
কৈলাস পর্বতের শিখর ছুঁয়েছিলেন মিলারেপাকৈলাস পর্বতে মহাদেবের বাস। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এই পর্বত। কৈলাস পর্বত অভিযানও নিষিদ্ধ। নানা রকম কিংবদন্তি রয়েছে এই পর্বতকে ঘিরে। যাঁরাই কৈলাস পর্বতে ওঠার চেষ্টা করেছেন, বাঁচেননি। অথবা অত্যন্ত খারাপ আবহাওয়ায় নীচে নামতে বাধ্য হয়েছে। অনেকের এও দাবি, অনেকদিন ক্লাইম্ব করার পরেও দেখা যায়, উপরে নয়, নীচের দিকেই নেমেছেন অভিযাত্রী। মোদ্দা বিষয়, কৈলাস পর্বত অভিযান অসম্ভব।
একমাত্র ব্যক্তি, যিনি কৈলাস পর্বতের শিখরে পৌঁছেছিলেন
তা হলে আজ পর্যন্ত কেউ কি কৈলাস পর্বতের শিখরে পৌঁছননি? কিংবদন্তি রয়েছে, মাত্র একজন ব্যক্তিই কৈলাসের শিখরে গিয়েছিলেন। তার আগে ও তার পরে কেউ যেতে পারেননি। এমনকী যাঁরা ওঠার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের ভয়ঙ্কর পরিণতি হয়েছে। ওই একমাত্র ব্যক্তির নাম মিলারেপা। মিলারেপা নিজেকে ৮০ জনের হত্যাকারী হিসেবে মানতেন। কারণ, তাঁর প্রতিশোধের আগুনে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। পরে পাপবোধ হয় এবং আধ্যাত্মিকতার খোঁজে বেরিয়ে পড়েন।

বিজ্ঞানীরা এখনও এর রহস্য খুঁজে পাননি
কারও দাবি, কৈলাস পর্বতে সময় দ্রুত বয়ে যায়। দ্রুত বার্ধক্য আসে। শরীর দুর্বল হয়ে যায়। যদিও এই সবই মানুষের বিশ্বাস, বিজ্ঞানীরা এখনও এর রহস্য খুঁজে পাননি। ১০৯৩ সালে মিলারেপা কৈলাস পর্বতের পশ্চিম দিকে অবিযান শুরু করেন। সেই যাত্রাপথে তাঁর সঙ্গে বন ধর্মের প্রখ্যাত প্রচারক নরোয়ানজির দেখা হয়। নরোয়ানজি মিলারেপার কাছে একটি শর্ত রেখে বলেন, এই শিখরে যিনি আগে পৌঁছবেন, কৈলাস পর্বতের ওপর তাঁরই আধিপত্য থাকবে। মিলারেপা সেই শর্ত মেনে নেন। এরপর দু’জনে একসঙ্গে পর্বতের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন।
কীভাবে কৈলাসের শিখরে পৌঁছেছিলেন মিলারেপা?
নরোয়ান একদম না থেমে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এবং প্রায় পৌঁছিয়েও গিয়েছিলেন পর্বতে শিখরে। তখনও মিলারেপা বিশ্রাম করছিলেন। এরপরই মিলারেপা দ্রুত যাত্রা করেন। নরোয়ান এগিয়েছিলেন, তখনই সূর্যোদয়ের প্রথম কিরণ পড়ে নরোয়ানের উপরে। সেই কিরণ নাকি এতটাই শক্তিশালী ও তেজ ছিল, যে নরোয়ানকে পিছনে ফিরতে বাধ্য করা হয়। এই সময়ের মধ্যে মিলারেপা পৌঁছে যান পর্বতের শিখরে।
তারপর কৈলাসের শিখরে শুরু করে সাধনা। কৈলাসের শিখরে পৌঁছনো প্রথম ও শেষ ব্যক্তি। সাধনা শেষে ফিরে এসে তিনি তাঁর গুরু মার্পার কাছে যান। মার্পা তাঁকে একটি অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি করে রাখেন। সেখানেই তিনি তাঁর তন্ত্রসাধনা সম্পূর্ণ করেন। পরে তাঁর এই সাধনালব্ধ শিক্ষাকে পূর্ণতা দেন মার্পার গুরু নরোপা।

মিলারেপাকে তিব্বতের বুদ্ধ বলা হয়
বৌদ্ধধর্মের কিছু বইতে মিলারেপা সম্পর্কে তথ্য মেলে। মিলারেপাকে তিব্বতের বুদ্ধ বলা হয়। ১১ শতকে তাঁর জন্ম হয়েছিল। কম বয়সে তিনি বাবাকে হারান। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর কাকা সব সম্পত্তি কেড়ে নেন। মিলারেপা নিঃস্ব হয়ে যান। মা ও বোনের সঙ্গে চাকরের মতো ব্যবহার করতে শুরু করে কাকা।
প্রতিশোধ নিতে তন্ত্র বিদ্যা শেখেন মিলারেপা। তারপর সেই শক্তি প্রয়োগ করা শুরু করেন। মিলারেপার তন্ত্রশক্তিতে কাকা সহ ৮০ জনের মৃত্যু হয়। প্রতিশোধ নেওয়ার পরে আফসোস হয় মিলারেপার। তখনই তিনি ঠিক করেন, আধ্যাত্মিকতায় নিজেকে সঁপে দেবেন। পাপমুক্ত হতে চেয়ে গুরুর কাছে যান। তখনই গুরু মার্পার সঙ্গে দেখা হয়। শুদ্ধিকরণের জন্য মিলারেপাকে বেশ কয়েক বছর অপেক্ষা হয়। গুরু মার্পা মিলারেপাকে দিয়ে আশ্রমের সব কাজ করান। কঠিন পরীক্ষা নেন। এই ভাবে একদিন গুরু মার্পা তুষ্ট হন। দীক্ষা দিতে রাজি হন। শুরু হয় মিলারেপার পাপমুক্তি।
গনিয়ন হেরুকার লেখা ‘হান্ড্রেড থাউজ্যান্ড সংস অফ মিলারেপা’ বইটিতে রয়েছে, মিলারেপা তাঁর জীবনে এক লক্ষ গান রচনা করেছিলেন। এই কারণেই তাঁকে সন্ত কবিও বলা হয়। জীবনের শেষ বছরগুলি তিনি তিব্বত ও নেপালের পাহাড়ে ঘুরে বেড়িয়ে এবং অসংখ্য অনুগামীকে আধ্যাত্মিক পথে দিশা দেখিয়ে কাটিয়েছিলেন।