সম্প্রতি এক বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে জঙ্গলরাজ 'টার্ম' ব্যবহার করেন। একসময় বিহারে 'জঙ্গলরাজ' চলছে বলেই প্রচার করত বিজেপি। তবে এবার পশ্চিমবঙ্গেও সেই শব্দবন্ধনীর প্রয়োগ করছে গেরুয়া শিবির। সম্প্রতি এক বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেও সেই 'টার্ম' ব্যবহার করেন। বলেন, 'বাংলায় গত ১৫ বছরে মহা জঙ্গলরাজ তৈরি হয়েছে। তাই মানুষ এখন পরিবর্তন চাইছে।' আর ঠিক সেখানেই প্রশ্ন উঠছে; বিহারের রাজনীতিতে যে 'জঙ্গলরাজ' ইস্যু বিজেপি ব্যবহার করেছিল, সেই কৌশলই কি পশ্চিমবঙ্গে সমানভাবে কার্যকর হবে?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিহারে যেমন 'জঙ্গলরাজ' ঠেকানো হয়েছে, তেমনই পশ্চিমবঙ্গেও পরিবর্তনের সময় এসেছে। তাঁর কথায়, 'বিহারের পর গঙ্গা বাংলার দিকেই বয়ে যায়।' অর্থাৎ বিহারের মতো বাংলাতেও একই ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে চাইছে বিজেপি নেতৃত্ব। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একেবারেই আলাদা।
২০১৪ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখছে বিজেপি। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি উল্লেখযোগ্য সাফল্যও পেয়েছিল। সেই সাফল্যের ভিত্তিতেই ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা দখলের জন্য ঝাঁপিয়েছিল গেরুয়া শিবির। নন্দীগ্রামে সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন শুভেন্দু। তবুও ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূলই ক্ষমতা ধরে রাখে।
এ বার আবার নতুন করে 'জঙ্গলরাজ' ইস্যু তুলে আক্রমণ শানাচ্ছে বিজেপি। বিশেষ করে অনুপ্রবেশ, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি; এই সব বিষয়কে সামনে এনে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছে তারা। সিঙ্গুরের সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, অনুপ্রবেশকারীদের জন্য ভুয়ো নথি তৈরি করা হচ্ছে এবং তৃণমূল তাদের রক্ষা করছে। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যের প্রশাসন এই বিষয়ে কঠোর নয়।
অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই বিজেপির এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী শ্রমিকদের 'বাংলাদেশি' বলে চিহ্নিত করে হেনস্থা করা হচ্ছে। এই ইস্যুতে তিনি 'ভাষা আন্দোলনে'রও ডাক দেন।
মোদীর বক্তৃতায় সন্দেশখালি কাণ্ড, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা নিয়ে বিতর্কও উটে আসে। তাঁর দাবি, রাজ্যে নারী নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ তুলে দুর্নীতির অভিযোগও করেন। কেন্দ্রের বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প বাংলার মানুষ পুরোপুরি পাচ্ছেন না বলেও দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিহারের সঙ্গে বাংলার পরিস্থিতির অনেক পার্থক্য রয়েছে। বিহারে 'জঙ্গলরাজ' ইস্যু বলতে লালু প্রসাদ যাদবের আমলেরই ইঙ্গিত দেওয়া হত। সেই আমলে মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে অপরাধ ও দুর্নীতির অভিযোগ চরমে পৌঁছেছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সেই পরিস্থিতি নয়।
তৃণমূলের কিছু নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তি এখনও অনেকের কাছে স্বচ্ছ বলেই মনে করা হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরাও অনেক সময় এই বিষয়টি স্বীকার করেন। ফলে 'জঙ্গলরাজ' ইস্যু বাংলার ভোটারদের কতটা প্রভাবিত করবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলায় বিরোধী শিবিরও নেহাৎ কম নয়। বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি; তিন পক্ষের বিরোধিতার মুখেই রাজ্য রাজনীতি পরিচালনা করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এহেন পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠছে।
বিহারের 'জঙ্গলরাজ' মডেলকে সামনে রেখে বাংলায় রাজনৈতিক লড়াই জোরদার করার চেষ্টা করছে বিজেপি। কিন্তু বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই কৌশল কতটা সফল হয়, সেটাই দেখার।