scorecardresearch
 

Shankha Ghosh: 'শঙ্খ'হীন বাংলা! কবি-স্মৃতিতে মগ্ন বাংলা সাহিত্য জগত্‍

বাংলা সাহিত্যের এক যুগের অবসান। প্রয়াত বর্ষীয়ান কবি শঙ্খ ঘোষ (Shankha Ghosh)। আজতক বাংলাকে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে প্রয়াত কবির স্মৃতিচারণ করলেন বাংলা সাহিত্য জগতের প্রবাদপ্রতিমরা।

চিরবিদায় জানালেন কবি শঙ্খ ঘোষ চিরবিদায় জানালেন কবি শঙ্খ ঘোষ
হাইলাইটস
  • বাংলা সাহিত্যের এক যুগের অবসান।
  • প্রয়াত বর্ষীয়ান কবি শঙ্খ ঘোষ।
  • কবির স্মৃতিচারণ বাংলার সাহিত্য জগতের নক্ষত্রদের।

ফের শোকের ছায়া বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে। বুধবার সকালে সল্টলেকের বাড়িতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন বর্ষীয়ান কবি শঙ্খ ঘোষ (Shankha Ghosh)কোভিডে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।

বাংলা সাহিত্যের এক যুগের অবসান হল। জ্ঞানপীঠ পুরস্কার প্রাপ্ত এই কবির প্রয়াণে শোকস্তব্ধ সকলেআজতক বাংলাকে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে শঙ্খ ঘোষের স্মৃতিচারণ করলেন বাংলা সাহিত্য জগতের প্রবাদপ্রতিমরা। কবি সুবোধ সরকারের (Subodh Sarkar) কথায়, "শঙ্খ ঘোষের চলে যাওয়াকে আমি বলবো তিনি চলে যাননি, থেকে গেলেন। তিনি থেকে গেলেন বাংলা সাহিত্যে,  তিনি থেকে গেলেন ভারতীয় সাহিত্যে। গত সত্তর বছর ধরে তিনি বাংলা কবিতাকে যে উচ্চতায় তুলেছেন, সেই জায়গাটা অত্যন্ত গর্বের ও সম্মানের। সেই সম্মান গোটা ভারতবর্ষের। আমি তাঁকে একজন ভারতীয় কবি হিসাবে দেখে এসেছি। তিনি আমাদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হবেন।"

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (Shirshendu Mukhopadhyay) জানালেন, "এই বয়সেও তরুণ কবিদের সঙ্গে শঙ্খ দা'র থাকতো পিতৃসুলভ আচরণ। নানা রকম ব্যস্ততা ও সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কোনও একজন গ্রাম থেকে আসা তরুণ কবির কবিতা সঙ্গে সঙ্গে পড়ে দিতেন তিনি। কীভাবে লিখতে হয়, তাঁকে শেখাতেন, বোঝাতেন। তাঁর বাড়িতে যে কেউ যখন তখন যেতে পারতেন। কতজন এটা করতে পারে? এরকম স্নেহ, ভালবাসা, উদারতা আমি আজ পর্যন্ত কারও মধ্যে দেখি না। তিনি খুব কম কথা বলতেন এবং মন দিয়ে শুনতেন বেশি। খালি হাসতেন, চমৎকার রসবোধ ছিল তো... শুধু একটা জিনিস দেখেছি তিনি মাঝে মধ্যেই রাজনৈতিক মন্তব্য এক- আধটা করতেন। কারও সঙ্গে কোনও তর্ক -বিতর্কে জড়াতে দেখিনি যদিও। যা বলার থাকতো লিখেই সেটা জানাতেন। এছাড়াও অনেকই জানেন না তাঁর জ্ঞানপীঠ পুরস্কারের প্রাপ্ত সম্পূর্ণ অর্থ দিয়েছেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের যেই কর্মচারীরা বেতন পাচ্ছিলেন না, তাঁদের সাহায্যার্থে। এরকমই মানুষ ছিলেন শঙ্খ দা।"

শঙ্খ ঘোষকে অগ্রজ এবং গুরু মানতেন বর্ষীয়ান কবি জয় গোস্বামী (Joy Goswami)। তাঁর প্রয়াণ ব্যক্তিগতভাবে কবির কাছে অপূরণীয় ক্ষতি। জয় গোস্বামীকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে উনি কথা বলার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলেন না। 

বাচিক শিল্পী ঊর্মিমালা বসু (Urmimala Basu), প্রয়াত কবির লেখা 'বাবরের প্রার্থনা' কবিতার অংশ তুলে বললেন, "বর্তমান পরিস্থিতি দেখে আমার মনে ক'দিন ধরে ঘুরছিল 'না কি এ শরীরে পাপের বীজাণুতে কোনোই ত্রাণ নেই ভবিষ্যের মৃত্যু ডেকে আনি নিজের ঘরে?' কিন্তু আমরা তো সবাই মৃত্যু নিজেদের ঘরে নিজেরাই ডেকে আনছি। উনি অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু ভাবিনি চলে যাবেন। ৯০ বছরেও একজন সচল মানুষ ছিলেন শঙ্খ ঘোষ, থেকে যাবেন ওঁর কাজে। প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, নিরপেক্ষ! যেমন কবিদের হওয়া উচিত, সেরকমই ছিলেন তিনি। শঙ্খ ঘোষ বেঁচে থাকবেন ওঁর কাজে, কবিতায়, কথায়... কিন্তু এই চলে যাওয়াটা খুব বেদনাদায়ক।" শিল্পী আরও বললেন, "আমার একটা কথা খুব মনে পড়ছে "আমি তখন যাদবপুরে তুলনামুলক সাহিত্য নিয়ে এমএ পড়ছিলাম, আমাদের ফাইনাল পরীক্ষার দিন, পরীক্ষকদের স্থানে শঙ্খ ঘোষ, চিত্তরঞ্জন ঘোষ, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সহ আরও অনেকে একটা চমৎকার আড্ডা মারছিলেন। আর আমরা তখন পরীক্ষা দিচ্ছি। ওঁদের অপর তখন যা হিংসে হয়েছিল, যে কী নিষ্ঠুর আমাদের ফেলে ওঁরা আড্ডা মারছেন..." 

সাহিত্যিক প্রচেত গুপ্ত (Pracheta Gupta) বললেন, "শঙ্খ ঘোষের চলে যাওয়াটা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির যাবতীয় চর্চার জন্য একটা বড় শূন্যতা তৈরি করলো। তবে উনি যা দিয়ে গেলেন সেটা অনেক বড় দৃষ্টান্ত। একমাত্র শঙ্খ ঘোষই হচ্ছে সেই বিরল মনীষী যিনি এত বড় মাপের একজন মানুষ হওয়া সত্ত্বেও সমান চোখে নবীন ও প্রবীণদের দেখতেন। তাঁর কত যে সাহিত্যকৃত্তি চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে সেটা অভাবনীয়। কখনও মনের দিক থেকে তিনি ভেদাভেদ করেননি। যা সত্যিই একটা দৃষ্টান্ত। এই মানুষটি যা দেখিয়ে দিয়ে গেলেন, যা রেখে গেলেন, আমরা কী তার বিন্দুমাত্র অনুসরণ করতে পারবো না?"

কবি মন্দাক্রান্তা সেন (Mandakranta Sen) খুবই মর্মাহত এই খবরে। তিনি জানালেন, "আমি দ্বিতীয়বার পিতৃহীন হলাম। তিনি আমাদের বটবৃক্ষ ছিলেন। তবে তিনি হারিয়ে যাননি। তাঁর লেখার গভীরতার মধ্যে চিরদিন তিনি আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন। যে কোনও সামাজিক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বাংলা সভ্যতা ও সাহিত্য সংস্কৃতির একজন অভিভাবক বলা যায়। মন্দাক্রান্তা ছন্দ আমার তাঁর কাছেই শেখা। ভীষণ মন খারাপ। ভাল লাগছে না কিছু...  তাঁর কথা, আদর, আশ্রয় আমাদের চিরদিনের সম্পদ হয়ে থাকবে।" 

আরও পড়ুন: 'একটু আগুন দে...' বোবা-মুখে ধ্বনি দিয়েছিলেন শঙ্খ 

করোনা ভাইরাস কেড়ে নিচ্ছে বহু প্রাণ। আমরা ২০২০ সাল থেকেই একের পর এক হারিয়েছি বহু কিংবদন্তিদের। সেরকমই আরও একজন শঙ্খ ঘোষ। কবি চিরবিদায় জানলেও, তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টিতে, সকলের মননে।