অনীক, জিতু প্রয়াত অনীক দত্ত। বুধবার, পরিচালক তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী সন্ধির হিন্দুস্তান পার্কের বাড়ির ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মঘাতী হন। দুর্ঘটনার পরে রক্তাক্ত অনীককে তড়িঘড়ি ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও, শেষ রক্ষা হয়নি। হাসপাতালে যাওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরিচালক যেখান থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন,সেই ছাদে তাঁর এক জোড়া চটি এবং একটি স্যুইসাইড নোট পাওয়া যায়। যেখানে লেখ, তাঁর মৃত্যুর জন্যে কেউ দায়ী নয়। কেন প্রাক্তন স্ত্রীয়ের বাড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি? কোন দুর্ঘটনা ঘটল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মৃত্যু নিয়ে সকলের মনেই রয়েছে নানা প্রশ্ন।
অনীক দত্তের আকস্মিক এবং অস্বাভাবিক প্রয়াণে শোকের ছায়া টলিউডে। খবর শুনে সেদিনই হাসপাতালে পৌঁছেছিলেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়, জিতু কমল, ফিরদৌসুল হাসান, আবির চট্টোপাধ্যায়, দেবলীনা দত্ত, শ্রীলেখা মিত্র, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, মানসী সিনহা, মহম্মদ সেলিম, সৃজন ভট্টাচার্য, দীপ্সিতা ধর, শতরূপ ঘোষ সহ আরও অনেকে। এদিন এসএসকেএম হাসপাতালে ময়নাতদন্ত হয় অনীক দত্তের। সেখানে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার, সুইডেন থেকে ফেরেন অনীকের মেয়ে ঐশী। শুক্রবার সকালে প্রথমে নন্দনে এবং এরপর এনটি ১ স্টুডিওতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য শায়িত ছিল পরিচালকের মরদেহ। সেখান থেকে বেরিয়ে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
অনীকের তৈরি 'অপরাজিত' সকলের মনে গেঁথে আছে। পর্দার মানিককে বেছে নিয়েছিলেন পরিচালক নিজেই। সত্যজিৎ রায় রূপে জিতু কমল সফল। তিনি বারবারই এই চরিত্রের জন্য কৃতজ্ঞতা শিকার করেছেন অনীকের কাছে। টলিপাড়ার খবর, 'অপরাজিত ২'-র প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন অনীক। বুধবার, হাসপাতালে সংবাদমাধ্যমের কাছেও বিশেষ কিছু বলতে চাননি তিনি। দিনের শেষে নিজের মনের কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন। তবে শুক্রবার মনের ক্ষোভ উগড়ে দিলেন অভিনেতা।
সংবাদমাধ্যমকে জিতু বলেন, "কোনও ছবির কাজ হলে অনীকদা ফোন করতেন নন্দনে... একদিন হলেও ওঁর ছবি চালানো হোক। আমি কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই। এটা একটা মানুষ যে শুধু মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে চলে গেলেন তা নয়। এটা আমার কাছে রাজনৈতিক হত্যা। আগের সরকার, একটা মানুষকে মানসিকভাবেভেঙে দিয়েছে। নন্দনে ছবি চলতে না দেওয়া, বহু মানুষের কাছে রটিয়ে দেওয়া যে ওঁর ছবি হলে রিলিজ করতে অসুবিধা হবে, এগুলো তো হয়েছে। যে কারণের জন্য আমি নিজেও ছবি ছেড়ে টিভির কাজ করলাম। নতুন মুখ্যমন্ত্রী এবং অগ্নীমিত্রা পালের কাছে আমি নিজে এসএমএস, মেইল করেছি আমাদের যে ছবিটা চালাতে দেয়নি, সেটা একদিনের জন্য হলেও চালাতে দেওয়া হোক। আমি জানি না এটায় ওঁর আত্মা কতটা শান্তি পাবে। হয়তো ক্ষনিকের জন্য শান্তি পাবে। এই দ্বিচারিতাগুলো বন্ধ হোক। যারা বসেছিলেন নন্দন কমিটিতে, তাঁদের শুভ বুদ্ধি উন্মোচন হোক।"
তিনি আরও বলেন, "মানসিক ভাবে খুন করা হল মানুষটাকে। সামনে থেকে দেখেছি, কী ভাবে ছবি আটকে দেওয়া হয়েছে। কী ভাবে মানসিক অত্যাচার করা হয়েছে। কোনও প্রযোজক এলে তাঁকে বলে দেওয়া হত যেন ওঁর সঙ্গে কাজ না করেন। ইন্ডাস্ট্রির অনেক মানুষ তৎকালীন সরকারকে খুশি করতে গিয়ে অনীকদার বিরুদ্ধে কথা বলতেন। সে অবশ্য আমার বিরুদ্ধেও বলে। তাতে আমার কিছু যায়-আসে না। পাপ-পুণ্য সবকিছুর খতিয়ান দিয়ে শেষে এই শ্মশানেই সবাইকে আসতে হবে। একটাই অনুরোধ করছি, প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ হোক। নতুন সরকারের কাছে আর্জি, প্রতিহিংসা যেন বন্ধ হয়। অনেকে এখন অনীকদার প্রশংসা করছেন। কিন্তু তাঁরাই সমালোচনা করেছেন একদিন।"
বৃহস্পতিবার ফেসবুকে জিতু লেখেন, "মিডিয়ার সমস্ত বন্ধু,দিদি,দাদা,ভাই, প্রত্যেকের কাছে আমি কর জোরে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। যে ঘটনা ঘটে গেছে তারপরে আমার কিছু বলার থাকতে পারে না এমনটা বলবো না। আমার সত্যিই কিছু বলার নেই,বিশ্বাস করুন। কী বলবো বলুন? আমি অনীক দার কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। ওনার পরিবারে পাশে থাকুন আর কিছু বলার নেই। জানি আর বুঝিও বাইট/কপি নেওয়াটা আপনাদেরও কাজ। আমাকে ক্ষমা করবেন আপনাদেরও মন ভেঙেছে, আপনারাও বেদনাহত।" পরে আরও একটি পোস্ট করে জিতু লেখেন, "শুয়ে আছে সেনা লাশকাটা ঘরে...।"
প্রসঙ্গত, বিজ্ঞাপন জগতের মানুষ ছিলেন অনীক দত্ত। বানিয়েছেন বেশ কিছু ডকুমেন্টরি। ২০১২ সালের 'ভূতের ভবিষ্যৎ' ছবির মাধ্যমে টলিউডে হাতেখড়ি। এর পরে, 'মেঘনাদবধ রহস্য', 'আশ্চর্য প্রদীপ', 'ভবিষ্যতের ভূত', 'বরুণবাবুর বন্ধু' ছবিগুলির মাধ্যমে যথেষ্ট প্রশংসা পেয়েছেন অনীক দত্ত। এরপর তিনি সকলের মন জয় করেন, 'অপরাজিত' ছবির মাধ্যমে। পরিচালকের শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি 'যত কাণ্ড কলকাতায়'। 'অপরাজিত ২' ছাড়াও, সলিল চৌধুরীর জীবনচিত্র তৈরির পরিকল্পনা ছিল পরিচালকের।