
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর তীক্ষ্ণ ও চটজলদি মন্তব্যের জন্য বরাবরই পরিচিত। প্রার্থী তালিকা ঘোষণার মঞ্চেও তিনি সেই স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই একের পর এক কটাক্ষ ছুড়ে দিয়েছেন। অনেকের মতে, তাঁর এই ‘পাঞ্চলাইন’-এর ধার অনেকটাই স্মরণ করিয়ে দেয় লালু প্রসাদ যাদব-এর বিখ্যাত রসবোধকে।
মঙ্গলবার তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা ঘোষণার সময় মমতা ছিলেন একেবারে ফর্মে। বাংলা ও ইংরেজির মিশেলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে রাজনৈতিক আক্রমণ, ব্যঙ্গ এবং আত্মবিশ্বাসের ঝলক। তাঁর বক্তব্যের ১০টি উল্লেখযোগ্য দিক নীচে তুলে ধরা হলো-
১. ‘লাইন নয়, এবার বি-লাইন’
ভোটারদের লাইনে দাঁড় করিয়ে হয়রানির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এবার জনগণই ‘বি-লাইন’ করে বিজেপিকে সরিয়ে দেবে। 'দিল্লির লাড্ডু কখনোই জিতবে না,' এই মন্তব্যে ছিল আত্মবিশ্বাসের সুর।
২. ‘রাজ্যে সুপার ইমার্জেন্সি’
কেন্দ্রীয় শক্তির বিরুদ্ধে সরব হয়ে তিনি দাবি করেন, রাজ্যে এক ধরনের ‘সুপার ইমার্জেন্সি’ চলছে এবং কার্যত রাজ্য সরকারকেই নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
৩. ‘টনসিল’ মন্তব্যে কটাক্ষ
আরএসএস-ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তিকে ‘টনসিল’ বলে ব্যঙ্গ করে তিনি বলেন, ওই ব্যক্তিই নাকি রাজ্যের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছেন। যা নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেন তিনি। তাঁর কথায়, আরএসএস-এর কিছু লোক এখানে এসে জুটেছে। আরএসএস-এর পুরনো প্রজন্মের নেতাদের প্রতি আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু এই নতুন আগতরা এখন ‘দশম স্তরের’ আরএসএস সদস্যে পরিণত হয়েছে। তারা হরিয়ানা থেকে লোক নিয়ে এসেছে। অথচ তারা নিজেরাই হরিয়ানার পরিস্থিতি সামলাতে পারে না। তারা ‘টনসিল’ নামের এক ব্যক্তিকে নিয়ে এসেছে, এটি অবশ্য তার ডাকনাম। সেই ব্যক্তিই এখন রাজ্যের মুখ্যসচিব কে হবেন, তা ঠিক করে দিচ্ছে। তার উচিত নিজের ‘টনসিল’-এরই চিকিৎসা করানো। নগদ অর্থ বিলি করা এবং রাজ্যে অস্ত্র ও মাদক পাচারের উদ্দেশ্যেই এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সূত্রের খবর, টনসিল বলতে মমতা হরিয়ানা থেকে আগত কোনও সঙ্ঘ ঘনিষ্ট কোনও নির্বাচন কমিশনের উচ্চপদস্থ অফিসারকে বোঝাতে চেয়েছেন।
৪. ‘রাজনৈতিকভাবে শ্বাসরুদ্ধ করুন’
বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে তিনি কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, 'ওদের শ্বাসরুদ্ধ করে দিন”', তবে তা যেন শুধুই রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
৫. ‘জোড়াফুলে ভোট দিন’
তৃণমূলের প্রতীক জোড়াফুলে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তাঁর দাবি, ২০২৬ সালে ২২৬টি আসনে জয় পাবে দল।
৬. ‘এত লোভ কেন?’
নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি কটাক্ষ করেন, 'বাংলার জন্য এত লোভ কেন?'
৭. ‘বেটি বাড়াও, বেটি বাঁচাও’ প্রসঙ্গ
কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রকল্পের অধিকাংশ অর্থ প্রচারের পেছনেই খরচ হয়ে যায়, বাস্তবে কাজ কম।
৮. ‘গ্যাস নেই, কিন্তু টাকা আছে’
দামবৃদ্ধি ও জনজীবনের সমস্যার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মানুষের কাছে গ্যাস নেই, অথচ সভা-সমাবেশের জন্য নগদের অভাব নেই।
৯. ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগ
মতুয়া, রাজবংশী, সংখ্যালঘু, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, 'সবাইকে বাদ দিয়ে কি নির্বাচন সম্ভব?'
১০. ‘কোনও অনুপ্রবেশকারী নেই’
সবশেষে স্পষ্ট ভাষায় তিনি বলেন, 'বাংলায় কোনও অনুপ্রবেশকারী নেই। যারা বাইরে থেকে এসে ভোট লুট করতে চায়, তারাই আসল অনুপ্রবেশকারী।'
সব মিলিয়ে, প্রার্থী তালিকা ঘোষণার মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বার্তাই নয়, বরং তাঁর স্বভাবসিদ্ধ তীক্ষ্ণ ভাষা ও আত্মবিশ্বাসের এক ঝলকও তুলে ধরেছে।