বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ২০০০ সালের নভেম্বর মাস। শারীরিক অসুস্থতার কারণে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়ান জ্যোতি বসু। সেই ১৯৭৭ সাল থেকে রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে ছিলেন তিনি। জ্যোতি বসুর পরে বামফ্রন্ট্রের তরফে মুখ্যমন্ত্রী করা হয় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে। ২০১১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। তাঁর আমলেই ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে। তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য শিল্পায়নের জন্য একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার খেসারত দিতে হয়েছিল তাঁকে।
শৈশব ও লেখাপড়া
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জন্ম ১ মার্চ ১৯৪৪ সালে। কলকাতার এক সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যচর্চার পরিবেশে বড় হন। তাঁর পরিবারে বামপন্থী রাজনৈতিক চিন্তাধারার প্রভাব ছিল। বিখ্যাত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন বুদ্ধদেবের কাকা। অল্প বয়স থেকেই বইপড়া, হিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন। সেখান থেকেই স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রাবস্থাতেই বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ক্রমে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
ছাত্র আন্দোলন ও বুদ্ধদেব
কলকাতার ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্র আন্দোলন ও খাদ্য আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন বুদ্ধদেব। প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তনী, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাইপো হলেও, তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেন বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের ফসল হিসেবে। ১৯৬৬ সালে সি.পি.আই(এম) দলে যোগ দেওয়ার পর সংগঠনের কাজে জড়িয়ে পড়েন। দীনেশ মজুমদারের সঙ্গে সংগঠনগড়ার ভার নিয়ে, ১৯৬৮ সালে ত্যাগরাজ হলে দলের সম্মেলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। জীবনের প্রথম দিকে ভিয়েতনামের সমর্থনে আন্দোলন এবং তৎকালীন বাংলার খাদ্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে উঠে আসেন।
রাজনৈতিক জীবন
১৯৭৭ সালে বামফ্রন্টের প্রথম মন্ত্রিসভাতেই তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের দায়িত্ব পেয়েছিলেন বুদ্ধদেব। ১৯৯৬-এ পুলিশ তথা স্বরাষ্ট্র দফতরের দায়িত্ব পাওয়ার আগে পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনও দপ্তর বুদ্ধদেবের হাতে ছিল না। তবে বুদ্ধদেব ভালো সংগঠক ছিলেন না। পার্টির অভ্যন্তরে শ্যামল চক্রবর্তী, সুভাষ চক্রবর্তী, বিমান বোস ও অনিল বিশ্বাসদের যে সাংগঠনিক তিক্ষ্মতা ছিল, তা বুদ্ধদেবের মধ্যে ছিল না। তবে তিনি ভালো প্রশাসক ছিলেন। সেজন্য সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেই তিনি একাধিক দফতর দক্ষতার সঙ্গে সামলেছিলেন।
রাজনৈতিক জীবনে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ওঠানামা ছিল। চরিত্রের দিক থেকেও ছিলেন বর্ণময়। যেমন নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় জ্যোতি বসুর সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য হয়েছিল। সেই কারণে বছরখানেক মন্ত্রিসভার বাইরে ছিলেন। সেই সময়ও ভাবা হয়নি তিনি জ্য়োতির উত্তরসূরী হতে পারেন। কিন্তু পরীক্ষা নীরিক্ষার জন্য ১৯৯৬ সালেই তাঁকে স্বরাষ্ট্র দফতরের মন্ত্রী করা হয়। এরইমধ্যে রাজ্যে আত্মপ্রকাশ করে তৃণমূলল কংগ্রেস। ১৯৯৮ সালে ভোটেও লড়ে তারা। সাতটি আসন পায়। ফলে জ্যোতি বসুর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে ১৯৯৯ সালে বুদ্ধদেবকে উপমুখ্যমন্ত্রী করা হয়। সেই থেকে দলে তাঁর প্রভাব বাড়তে থাকে। ক্রমাগত জননেতা হয়ে উঠতে শুরু করেন।
মুখ্যমন্ত্রিত্ব ও বিতর্ক
জ্যোতি বসুর অসুস্থতার কারণে ২০০০ সালের নভেম্বর মাসে মুখ্যমন্ত্রীত্বের শপথ নেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তাঁর নেতৃত্বেই পরের বছর ভোটে ফের ক্ষমতায় আসে বামেরা। এরপর ২০০৬ সালেও জয় পায় বামেরা। পরপর দুবারই তাঁর নেতৃত্বে সরকার চলে। তবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে সরকার চালাতে গিয়ে একাধিক সমস্যার মুখে পড়তে হয়। তার কারণ, তাঁর নীতি। কৃষি প্রধান পশ্চিমবঙ্গে শিল্পকেও গুরুত্বও দিতে চেয়েছিলেন তিনি। স্লোগান তোলেন, 'কৃষি আমাদের নীতি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ।' সেই মোতাবেক শিল্পপতিদের সঙ্গে কথাবার্তাও শুরু করেন তিনি। বাম কর্মী সমর্থকরা ব্র্যান্ড বুদ্ধ স্লোগানে শান দেন।
২০০১ সালে নির্বাচনে জয়ের পর দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠনের পর বুদ্ধস্পষ্টভাবে শিল্প ও বিনিয়োগকেই অগ্রাধিকার দেন। তাঁর স্লোগান ছিল, 'Doit now'। তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো ও ভারী শিল্পে বিনিয়োগ টানার উদ্যোগ নেন। ২০০৪-০৬ থেকে শিল্পায়নের গতি বাড়াতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ), অটোমোবাইল ও কেমিক্যাল হাব গড়ার পরিকল্পনা নেন। টাটা মোটরসের ছোট গাড়ি প্রকল্প সিঙ্গুরে আনার সিদ্ধান্ত ছিল সেই নীতিরই অংশ।কিন্তু শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণই বড় বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।সিঙ্গুরে জমি আন্দোলন এবং নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব প্রকল্প ঘিরে তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয়। এই জমি ইস্যুকে হাতিয়ার করে বামেদের তীব্র বিরোধিতা শুরু করতে থাকে তৃণমূল কংগ্রেস। একই সময় পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলে বৃদ্ধি পায় মাওবাদী সমস্য়া। কার্যত সেই অঞ্চলকে তারা মুক্তাঞ্চলে পরিণত করে দেয়। যার জেরে সেই সব এলাকায় বামেদের সংগঠনে বিরাট ধস নামে।
সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম সমস্যা এবং গণহত্যা
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলেই হুগলির সিঙ্গুরে টাটা মোটরসের ছোট গাড়ি কারখানা স্থাপনের জন্য কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা হয় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে। বিরোধীরা অভিযোগ তোলে যে বহু কৃষক জোরপূর্বক জমি দিয়েছেন। আন্দোলন শুরু হয় এবং দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর টাটা প্রকল্প রাজ্য ছেড়ে চলে যায়। বিষয়টি শিল্প বনাম কৃষিজমি বিতর্ককে তীব্র করে তোলে। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তথা তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নন্দীগ্রামেও প্রস্তাবিত কেমিক্যাল হাব প্রকল্পের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীদের আন্দোলন শুরু হয়। ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ পুলিশি অভিযানে গুলিচালনার ঘটনায় একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। এই ঘটনাকে বিরোধীরা গণহত্যা বলে অভিহিত করে, যদিও সরকার দাবি করেছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই অভিযান চালানো হয়েছিল।
নন্দীগ্রামের ১৪ মার্চের ঘটনাকে ঘিরে রাজ্য ও জাতীয় স্তরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। মানবাধিকার সংগঠন, বিরোধী দল এবং নাগরিক সমাজের একাংশ সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই দুই ইস্যুই বামফ্রন্ট সরকারের ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত হানে এবং পরবর্তীতে ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক পালাবদলের অন্যতম পটভূমি তৈরি করে।
ভোটে পরাজয় ও ক্ষমতার পালাবদল
২০১১ সালে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল হয়। ২৯৪ আসনের মধ্যে বামফ্রন্ট পায় মাত্র ৬২ আসন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজে যাদবপুর কেন্দ্র থেকে লড়েন। তবে হেরে যান। সরকার গঠন করে তৃণমূল কংগ্রেস। মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়। ফলে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে।
রাজনীতি পরবর্তী জীবন ও মৃত্যু
২০১১ সালের নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিনেই ৩৪ বছরের বাম শাসনের দায় নিজের ঘাড়ে নিয়ে পলিটব্যুরো থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব। কিন্তু পার্টি তা গ্রহণ করেননি। কিন্তু দিল্লিতে পলিটব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেন বুদ্ধদেব। ২০১২- থেকে পার্টি কংগ্রেসে যাওয়াও বন্ধ করে দেন। ২০১৫-তে বিশাখাপততনম পার্টি কংগ্রেসে দলের পলিটব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটি থেকেও স্বেচ্ছায় সরিয়ে নেন নিজেকে। ২০১৮-তে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী ও রাজ্য কমিটি থেকেও সরে যান। ৮ আগস্ট ২০২৪ সালে কলকাতার বাসভবনে প্রয়াত হন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।