
সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কারও কাছে ভাল। কারও কাছে মন্দ। কোনও কাজ খারাপ। কোনও কাজ প্রশংসনীয়। আসলে মুখ্যমন্ত্রী পদটাই এরকম। এমনিতেই কোনও ব্যক্তি, তাঁর পরিসরে সকলের কাছে প্রিয় বা ভাল হয়ে উঠতে পারেন না। মুখ্যমন্ত্রী হলে তো, তা আরও বেশি চোখে পড়বেই। আতস কাচের তলায় ফেলে দেখা হবেই। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের ক্ষেত্রে যদি এই ভাবে দেখা যায়, তাহলে সাদা, কালো, ভাল, মন্দ মিলিয়ে এক বর্ণময় চরিত্র। নিন্দার ঝড় তাঁর পিছু ছাড়েনি আমরণ। কেউ বলেন কঠোর প্রশাসক। কেউ বলেন, একনায়কতন্ত্রের নির্মম শাসক।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নাতি
নামী বনেদি বংশের সন্তান। পড়াশোনাও বিস্তর। বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাশ। যতদিন বেঁচেছিলেন, আইনজীবী হিসেবে প্র্যাক্টিস চালিয়ে গিয়েছেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নাতি সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। দিদিমা বাসন্তী দেবী। মা অপর্ণা দেবী। বাবা বিশিষ্ট আইনজীবী ও কংগ্রেস নেতা সুধীর রায়। এহেন বংশে ১৯২০ সালে ২০ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন সিদ্ধার্থশঙ্কর। মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে স্কুলের পাঠ সেরে প্রেসিডেন্সি কলেজ, তার পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কলেজে পড়া শেষ করে বিলেতে ইনার টেম্পলে ব্যারিস্টার। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। স্বাধীন পশ্চিমবঙ্গের সপ্তম মুখ্যমন্ত্রী।
জরুরি অবস্থার সময়ে বিতর্কিত চরিত্র
অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের দাবি, ১৯৭৫ সালে ভারতে জরুরি অবস্থা জারির জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধী তখনকার রাষ্ট্রপতি সঞ্জীব রেড্ডিকে যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, তার খসড়া নাকি তৈরি করেছিলেন সিদ্ধার্থশঙ্কর। শুধু তা-ই নয়, ইন্দিরাকে তিনিই নাকি পরামর্শ দিয়েছিলেন ওই পদক্ষেপ করার। আবার এই সিদ্ধার্থশঙ্করই পরবর্তীকালে জরুরি অবস্থার সময়ে বাড়াবাড়ি পদক্ষেপ করার জন্য সঞ্জয় গান্ধীকে দায়ী করেছিলেন।

নকশাল দমন ও নির্মম শাসন
ষাটের দশকে কংগ্রেস রাজনীতিতে তিনি দ্রুত গুরুত্ব পেতে শুরু করেন। ১৯৭২ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু এই নির্বাচন নিয়েই ছিল তীব্র বিতর্ক। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটে ব্যাপক কারচুপি হয়েছিল। সেই অভিযোগের ছায়া তাঁর গোটা মুখ্যমন্ত্রীত্বকালকে অনুসরণ করেছে। ষাটের দশকে কংগ্রেস রাজনীতিতে তিনি দ্রুত গুরুত্ব পেতে শুরু করেন। ১৯৭২ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু এই নির্বাচন নিয়েই ছিল তীব্র বিতর্ক। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটে ব্যাপক কারচুপি হয়েছিল। সেই অভিযোগের ছায়া তাঁর গোটা মুখ্যমন্ত্রীত্বকালকে অনুসরণ করেছে। সিদ্ধার্থশঙ্কর এমন একটি সময়ে মুখ্যমন্ত্রী হন, যে সময় গোটা পশ্চিমবঙ্গ নকশাল আন্দোলনে জ্বলছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ার মুখে। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় কড়া হাতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পথ বেছে নেন। পুলিশের বিশেষ অভিযান, দেদার গ্রেফতারি, এনকাউন্টার, এসব নিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। সমর্থকেরা যদিও দাবি করেন, রাজ্যকে অরাজকতার হাত থেকে বাঁচাতে কঠোরতা প্রয়োজন ছিল। সমালোচকেরা বলেন, গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছিল।
জ্যোতি বসুর বন্ধু 'মানু'
সিদ্ধার্থশঙ্করের ডাকনাম ছিল মানু। ঘনিষ্ঠ মহলে মানুদা নামেই পরিচিত ছিলেন। বাম-কংগ্রেসের রাজনৈতিক শত্রুতা ছিল, কিন্তু জ্যোতি বসু ও সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের বন্ধুত্বে তার প্রভাব কখনও পড়েনি। জ্যোতি বসুর সঙ্গে পারিবারিক বন্ধুত্ব ছিল সিদ্ধার্থশঙ্করের। জ্যোতি বসুও লন্ডন থেকেই ব্যারিস্টারি পাশ করেছিলেন। জ্যোতি বসুকে সবাই 'বাবু' বলে সম্বোধন করলেও, 'মানু ও গনা'র মধ্যেই সব কিছুই ছিল না। নিখাদ বন্ধুত্ব ছাড়া। গনা ছিল জ্যোতি বসুর ডাকনাম।
১৯৭৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস পরাজিত হয় এবং বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে। এই ফলাফল শুধু এক সরকারের পতন নয়, বাংলার রাজনীতিতে দীর্ঘ এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমশ কমে আসে। তবু তিনি জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন রুচিশীল, সংস্কৃতিমনস্ক এবং স্পষ্টভাষী। তাঁর আত্মবিশ্বাস অনেক সময় ঔদ্ধত্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু বন্ধু-সহকর্মীদের মতে, তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা ও সিদ্ধান্তপ্রবণ নেতা।
সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়কে একমাত্র ‘কঠোর মুখ্যমন্ত্রী’ হিসেবে দেখলে পূর্ণ ছবি পাওয়া যায় না। তিনি ছিলেন এক পরিবর্তনশীল সময়ের প্রতিনিধি, যেখানে রাজনীতি, আইন ও প্রশাসন এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তাঁর শাসন বাংলায় বাম রাজনীতির উত্থানের পটভূমি তৈরি করেছিল, এ কথাও অনেক বিশ্লেষক বলেন।