
কেন প্রতিবাদের আগুনে জ্বলছে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরগত ২ অগাস্ট পাক অধিকৃত কাশ্মীরে (PoK) দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ হয়েছে। সাধারণ মানুষের উপর অকথ্য অত্যাচার ও প্রতিবাদকে বন্দুকের ট্রিগার টিপে শেষ করার পরে বিশ্বকে গণতন্ত্রের পাঠ পড়ানোর চেষ্টা করল প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের দল PML-N। তাদের বিরোধী দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (PPP)-র অভিযোগ, ভোটে দেদার রিগিং করেছে শেহবাজের দল।
প্রথমে ভোটগ্রহণের কথা ছিল ২৭ জুলাই। পরে হঠাত্ই ভোটকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করে দেওয়া হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, নিরাপত্তার জন্যই তিনদফায় ভোট। একদিকে যখন ভোট হচ্ছে, তখন পাক অধিকৃত কাশ্মীর জ্বলছে। সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। মূলত সিভিল সোসাইটি সংগঠন জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (JAAC)-এর নেতৃত্বে প্রতিবাদে সরব হাজার হাজার বাসিন্দা। গত কয়েকমাসে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে বারবার দেখা গিয়েছে রক্তক্ষয়ী হিংসা। JAAC ও পাক সেনা, পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ। দিনের পর দিন ইন্টারনেট নেই। বিক্ষোভকারীদের গুলি করে মারছে পাকিস্তান সরকার।
গত এক সপ্তাহেই ৪০ জনকে হত্যা করেছেন শেহবাজ শরিফ। পাক অধিকৃত কাশ্মীরে এই ধরনের অত্যাচারের প্রতিবাদে তীব্র ভাবে সরব হয়েছে ভারতও। অন্যদিকে রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার প্রধান এই ঘটনার স্বাধীনভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। পাকিস্তান এই হত্যালীলার দায় ভারতের উপর চাপাতে মরিয়া। ইসলামাবাদের দাবি, JAAC-এর এই বিক্ষোভ আন্দোলনের পিছনে রয়েছে ভারত। যদিও এই দাবি সম্পূর্ণ ভাবে খারিজ করে দিয়েছে দিল্লি।

PoK-এর তপ্ত আবহে কেন নির্বাচন হল?
আসলে এই তড়িঘড়ি ভোটের নেপথ্যে রয়েছে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের বিধানসভার গঠন। পাক অধিকৃত কাশ্মীর বিধানসভায় ৫৩টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ৫টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত। একটি সংরক্ষিত উলেমার (ধর্মীয় নেতা) জন্য ও একটি সংরক্ষিত বিদেশে থাকা কাশ্মীরি নাগরিকের জন্য ও একটি সংরক্ষিত টেকনোক্র্যাটদের জন্য। কিন্তু আরও সংরক্ষণ রয়েছে। যেটি নিয়েই মূলত অশান্তি। ১৯৪৭ সালে জম্মু-কাশ্মীর থেকে যাওয়া রিফিউজিদের জন্য ১২টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে। পাকিস্তানের নানা জায়গায় সেই উদ্বাস্তুরা বসবাস করেন, PoK-তে নয়। সেই ১২টি আসনেরই ভোটগ্রহণ িল ২ অগাস্ট, যার মধ্যে মুজফ্ফরাবাদের ৯টি আসনও রয়েছে। JAAC-এর মূল দাবি হল, রিফিউজিদের জন্য এই সংরক্ষিত ১২টি আসন বিলোপ করা হোক। সরকারের সঙ্গে এই জায়গাতেই মতবিরোধ।
JAAC কারা ও এরা কীভাবে গঠিত হয়েছে?
পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ব্যবসায়ী, আনজীবী, ছাত্র-ছাত্রী ও অন্যান্য সিভিল সোসাইটি গোষ্ঠীরা এক ছাতার তলায় এসে জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি বা JAAC তৈরি করেছে। এই সংগঠন ২০২৩ সালে প্রথমবার গম, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ, সরকারি আধিকারিকদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের বিরুদ্ধে ও PoK-র বাসিন্দাদের সকলের সমান অধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলনে নামে। পাকিস্তান সরকার ও JAAC-এর মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়। এরপর ২০২৫ সালের অক্টোবরে ৩৮টি দাবি নিয়ে বড় আন্দোলনে নামে JAAC। এই দাবিগুলির বেশিরভাগই মূলত সাধারণ মানুষের রোটি-কপড়া-মকান ইস্যু। পাক অধিকৃত কাশ্মীরে চিকিত্সা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য আরও ফান্ড, উন্নত পরিকাঠামো, পাকিস্তানের অন্য ৪টি প্রদেশের মতোই পাক অধিকৃত কাশ্মীরকে সমান ভাবে ট্রিট করার মতো দাবিগুলি রয়েছে। মূলত, পাক অধিকৃত কাশ্মীরে ইসলামাবাদের দিনের পর দিন অত্যাচার ও জঙ্গি ঘাঁটি বানিয়ে রাখার বিরুদ্ধে JAAC সরব হয়েছে।

JAAC-এর বেশিরভাগ দাবি পাকিস্তান সরকার মেনে নিলেও ওই সংরক্ষিত ১২টি আসন ঘিরে দাবি মানতে নারাজ ইসলামাবাদ। সংরক্ষিত ১২টি আসনের বিলোপ ঘটানো একমাত্র সম্ভব পাকিস্তানের সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে।
কেন রিফিউজিদের জন্য সংরক্ষিত ওই ১২টি আসন নিয়ে বিতর্ক?
মূল অভিযোগ হল, পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের (PoK) বাসিন্দারা এই আসনগুলিতে ভোট দেন না, এমনকী এখান থেকে প্রার্থীও হতে পারেন না। ফলে এই আসনের ভোটার এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কারওই PoK-এর বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। সাধারণত কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলই এই ১২টি আসনে জয় পায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই আসনগুলিকে কাজে লাগিয়ে ইসলামাবাদ PoK বিধানসভায় নিজেদের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা চাপিয়ে দেয়।
রিফিউজিদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসনের মধ্যে ৭টি পঞ্জাব প্রদেশ ভিত্তিক, একটি খাইবার পাখতুনখোয়ায়। ‘জম্মু-VI’ আসনের ভোটাররা পঞ্জাব, ইসলামাবাদ এবং খাইবার পাখতুনখোয়া জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছেন। ‘ভ্যালি-I’ আসনের ভোটারদের অবস্থান সিন্ধ ও বালুচিস্তানে। ‘জম্মু-I’ আসনে বালুচিস্তান, পাঞ্জাব এবং সিন্ধজুড়ে বসবাসকারী শরণার্থীরা ভোট দেন। অন্যদিকে, ‘ভ্যালি-V’ আসনের ভোটাররা পঞ্জাব ও ইসলামাবাদে ছড়িয়ে রয়েছেন। এই আসনগুলির বণ্টন করা হয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী শরণার্থী জনগোষ্ঠীর সংখ্যার ভিত্তিতে।

সমর্থকদের যুক্তি, কাশ্মীর সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বাস্তুচ্যুত কাশ্মীরিদের রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষিত রাখে। তাঁদের দাবি, ভারতও জম্মু ও কাশ্মীরের বিধানসভায়, পরে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটির বিধানসভায়, পাকিস্তানের দখলে থাকা এলাকার বাসিন্দাদের জন্য আসন বরাদ্দ রেখেছে। তবে PoK-এর ক্ষেত্রে যে আসনগুলিতে নির্বাচন হয়, ভারতের ক্ষেত্রে সেই আসনগুলি খালি রাখা হয়।
কেন আন্দোলকারীদের নির্মম ভাবে হত্যা?
পাকিস্তানে ভারতের প্রাক্তন হাইকমিশনার টি সি এ রাঘবণের মতে, পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে হতাহতের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি। তাঁর কথায়, 'এর সম্ভাব্য কারণ হল, এই গ্রীষ্মে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত চাপে রয়েছে। বালুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ার পরিস্থিতি, পাশাপাশি আফগানিস্তানের সঙ্গে চলতে থাকা অচলাবস্থার কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর উপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। কারণ যাই হোক না কেন, অন্ততপক্ষে এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্য বড়সড় অস্বস্তির। একইসঙ্গে, কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের নিজেদের যে ধারণা বা আত্মবিশ্বাস রয়েছে, তার উপরও এটি বড় আঘাত।'