Ajoy Mukherjee : বাংলার অ-কংগ্রেসি সরকারের জন্মদাতা, ৩ বারের মুখ্যমন্ত্রী; তাঁর আমলেই রাজ্যে জরুরি অবস্থা

স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তিনি কংগ্রেস দলে জনপ্রিয় হতে শুরু করেন। ফলে তাঁকে ১৯৬৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি করা হয়।  

Advertisement
বাংলার অ-কংগ্রেসি সরকারের জন্মদাতা, ৩ বারের মুখ্যমন্ত্রী; তাঁর আমলেই রাজ্যে জরুরি অবস্থা  অজয় মুখোপাধ্যায়
হাইলাইটস
  • পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথম অ-কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্য়ায়
  • তাঁর রাজত্বকালে পশ্চিমবঙ্গ সব থেকে বেশি অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছে

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথম অ-কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্য়ায়। তাঁর রাজত্বকালে পশ্চিমবঙ্গ সব থেকে বেশি অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছে। তিনবারের মধ্যে একবারও পূর্ণাঙ্গ সময়ের জন্য পদে থাকতে পারেননি। প্রতিবারই ক্ষমতা থেকে যাওয়ার পরই রাজ্যে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে। 

অজয় মুখোপাধ্যায়ের শৈশব ও লেখাপড়া 

অজয় মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ৫ এপ্রিল ১৯০১ সালে। তৎকালীন মেদিনীপুর জেলার তমলুকে। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী, শান্তস্বভাব ও শৃঙ্খলাপরায়ণ ছিলেন। পরিবারে দেশপ্রেমের আবহ এবং সমকালীন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রভাব ছিল। 

তামলুকেই তাঁর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়। ছাত্রাবস্থাতে তিনি রাজনীতি ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের প্রতি আকৃষ্ট হন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় আসেন এবং স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আনে। দেশের স্বাধীনতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি আইনপেশা বা স্থায়ী চাকরির পথে না গিয়ে জাতীয় আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ছাত্রজীবনের আদর্শবাদ, দেশপ্রেম ও নেতৃত্বগুণই পরবর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।

রাজনীতিতে প্রবেশ ও কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে দল গঠন 

অজয় মুখোপাধ্য়ায়ের রাজনৈতিক জীবন যেমন বর্ণময় তেমনই বিতর্কিত। গান্ধীজির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি অসহযোগ ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নেন। ১৯৪২ সালে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কংগ্রেস দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। 

অজয় মুখোপাধ্যায় প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নেন ১৯৫২ সালের প্রথম পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে। স্বাধীনতার পর এটিই ছিল রাজ্যের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। তিনি তমলুক কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন এবং বিধায়ক হন। এরপর ১৯৫৭ ও ১৯৬২ সালেও তিনি নির্বাচনে জিতে বিধানসভায় যান। 

স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তিনি কংগ্রেস দলে জনপ্রিয় হতে শুরু করেন। ফলে তাঁকে ১৯৬৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি করা হয়।  

Advertisement

তবে সেই সময়টা রাজ্যের রাজনীতির সংকটকাল। খাদ্য আন্দোলন, মহামারি, ছাত্র আন্দোলনে তখন জর্জরিত পশ্চিমবঙ্গ। তার জেরে কংগ্রেস নেতৃত্বের মধ্য়ে মতানৈক্য দেখা যায়। তখন আর সেই দলে থাকেননি অজয় মুখোপাধ্যায়। ১৯৬৬ সালে বাংলা কংগ্রেস গঠন করেন। ১৯৬৭ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পথ তৈরি করে। সুশীল কুমার ধারার মতো বিশিষ্ট নেতা যোগ দিয়েছিলেন বাংলা কংগ্রেসে। দক্ষিণবঙ্গ ও মেদিনীপুরের বহু নেতা-কর্মী হাত ধরেছিলেন অজয় মুখোপাধ্যায়ের। 

মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় ও রাষ্ট্রপতি শাসন 

অজয় মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরেই পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার অকংগ্রেসি সরকার গঠিত হয়। বামেদের সঙ্গে জোট তৈরি করে সরকার বানান তিনি। পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসকে প্রথম ধাক্কা দিয়েছিলেন এই অজয় মুখোপাধ্যায়ই। তবে তাঁর তৈরি তিনটি সরকারের মধ্যে কোনওটা স্থায়ী হতে পারেনি। কোনও সরকার কয়েক মাস ও কোনও সরকার কয়েক বছরের মধ্যেই পড়ে যায়। কিন্তু অজয় মুখোপাধ্যায়ের বাংলা কংগ্রেস দলের জন্যই প্রথমবার বঙ্গের রাজনীতিতে বিরোধী দল হয় জাতীয় কংগ্রেস। 

১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করেন অজয় মুখোপাধ্য়ায়। তিনিই হন মুখ্যমন্ত্রী। সিপিএম, সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লকসহ বিভিন্ন বামপন্থী ও আঞ্চলিক দল হাত মিলিয়েছিলেন বাংলা কংগ্রেসের সঙ্গে। কিন্তু দলগুলির মধ্যে মতবিরোধ ও প্রশাসনিক অস্থিরতার কারণে সেই সরকার বেশিদিন টেকেনি। মার্চে সরকার গড়লেও সেই বছরেরই নভেম্বরে ক্ষমতা থেকে চলে যান অজয়  মুখোপাধ্যায়। এর পর প্রগ্রেসিভ ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের সরকার গঠন করা হয়। যার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। সেই সরকারেরও মেয়াদ ছিল মাত্র কয়েক মাস। এরপর রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়। ফের ১৯৬৯ থেকে ১৯৭০ সালে পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার আসে, যেখানে আবারও মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন অজয় মুখোপাধ্যায়। এই সময়কাল ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ থেকে মার্চ ১৯৭০ পর্যন্ত স্থায়ী থাকে এবং এরপর ১৯৭০ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি শাসন আরোপিত হয়। ১৯৭১ সালে আবার তৃতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়, মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন অজয় মুখোপাধ্যায়, এবং সেই সরকারের মেয়াদও ছিল কয়েক মাসই। ১৯৭১ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত রাজ্যে পুনরায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অবদান 

অজয় মুখোপাধ্যায় চেয়েছিলেন ভোটের মাধ্যমে একটা স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে। সেজন্য বারবার সরকার গঠন করেছেন তিনি। চেয়েছেন সরকার পরিচালনা করতে। তিনিই প্রথম কংগ্রেসের প্রভাব কমে যাওয়ার পর রাজ্যের বিভিন্ন বাম ও আঞ্চলিক দলগুলিকে একত্রিত করে জোট সরকার চালু করেছিলেন। এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বহুদলীয় জোট ব্যবস্থার এক শক্তিশালী উদাহরণ তৈরি করেছিল। 

অজয় মুখোপাধ্যায়ের সরকার কৃষি ও শ্রমিক সমস্যার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন। যুক্তফ্রন্ট সরকারের অধীনে কিছু প্রাথমিক সামাজিক ও শ্রমিক নীতি নেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বামপন্থী সরকারের নীতি প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছিল।

সাধাসিধে জীবন যাপন, প্রণব মুখোপাধ্যায়ের গুরু 

অজয় মুখোপাধ্যায় গান্ধী মনোভাবাপন্ন ছিলেন। আজীবন সাদা খদ্দরের পাঞ্জাবি ও হাঁটুর উপর ধুতি পরতেন। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান হলেও ব্যক্তিগত জীবনে তার কোনও প্রভাব পড়তে দেননি। ১৯৮৬ সালে ২৭ মে মারা যান তিনি। শেষ জীবনে তাঁর দেখাশোনা করতেন এক আদিবাসী কন্য়া। 

১৯৭২ সালে তমলুক থেকে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক কাজকর্ম থেকে সরে যাচ্ছিলেন। ৭৭ সালে লোকসভা নির্বাচনে স্বাধীনতা আন্দোলনের সহযোদ্ধা সতীশ সামন্ত সুশীলকুমার ধাড়ার কাছে পরাজিত হলে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নেন। তারপর আর তমলুকে থাকেননি। চলে আসেন কলকাতায়। 

ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্য়ায় অজয় মুখোপাধ্যায়কে রাজনৈতিক গুরু বলে মানতেন। প্রণব মুখোপাধ্যায় নিজে যখন যুবক তখন অজয় মুখোপাধ্যায়কে দেখেই কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। 

POST A COMMENT
Advertisement