
নদিয়ার নাকাশিপাড়া ব্লকের চন্দনপুর, একটি শিক্ষিত, সচেতন ও কৃতীদের গ্রাম। প্রায় ৯৬ শতাংশ সাক্ষরতার হার, অসংখ্য ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক ও সরকারি কর্মীর উপস্থিতি, সব মিলিয়ে এই গ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই গর্বের প্রতীক। কিন্তু সেই গ্রামই এখন চরম অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভের কেন্দ্রে। ‘SIR’ বা সিস্টেম্যাটিক ইনফরমেশন ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ার পর হঠাৎ করেই ৮২১ জন বাসিন্দার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে।
গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই বাদ পড়ার পেছনে মূলত ‘কারিগরি ত্রুটি’ এবং তথাকথিত ‘যুক্তিগত অসঙ্গতি’ দায়ী। অনেক ক্ষেত্রে নামের সামান্য বানানভেদ, পদবির পরিবর্তন, অভিভাবকের নামের অমিল বা বয়সের গরমিল, এই সব কারণ দেখিয়েই নাম কেটে দেওয়া হয়েছে।
চন্দনপুর গ্রামের প্রায় ৮,০০০ মানুষের মধ্যে বড় অংশই এই সমস্যায়। চারটি আলাদা ভোটগ্রহণ অংশে বিভক্ত এই গ্রামে ‘পার্ট ৭০’ থেকে ‘পার্ট ৭৩’, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যাপক হারে নাম বাদ পড়েছে। কোথাও ১৬৬ জন, কোথাও ৩২৮ জন, সংখ্যাটা ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে বড় আঘাত হল, বহু বাসিন্দা শতবর্ষ পুরনো দলিল, ব্রিটিশ আমলের জমির কাগজ, পুরনো ভোটার তালিকা, সবকিছু জমা দেওয়ার পরও তাঁদের নাম ফেরানো হয়নি। এমনকি স্থানীয় এক বুথ-স্তরের আধিকারিক, যিনি নিজেই এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, তাঁর নামও বাদ পড়েছে শুধুমাত্র নামের সামান্য পরিবর্তনের কারণে।
এই পরিস্থিতিতে অনেকেই আপিল ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হলেও, সুপ্রিম কোর্ট ভোটার তালিকা স্থগিত রাখার আবেদন খারিজ করায়, আসন্ন নির্বাচনে তাঁদের ভোটাধিকার কার্যত বাতিল হয়ে গেছে। ফলে ২৭ লক্ষেরও বেশি মানুষ এই নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না বলে আশঙ্কা।
গ্রামের বাসিন্দাদের একাংশ মনে করছেন, প্রশাসনিক কঠোরতা যেমন দায়ী, তেমনই অতীতে নথিপত্রে অসাবধানতাও এই সমস্যাকে বাড়িয়েছে। অনেকেই হলফনামা ছাড়াই নাম বা পদবিতে পরিবর্তন এনেছিলেন, যা এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে নির্বাচন দফতরের দাবি, এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়া মূলত ভুয়ো ভোটার রুখতেই। কোনও ব্যক্তির সঙ্গে অস্বাভাবিক সংখ্যক সন্তানের নাম যুক্ত থাকলে সিস্টেম সেটিকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করে এবং অতিরিক্ত প্রমাণ চায়। তবে এই ‘কঠোরতা’ যে বহু প্রকৃত ভোটারকেও তালিকার বাইরে ঠেলে দিচ্ছে, তা এখন স্পষ্ট।
রাজনৈতিক মহলেও এই ইস্যুতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শাসক দলের অভিযোগ, নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করেই এই বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। যদিও প্রশাসন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সব মিলিয়ে, একটি শিক্ষিত ও সচেতন গ্রামের এত বড় সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার হারানোর ঘটনা শুধু প্রশাসনিক ত্রুটির প্রশ্নই তোলে না, বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপরও বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দেয়।