পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়েছে। ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অন্ত হয়ে এরাজ্যে বিপুল জয় হয়েছে বিজেপি-র। রাজনীতিতে গ্ল্যামার দুনিয়ার তারকাদের হিড়িক গত কয়েক বছরের ট্রেন্ড। এত দিন যে তারকাদের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একই মঞ্চে দেখা যেত বা মিছিলের সামনে সারিতে দেখা যেত, সেসব তৃণমূলপন্থী তারকাদের নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে ভরেছে মিমে। নেটিজেনরা কটাক্ষ করছে, 'এবার আবার কি তাঁরা পাল্টি খাবেন', এই প্রশ্ন তুলে। সেরকমই গত কয়েকদিন ধরে শিরোনামে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।
২০২৫ সালে ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার সঙ্গে মতবিরোধের কারণে একাধিকবার চর্চার এসেছেন পরমব্রত। এরপর, এক ভিডিও বার্তায় ক্ষমা চেয়ে অভিনেতা- পরিচালক জানান, ফেডারেশনের বিরুদ্ধে আইনি পথে হাঁটা তাঁর হঠকারী সিদ্ধান্ত ছিল। শুধু তাই নয়, ফেডারেশনের সঙ্গে আর কোনওরকম আইনি জটিলতায় যেতে চান না বলেও জানান তিনি। এরপর থেকে রাজ্যের প্রাক্তন শাসন দলের ঘনিষ্ঠ বলেই জানা যায় তাঁকে। গত বছর কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চেও দেখা মেলে তাঁর। এবছর বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে প্রচার করেন পরমব্রত।
কাট টু, ২০২৬-র মে মাস। নির্বাচনের ফল ঘোষণা হওয়ার পর থেকে খুব একটা সামনে আসেননি পরমব্রত। এদিকে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, টলিউডের নানাবিধ সমস্যা সমাধানের দায়িত্বভার দিয়েছেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, পাপিয়া অধিকারী ও হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের উপর। বলা চলে, টলিউডের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন 'বিশ্বাস ব্রাদার্স' অরূপ এবং স্বরূপ বিশ্বাস। ব্যান কালচার, ফেডারেশনের 'দাদাগিরি' সব বন্ধ হবে, শিল্পী- কলাকুশলীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন এবং বাকি সব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন রূপা, রুদ্রনীলরা। এমনকি, বদল আসতে পারে ইন্ডাস্ট্রির একাধিক সংগঠনে। বুধবার সন্ধ্য়ায়, টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে এক বিশেষ বৈঠক ডাকা হয়। সেখানে, এতদিন ধরে চলা টেকনিশিয়ান, প্রযোজক, পরিচালকের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলছিল, তা নিয়ে দু'পক্ষকেই মুখোমুখি বসিয়ে সমস্য়ার সমাধানের পথ খোঁজা শুরু হয়। সেখানে রুদ্রনীল, পরমব্রত ছাড়াও হাজির ছিলেন ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, সৌরভ দাস, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, ফিরদৌসুল হাসান,অশোক ধানুকা, জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, শ্রীজিৎ রায় সহ আরও অনেকে।
এই বৈঠকে রুদ্রনীলের পাশে বসে সকলের সমস্যা শোনেন পরমব্রত। এই চিত্র দেখে সকলেরই শুরুতে অবাক হয়েছিলেন। এরপর, সেই বৈঠকেই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন অভিনেতা- পরিচালক। কিছুটা আগেবপ্রবণ হয়ে পরমব্রত উপস্থিত সকলকে বলেন, "আমি যে অধিকারে এখানে বসে কথা বলছি, আমার প্রাথমিক ধারণা, রুদ্র আর আমার ২৫ বছরের বন্ধুত্বের জন্য। রুদ্র ও আমার বন্ধুত্বের মধ্যে, যতটা বেশি বন্ধুত্ব রয়েছে, তার থেকে বেশি মত পার্থক্য রয়েছে। সেই মত প্রার্থক্য কখনও ব্যক্তিগত, কখনও রাজনৈতিকও। কিন্তু আমরা এই বন্ধুত্বের মধ্যে কখনও রাজনীতি আসতে দিইনি। আমার মনে হয়, আমাদের এই ইন্ডাস্ট্রিতে সবার আগে এটাই করা দরকার। আমার মনে হয় যাঁরা যাঁরা ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে থাকবেন, তাঁদের রুজি- রুটি, তাঁদের প্রাথমিক পেশা যেন সিনেমা হয়। এটা সবার আগে হওয়া দরকার। কারণ একজন সিনেমাকর্মী, তিনি একজন শিল্পী হতে পারেন, কলাকুশলী হতে পারেন, পরিচালক হতে পারেন, প্রযোজক হতে পারেন, এমনকী, ডিস্ট্রিবিউটার ও একজিবিটার হতে পারেন, একমাত্র তিনি বা তাঁরাই বুঝতে পারে, সিনেমার কীভাবে বিবর্তন ঘটছে। শুধুমাত্র একটা রাজনৈতিক কারণে, যদি একটা সংগঠনের মাথার উপর কাউকে বসিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আজকে যে পরিস্থিতিটা আমরা দেখছি, সেই পরিস্থিতির সম্মুখীন আবার হতে হবে। এই যে অনেকেই বলছেন, যে ২০১১ এর আগে আমরা খুব আনন্দে কাজ করতাম, তা আমিও স্বীকার করি। এই পরিবেশ আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। এখানে কেউ জয় বাংলা বলবেন, কেউ জয় শ্রীরাম বলবেন, কেউ বন্দে মাতরম বলবেন, কেউ লাল সেলাম বলবেন। কিন্তু সিনেমার কাজের সময় সেটা গুরুত্ব পাবে না।"
পরমব্রত আরও বলেন, "২০২৪ থেকে ২০২৫ জুড়ে আপনারা সবাই জানেন, একটা বিরোধ, একটা লড়াই শুরু হয়েছিল। যে লড়াইয়ে আমি প্রথম সারিতেই ছিলাম। ক্রমাগত বোঝাতে চেয়েছিলাম যে আমরা, নন মেম্বার নিয়ে কাজ করার জন্যই লড়াইটা করছিলাম। আমরা বার বার প্রাক্তন মন্ত্রীদের বলেছিলাম ফেডারেশন, টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে বৈঠকে বসার সুযোগ দিন। শুধু কর্তাদের সঙ্গে নয়, যাঁদের সঙ্গে ২৫ বছর ধরে কাজ করি, তাঁদের সঙ্গে বসার সুযোগ দিন। আমাদের বসতে দেওয়া হয়নি। উল্টে অনেকেই যেমন জয়দীপদা (জয়দীপ মুখোপাধ্যায়), কৌশিকদা (কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়), সৃজিত ( সৃজিত মুখোপাধ্যায়) যখন কাজ শুরু করতে গিয়েছে, তখন তাঁদের সঙ্গে অসহযোগিতা করতে বাধ্য করা হয়েছে। সেই কারণেই আমরা বাধ্য হই আদালতে যেতে। তারপরও আপনাদের বোঝানো হয়, আমরা নাকি ফেডারেশন ভেঙে দেওয়ার জন্য়ই আদালতে গিয়েছি। ফেডারেশনটা আমাদেরও। আমরাও সদস্য।
পরমব্রত এদিন স্পষ্ট জানান, ফেডারেশনের বিরুদ্ধে মামলা করার কারণে টলিউডে অলিখিতভাবে 'ব্যান' হয়েছিলেন। ফলে কোনও কাজ পাচ্ছিলেন না। আর সেই সময়ই পরম ও তাঁর স্ত্রী পিয়ার সন্তানের জন্ম হয়। তিনি বলেন, "সেদিন আমার সদ্যোজাত সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষমা চেয়েছিলাম। আর কোনও উপায় ছিল না তাই। আমি কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিষোদগারের জন্য এখানে আসিনি। আমি কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত রাগও পেশ করতে চাই না। কিন্তু আপনাদের যেহেতু বাড়ির লোক ভাবি, সেইজন্য ব্যক্তিগত অপমানের কথাটা ভাগ করে নিলাম। ভবিষ্যতে যেন এরকম পরিস্থিতি তৈরি না হয়।"
প্রসঙ্গত, সরকারি প্রতিনিধি হিসাবে এদিন এই বৈঠকে হাজির হয়েছিলেন রুদ্রনীল। সেখানে, সকলের দাবি এই ব্যান সংস্কৃতি বন্ধ হোক এবং অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত কেউ থাকুক ফেডারেশনের নেতৃত্বে। রুদ্রনীল জানান, সব কিছুর রিপোর্ট মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পেশ করবেন তিনি। সকলকে আশ্বস্ত করেন, আর কোনও খারাপ কিছু হবে না টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে। এখনও পর্যন্ত এবিষয়ে কোনও মন্তব্যে করতে নারাজ স্বরূপ বিশ্বাস।