পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ২০২৬বাংলার রাজনীতি এই মুহূর্তে দ্বিখণ্ডিত। না, একে বাইনারি বলে উড়িয়ে দিলে হবে না। এটিও একটি অ্যাজেন্ডা। বস্তুত, যিনি বাইনারি বলে এটিকে দাগিয়ে দিচ্ছেন, সেটাও একটি অ্যাজেন্ডা। যে দুই খণ্ডন হয়েছে, তার একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস ও অন্যদিকে বিজেপি। তার বাইরে তৃতীয় বা চতুর্থ শক্তি উঠে আসার জায়গা কিন্তু এই দুই দল তৈরি হতে দেয়নি অথবা দিচ্ছে না।
ঠিক এখানেই খেলা! আসলে ২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়ে বলতে গেলে ২০২১ টানতেই হবে। বিশেষ করে তৃণমূল ও বিজেপি-র প্রচারের অ্যাজেন্ডা। যা আদতে বদলেও বদলায়নি। শুধু এক হাত থেকে অন্য হাতে গিয়েছে মাত্র? নাকি মমতার পথেই শেষ পর্যন্ত হাঁটতে হল বিজেপি-কে? যেখানে একের পর এক মন্দির তৈরি করতে উঠেপড়ে লেগেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে বিজেপি তাঁদের ইশতেহারে জোর দিচ্ছেন মেয়েদের প্রতিমাসে ৩ হাজার টাকা এবং বেকারভাতা, যতদিন না কোনও যুবক চাকরি পাচ্ছেন।
২০২১ ও ২০২৬-এর ইশতেহার ও বিজেপি
২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঠিক নির্বাচনের মুখে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার কার্যকর করে মহিলাদের বিপুল ভোট টেনেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, হিন্দু ভোটও বিজেপি-র চেয়ে বেশি পেয়েছিলেন। সেই বছর কিন্তু বিজেপি ভাতায় জোর দেয়নি। বরং মন্দির, জয় শ্রীরাম স্লোগানেই ভোট বৈতরণী পার করতে চেয়েছিল। তাতে কতটা সফল হয়েছিল, তা তো রেজাল্টই বলছে। একুশে বিজেপি যে ইশতেহার বাংলার জন্য প্রকাশ করেছিল, যার পোশাকি নাম ছিল সঙ্কল্প পত্র, সেই ইশতেহারে ভাতা নিয়ে তেমন কোনও ঘোষণা ছিল না।
চুম্বকে সেই ইশতেহারে যা ছিল, তার নির্যাস হল,
নাগরিকত্ব (CAA): ক্ষমতায় আসার প্রথম ক্যাবিনেটেই CAA কার্যকর করা হবে।
মহিলা নিরাপত্তা ও উন্নয়ন: সরকারি বাসে মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে যাতায়াত, সমস্ত সরকারি চাকরিতে ৩৩% সংরক্ষণ।
কৃষক কল্যাণ: ‘পিএম কিষান’ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের বছরে ১০,০০০ টাকা করে দেওয়া হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি কার্যকর, প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক এবং বিশ্বমানের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান: কলকাতার রূপান্তরের জন্য ২২,০০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা, কৃষকদের জন্য ৫,০০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল।
শ্রমিক ও কর্মচারী: সরকারি কর্মচারীদের জন্য সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর করা।
অনুপ্রবেশ রোধ: ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সিল করে অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা।
ভাণ্ডারের রাজনীতিতে কে এগিয়ে?
এবার আসা যাক ২০২৬ সালের ইশতেহারে। এখানেই ট্যুইস্ট। কমবেশি একই রয়েছে। কিন্তু অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার যোগ হয়েছে। শুধু যোগই হয়নি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে দেড় হাজার দিচ্ছেন। বিজেপি-র প্রতিশ্রুতি, তারা ক্ষমতায় এলে ৩ হাজার টাকা করে দেবে। অর্থাত্ দ্বিগুণ বেশি। এবং এই ৩ হাজার টাকায় বার বার জোর দিচ্ছে বিজেপি। অর্থাত্ বোঝা যাচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের যে হিট ফর্মুলা, তা কাজে লাগাতে মরিয়া গেরুয়া শিবির।
এবার আসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ট্র্যাটেজিতে। মমতা কাছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ছিলই। বিজেপি-র কাছে ছিল মন্দির রাজনীতি বা হিন্দুত্বের রাজনীতি। মমতা ছাব্বিশে টার্গেট করলেন সেই হিন্দুত্ব ও মন্দিরের রাজনীতিকেও। যার নির্যাস, দিঘায় জগন্নাথ মন্দির, শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দিরের ঘোষণা, কলকাতার নিউ টাউনে দুর্গামন্দির। তার সঙ্গেই ভাতা রাজনীতির অতীতের অস্ত্র তো রয়েইছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাড়িয়ে দেড় হাজার করার পাশাপাশি দেড় হাজার টাকা করে বেকার ভাতাও যোগ হয়েছে ছাব্বিশে।
বিজেপি কি মমতার ট্র্যাপে পা দিল?
এখন প্রশ্ন হল, বিজেপি কি মমতার ট্র্যাপে পা দিল? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ এই প্রশ্নও তুলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ উদয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, 'দেখুন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জগন্নাথ মন্দির গড়ার পরিকল্পনা আরও আগেই ছিল। ২০১৬ সাল থেকে রেড রোডে দুর্গাপুজো কার্নিভাল শুরু হয়েছে। তখন বিজেপি-র এ রাজ্যে মাত্র ৩ জন বিধায়ক। মন্দির, ইদে নমাজের রেড রোডে যাওয়া, ইমাম ভাতা, এই সব অনেক থেকেই করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ধর্মকে রাজনীতিতে আনা পশ্চিমবঙ্গে অনেক আগে থেকেই চলছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়। এটি মমতার বিকল্প রাজনীতি বলতে পারেন। বিজেপি যেটা করছে, সেটা অবশ্যই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফলো করা। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপি মমতাকে ফলো করল।'
বিজেপি কি তাহলে ছাব্বিশে ভাতার রাজনীতিতে বাজিমাত করতে পারবে?
উদয়নের বক্তব্য, 'এই ধরনের ভাতা যাঁরা পান, যুবসাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, তাঁরা সমাজের মূলত অবহেলিত শ্রেণি। ফলে তাঁরা হাতে যেটা পাচ্ছেন,তার জোর অনেক বেশি, যেটা আশা দেওয়া হচ্ছে, তার থেকে। মধ্যপ্রদেশেও দেখবেন বিজেপি-র যে স্কিমগুলি রয়েছে, সেগুলি এত জোরাল, যে কংগ্রেস যদি দাবি করে, আমরা ক্ষমতায় এলে দ্বিগুণ দেব, তাও মানুষ বিশ্বাস করবে না। কারণ, যাঁরা পাচ্ছেন, সেই শ্রেণিটা অবহেলিত। তাই তাঁরা দ্বিগুণ শুনেই অন্য পার্টিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে, তা মনে হয় না। যারা ইতিমধ্যেই দিচ্ছে, তাদের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা বেশি থাকে। এই একই তত্ত্ব বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতেও খাটে।'