
ইরান ও ভারত তেল বাণিজ্যএশিয়ার যে দেশগুলি সবচেয়ে বেশি অশোধিত তেল আমদানি করে ইরান থেকে, তার মধ্যে অন্যতম হল ভারত। ইরান থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে আমেরিকা। অর্থাত্ প্রাইমারি কাস্টমার চিন ছাড়াও অন্যান্য দেশগুলিকেও তেল বিক্রি করতে পারে তেহরান। ব্লুমবার্গ-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকার এই পদক্ষেপের পরেই ইরানের তেল সংস্থা ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির মিডলম্যান ও প্রতিনিধিরা ভারতের তেল শোধনাগার সংস্থাগুলির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে।
বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেলের মজুত
ইরানের এই তৎপরতার মূল কারণ সমুদ্রে ভাসমান বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেলের মজুত। সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ বিশ্লেষক সংস্থা Vortexa-র তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ২২ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন তেলবাহী ট্যাঙ্কারে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লক্ষ ব্যারেল ইরানি অশোধিত তেল ও কনডেনসেট মজুত ছিল। এর মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি তেলের কোনও নির্দিষ্ট ক্রেতা বা গন্তব্য এখনও চূড়ান্ত হয়নি, ফলে প্রয়োজন পড়লেই তা দ্রুত বিভিন্ন দেশের কাছে বিক্রি করা সম্ভব। এই বিপুল পরিমাণ তেল ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের সমুদ্রপথে অবস্থান করছে। ফলে নতুন করে উৎপাদন বা পরিবহণের দীর্ঘ অপেক্ষা ছাড়াই দ্রুত সরবরাহ করা যেতে পারে।

এখন প্রশ্ন হল, ভারত কি ইরানের তেল কিনবে?
দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে, আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার আগে ইরানের তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা ছিল ভারত। কিন্তু বর্তমানে আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা তোলার পরেও ভারতের কোম্পানিগুলি ইরানের তেল কেনার জন্য হুড়োহুড়ি করছে না। আসলে দিনের পর দিন হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় ভারত সহ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলি তেলের জোগানের বিকল্প ব্যবস্থা করে ফেলেছে। শিল্প মহলের প্রতিনিধিরা ব্লুমবার্গ-কে জানিয়েছেন, ভারতের তেল শোধনাগারগুলি ইতিমধ্যেই অগাস্ট পর্যন্ত প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের জোগান নিশ্চিত করে ফেলেছে। ফলে এই মুহূর্তে ইরান থেকে অতিরিক্ত তেল কেনার তেমন কোনও তাড়াহুড়ো নেই। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আকর্ষণীয় হলেও ভারতীয় সংস্থাগুলির হাতে আগামী কয়েক মাসের জন্য পর্যাপ্ত তেলের মজুত ও সরবরাহ চুক্তি রয়েছে। তাই ইরানের সমুদ্রে ভাসমান বিপুল তেলের মজুত ভারত দ্রুত কিনে নেবে, এমন সম্ভাবনা আপাতত কম। তবে বাজার পরিস্থিতি, তেলের দাম এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে ভবিষ্যতে ভারতীয় রিফাইনারিগুলি ইরানি তেল কেনার বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করতে পারে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তেলের উত্পাদন বাড়াতে পারে ইরান
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, বর্তমানে যে ভবে নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে, তা যদি আরও স্থায়ী হয়, তাহলে ইরান অশোধিত তেলের উত্পাদন অনেকটা বাড়াতে শুরু করে দেবে। স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফয়সল আলসামেরি সম্প্রতি রাশিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যম স্পুটনিক-কে জানিয়েছেন, ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরঘাচি ঘোষণা করার পর যে ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রফতানির ওপর থাকা বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়েছে, তার জেরে দেশটি চার থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে দৈনিক প্রায় ১৬ লক্ষ ব্যারেল পর্যন্ত অতিরিক্ত তেল উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে পারে। জুলাই মাস থেকেই ইরানের তেল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে।
তবে তিনি সতর্কও করছেন, রফতানির বিধিনিষেধ তুলে নেওয়াই সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। ইরানের তেল রফতানি পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে এখনও একাধিক বড় বাধা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কিং লেনদেনের সীমাবদ্ধতা, জাহাজের বিমা সংক্রান্ত জটিলতা, তেল পরিবহণের সমস্যা, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি। সবচেয়ে বড় বিষয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সমঝোতা কতদিন স্থায়ী হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তাও।