশ্ব বাণিজ্য ও তেলের জোগানের জন্য সম্ভাব্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেই সময় ইরান সত্যিই জাহাজ চলাচলের পথে মাইন পেতে দিয়েছিল এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনীর মাইনসুইপার জাহাজ সেগুলি সরাতে সাহায্য করেছিল। ইরান ও ওমানের মাঝের সরু জলপথ স্ট্রেইট অফ হরমুজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্ট। পৃথিবীর মোট তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ এবং তেল ও তেলজাত পণ্যের প্রায় ২০-২৫ শতাংশ প্রতি বছর এই পথ দিয়েই যাতায়াত করে। এই সপ্তাহের শুরুতে জেনিভায় আমেরিকা-ইরান চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলার সময় ইরান কয়েক ঘণ্টার জন্য এই প্রণালী বন্ধ করে লাইভ ফায়ার ড্রিল চালায়, ১৯৮০-এর দশকের পর প্রথমবার। এটাকে শক্তি প্রদর্শনের প্রতীকী বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।