মাছ ও মাংসের রাজনীতি বাংলায়'ভাত-মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙ্গালী সকল, ধানে ভরা ভূমি তাই মাছ ভরা জল।' সেই কবে লিখে গিয়েছেন কবি ঈশ্বর গুপ্ত। আবার বিজয় গুপ্ত ‘মনসামঙ্গল’-এ লিখলেন, 'মৎস্য কাটিয়া থুইল ভাগ ভাগ/ রোহিত মৎস্য দিয়া রান্ধে কলতার আগ।'
নিত্যদিনের বাঙালি জীবনে অতীতে কখনওই আমিষ, নিরামিষের লড়াই ছিল না। বাঙালি সকালে বা সন্ধ্যায় যেমন লক্ষ্মীর পুজোর ফুল কিনে আনে, তেমনই রবিবার পাঁঠার মাংসটাও। প্রকৃতপক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু-বাঙালির সাতদিনে সচরাচর আমিষ-নিরামিষের অলিখিত একটা ভাগ রয়েছে। বৃহস্পতিবার আর শনি নিরামিষ। বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুজো আর শনি বারের ঠাকুর। আবার নানা রকম ধর্মীয় আচার মেনে সপ্তাহে দু থেকে তিন দিন আমিষে মন দেয় বাঙালি। আবার দেখুন, গঙ্গাসাগর মেলায় কুম্ভের ছায়া যতই থাক, বাংলার এই তীর্থেও আমিষ-নিরামিষের দ্বন্দ্ব নেই।
বদলেছে বাংলার রাজনীতি
বাঙালির জীবনে বিশেষ বদল ঘটেনি। বদলেছে বাংলার রাজনীতি। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নয়া এন্ট্রি 'আমিষ বনাম নিরামিষ'। নয়া ন্যারেটিভও বলা যায়। ২০২১ সালেও বাঙালি অস্মিতাকে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। সেই ন্যারেটিভটাই রয়ে গিয়েছে ২০২৬ সালেও। সে বার ছিল, বহিরাগত। এবার মাছ-মাংস।
যার নির্যাস, বিধাননগরের বিজেপি প্রার্থী শারদ্বত বন্দ্যোপাধ্যায় একেবারে প্রমাণ সাইজের কাতলা মাছ নিয়ে প্রচার সারলেন। সেই ভাইরাল ঘটনায় আসলে মরিয়া প্রমাণের চেষ্টা, বিজেপি ক্ষমতায় এলে, বাঙালির মাছে হাত দেবে না। ওদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার দাবি করছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে মাছ, মাংস বন্ধ করে দেবে। বীরভূমে এক সমাবেশে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘ওরা (বিজেপি) আপনাদের মাছ খেতে দেবে না। মাংস, ডিম খেতে পারবেন না, বাংলায় কথা বললেও আপনাকে বাংলাদেশি বলা হবে।’ আবার বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের মন্তব্য, 'বাঙালি মাছ খাবে না! মাংস খাবে না! মাছ বাঙালিও, বিহারিও খাবে। ওরা আমাদের চম্পারণ মিট খাওয়াবে, আমরা ওদের কচি পাঁঠার ঝোল খাওয়াব।'
হঠাত্ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মাছ-মাংসের এন্ট্রি কেন?
ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী বিভিন্ন প্রদেশের খাদ্যাভ্য়াস বিভিন্ন হয়। মূলত, নদীমাতৃক বা সমুদ্র উপকূলে থাকা রাজ্যগুলির খাদ্যাভ্যাসে মাছ, মাংস থাকে। নির্ভর করে অঞ্চলের জলবায়ুর উপরেও। যেহেতু বাংলা বরাবরই একটি নদীমাতৃক প্রদেশ ছিল, তাই খাদ্যাভ্যাসে মাছের ওপর নির্ভরতা ছিল স্বাভাবিক। পুরাণবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ির কথায়, 'বাল্মীকির রামায়ণে স্বয়ং ভগবান রাম বলেছেন, মানুষ তাদের খাদ্যের অংশ এমন খাবারই নিবেদন করে। বাঙালিরা বরাবরই মাছ ও মাংস খেয়েছে, যে কারণে তারা তাদের দেব-দেবীকে একই খাবার নিবেদন করে। বাল্মীকি রামায়ণ জুড়ে এমন একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে যেখানে আমরা রাম ও সীতাকে মাংস খেতে এবং এমনকী প্রার্থনায় তা নিবেদন করতেও দেখতে পাই।'
কোন ন্যারেটিভ ছড়ালে পাবলিক খাচ্ছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ
দেশের বড় রাজ্যগুলির মধ্যে আমিষের জন্য খরচের হার বাংলায় সর্বাধিক খাওয়া খরচের ২০% আমিষে বরাদ্দ। জাতীয় গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। সেই বাংলায় মাছ-মাংস ভোটের ভাষ্য রাজনীতিতে নতুন বৈকি! রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভময় মৈত্রের কথায়, 'যে রাজনৈতিক দলগুলি অনেক দিন ক্ষমতায় থাকে, তাদের কাছে একটি বড় ফান্ড থাকে। তার জেরে কোনও একটি ন্যারেটিভ তাদের পক্ষে ফিক্সড করা সহজ হয়। স্বাভাবিক ভাবেই ন্যারেটিভ প্রচারের ফান্ডিং কেন্দ্রের শাসদক দল বা রাজ্যের শাসকদের কাছে বেশি থাকবে। বিজেপি ও তৃণমূলেরও কিছু জনমুখী কাজকর্ম আছে। দেশ তো একেবারে পিছিয়ে যায়নি। পশ্চিমবঙ্গের কিছু সূচক তো ভালও আছে। তৃণমূলের খারাপ সূচক দুর্নীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা। আবার বিজেপিরও অনেক অবদান রয়েছে। মাথার উপর ছাদ দেওয়া বা কৃষকদের টাকা দেওয়া। কিন্তু দুই দলই উন্নয়ন নিয়ে কোনও ন্যারেটিভ ছড়াতেই চাইছে না নির্বাচনের আগে। ন্যারেটিভ ছড়ানোর ক্ষেত্রে বিজেপি ও তৃণমূল, একে অপরের পরিপূরক! যাতে দুজনের ভোটের যোগফল বেশি হয় এবং বাকিদের কমে যায়। এটাই মূলত দুই দলের লক্ষ্য। সুতরাং দু পক্ষকে এমন ন্যারেটিভ ছড়াতে হবে, যাতে দুই পক্ষেরই ভোট ম্যাক্সিমাইজ হয়।'
তাঁর মতে, কোন ন্যারেটিভ ছড়ালে পাবলিক খাচ্ছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন বা শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, দেশের নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনার থেকে দুই দলের ডেটা অ্যানালিটিক্স টিম দেখেছে সার্ভে করে দেখেছে, এগুলির থেকে অনেক বেশি কাজ করবে বাঙালি, অবাঙালি, সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘু, চাকরি নিয়ে দুর্নীতি ইত্যাদি। বাঙালি ও অবাঙালির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ন্যারেটিভ হল, মাছ খাওয়া ও মাছ খাওয়া। উত্তর ভারতের অনেকেই নিরামিষ খান। দক্ষিণ ভারতেও উচ্চবর্ণের বহু মানুষ নিরামিষ খান। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কনিউফিশনটা বেশি। পশ্চিমবঙ্গে এই আলোচনা ভীষণ ভাবেই প্রভাব ফেলবে। এটা নিশ্চয়ই তৃণমূল কংগ্রেস ডেটা অ্যানালিসিসের মাধ্যমে আইডেন্টিফাই করে দেখেছে। নির্বাচনের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রভাব পড়বে। তৃণমূলের প্রথম চাহিদা, নিজেদের ভোট ম্যাক্সিমাইজ করা। দ্বিতীয় চাহিদা, বিরোধী বিজেপি-র ভোট ম্যাক্সিমাইজ করা ও তৃতীয় চাহিদা, এই ভোট দুই দলের মধ্যেই রাখা।