প্রতীকী ছবি কথায় আছে 'মাছে ভাতে বাঙালি'- সেই মাছই এখন বাংলার বিধানসভা ভোটের প্রচারের অস্ত্র। সেই অস্ত্রে শান দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুজনে যেখানেই সভা-সমিতি করছেন, মাছের প্রসঙ্গ তুলে একে অপরকে তুলোধনা করছেন। দেখেশুনে অনেকের মশকরা, 'বাঙালির মাছ প্রীতির কথা সবাই জানেন। তবে দেশের ও রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান যেভাবে প্রচার শুরু করেছেন তাতে মাছেরাও লজ্জা পাবে! রাজনীতির মঞ্চে মীনরা এত প্রাধান্য কোনওকালে পায়নি। যা অবস্থা তাতে মাছ নিয়ে যারা যত বেশি প্রচার করতে পারবে, তাদের ভাগ্যের শিকে ছিঁড়বে হয়তো।'
মাছেদের ময়দানে নামায় তৃণমূল কংগ্রেসই। ছাব্বিশের ভোট প্রচারে মাছ-কে হাতিয়ার করে প্রচার শুরু করেছিলেন মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়। জায়গায় জায়গায় দাবি করেন, 'বিজেপি ক্ষমতায় এলে মাছ-মাংস বন্ধ করে দেবে। ওরা বাঙালির খাদ্যাভ্যাস পছন্দ করে না।' আর তা শুনে মমতাকে ভুল প্রমাণিত করতে রীতিমতো কাতলা নিয়ে বাজার-পাড়া-মহল্লায় ঘুরতে শুরু করেন পদ্ম-প্রার্থীরা। তাঁরা মনে করেছিলেন, এভাবে মাছেদের হাতে নিয়ে প্রমাণ করে দেবেন, তাঁরা পাতেও মাছ রাখার পক্ষপাতী। তবে থামার পাত্রী নন, মুখ্যমন্ত্রী নিজেও। তিনি আরও মাছ-অস্ত্রে শান দেন। প্রায় সব জনসভায় বলতে থাকেন, 'বিজেপি এলেই মাছ বন্ধ। আমাদের রাখলে মাছ পাবেন, মাছ খাবেন।'
মমতার এহেন প্রচারে কতটা সাড়া মিলেছিল তা অবশ্য জানা যায়নি। কিন্তু একটুও ঝুঁকি নেয়নি গেরুয়া শিবির। মমতাকে ডজ করতে মাঠে নেমে পড়েন খোদ প্রধানমন্ত্রী। আর তাতেই জমে ওঠে 'মাছ মাছ খেলা'। এই বাংলার মানুষের মাছের প্রতি ভালোবাসাকে তিনি সম্মান তো করেনই বরং দিদির আমলেই নাকি বাঙালি মাছের সঙ্কটে ভুগছে- এমনটা দাবি করেন। তাতে আরও শোরগোল পড়ে যায়। কে সত্যি আর কে মিথ্যা জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠে আম আদমি।
সম্প্রতি মোদী দাবি করেন, বাংলায় মাছের চাহিদা খুব বেশি। অথচ সেই চাহিদা পূরণ করতে পারে না তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকার। ফলে বাঙালিকে তার প্রিয় খাদ্য পাতে পেতেও অন্য রাজ্য়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। তারা পাঠালে তবেই মাছ জায়গা পায় পাতে।
যদিও সেই দাবি মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নাকচ করে দেন মমতা। তিনি পাল্টা দাবি করেন, আগে রাজ্য সরকার হায়দরাবাদ থেকে মাছ আমদানি করত ঠিকই, এখন বাংলায় ৮০ শতাংশ মাছ উৎপাদিত হয়। তাই বাঙালির মাছ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই।
এ তো গেল দুই দলের, দুই নেতা-নেত্রীর কথা। কিন্তু মাছেদের নিয়ে এই তথ্যগুলো কতটা সত্যি বা মিথ্যা, সেটা এবেলা জানা দরকার- এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। রসিকতা করে অনেকে বলছেন, ''যে মাছ নিয়ে এত দ্বন্দ্ব, এত দর কষাকষি, সেই মাছেরা আসলেই 'বহিরাগত' কি না সেটা একবার ঝালিয়ে নেওয়া প্রয়োজন বৈকি। এমনিতেই বহিরাগত তত্ত্বে শোরগোল রাজ্যজুড়ে। তাই পাতে যারা পড়ছে তারা কি এ রাজ্যেরই নাকি 'অনুপ্রবেশকারী'?''
তথ্য কিন্তু বলছে এখনও মাছের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় বাংলা। রাজ্যসভায় দেওয়া সরকারের লিখিত জবাব অনুযায়ী, বাংলাকে মাছের জন্য নির্ভরশীল থাকতে হয় সেই আফ্রিকার উপর। মৌরিতানিয়া ও উগান্ডার মতো দেশ থেকে তেলাপিয়া, চিংড়ি, ইলিশও আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে উগান্ডা থেকে চিংড়ি মাছই এসেছিল ১ কোটিরও বেশি টাকার।
ইলিশ নিয়ে বাঙালির সেন্টিমেন্টের কথা সবার জানা। চাহিদা মেটাতে রুপোলি শস্য বাংলাদেশ থেকেও আনাতে হয়। তবে সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে সেই মাছ কিন্তু প্রতিবার প্রয়োজন মতো আসে না। তখন বাঙালিকে নির্ভর করতে হয় 'মাছ বিরোধী' গুজরাতের দিকেই। তবে মমতা দাবি করেছেন, এখন রাজ্যে ইলিশ সহজলভ্য। ডায়মন্ডহারবারে নাকি গবেষণা কেন্দ্রও গড়ে তোলা হয়েছে।
তাহলে কী দাঁড়াল? কেন্দ্র বলছে, 'পশ্চিমবঙ্গ মাছে স্বনির্ভর নয়'। আর মমতার দাবি, 'মাছেও এগিয়ে বাংলা।' কিন্তু দুর্ভাগ্য়ের বিষয়, যাদের নিয়ে এত কথা সেই মাছেরা বলতে পারবে না, তারা কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়, তারা বিজেপি না তৃণমূল? তবে তাদের ভাষা বুঝতে পারলে নির্ঘাত শোনা যেত, 'যার পাতে থাকি, আমি তার।'