scorecardresearch
 

সৌমিত্র নেই! 'গুরুজি'-কে বাঁচানোর প্রার্থনা পূরণ হল না 'পোস্ত'র

নাতিকে নিয়ে স্কুল থেকে ফেরার পথে হঠাৎই শান্তিনিকেতনের পূর্বপল্লীর রাস্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েন দাদু। কিংকর্তব্যবিমূঢ় একরত্তি ছেলেটি সেদিন দাদুকে ওই অবস্থায় দেখে রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়েছিল। অবশেষে এক রিকশা কাকুর সাহায্যে সেদিন দাদুকে বাড়ি নিয়ে ফিরতে পেয়েছিল সে। সময় মতো চিকিৎসা করানোয় সুস্থ্য হয়ে ওঠেন দাদু।  

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অর্ঘ্য বসু রায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অর্ঘ্য বসু রায়
হাইলাইটস
  • "সৌমিত্র দাদু তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ্য হয়ে ওঠো!" মন খারাপের বিকেলে ছোট্টো 'পোস্ত'র কামনা।
  • শ্যুটিং সেটের সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজের স্মৃতিচারণে 'পোস্ত'।
  • গত ৬ অক্টোবর থেকে বেলেভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

 দীর্ঘ ৪০ দিন হাসপাতালে জীবনযুদ্ধে লড়াই করার পর রবিবার বেলা ১২:১৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বর্ষীয়ান অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। অনেক চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা করতে পারলেন না চিকিৎসকেরা। 

নাতিকে নিয়ে স্কুল থেকে ফেরার পথে হঠাৎই শান্তিনিকেতনের পূর্বপল্লীর রাস্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েন দাদু। কিংকর্তব্যবিমূঢ় একরত্তি ছেলেটি সেদিন দাদুকে ওই অবস্থায় দেখে রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়েছিল। অবশেষে এক রিকশা কাকুর সাহায্যে সেদিন দাদুকে বাড়ি নিয়ে ফিরতে পেয়েছিল সে। সময় মতো চিকিৎসা করানোয় সুস্থ্য হয়ে ওঠেন দাদু।  

এতক্ষণ ধরে যা পড়ছিলেন তা কোনও বাস্তবের নয়, বরং একটি রিল লাইফের ঘটনা যা আমার-আপনার মতো অধিকাংশ বাঙালিই দেখেছে। সিনেমার নাম 'পোস্ত'। আর সেখানখার দুই চরিত্র অর্ঘ্য ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় পরিচালিত সিনেমাটিতে অর্ঘ্যর দাদুর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্রবাবু। নাতির দায়িত্বভার নিয়ে অত্যন্ত পারিবারিক এই সিনেমায় বায়োলজিক্যাল পেরেন্টসের সঙ্গে লড়াই দাদু-ঠাকুমার। দাদুকে সেখানে 'গুরুজি' বলেই সম্বোধন করতো অর্ঘ্য। উইন্ডোজ প্রোডাকশন হাউজের এক ছকে বাঁধা বাঙালি ফ্যামিলি সেন্টিমেন্ট নিয়ে ছবি হলেও, 'পোস্ত'- ছবিটি এক অন্য সুতোয় গেঁথেছিলেন ছবির পরিচালকদ্বয়। মানবিক এই ছবিতে উঠে এসেছিল পারিবারিক রোজনামচার খুব চেনা ক্রাইসিস এবং তার সঙ্গে এক দাদু ও নাতির অদ্ভুত এক সম্পর্ক, টান। যার জেরে আদালতে নাতির 'অভিভাবকত্ব' দাবি করেছিলেন দাদু।

এ তো গেল ৩৫ mm-র কথা‌। কিন্তু বাস্তব জীবনে বর্ষীয়ান অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শারীরিক অবস্থার অবনতির বিষয়ে অবগত সেদিনের পর্দার সেই নাতিও। চিন্তিত শিশুর কন্ঠে,"সৌমিত্র দাদু যাতে তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যায়, আমি সেই কামনা করি"।

'পোস্ত' ছবির নেপথ্য দৃশ্যে পোস্ত ও তার গুরুজী

 প্রথমবার বড় পর্দায় মুখ দেখানো, ছবির 'পোস্ত' ওরফে অর্ঘ্য বসু রায় তার 'গুরুজি' ওরফে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে শ্যুটিং সেটের স্মৃতিচারণ করল আজতাক বাংলা-র কাছে। কী বলল অর্ঘ্য তার সৌমিত্র দাদুর কথা? রইল সেই বিস্তারিত গল্প।

'পোস্ত' ছবি দিয়ে যখন অর্ঘ্যর হাতে খড়ি, তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ে সে। পাঠভবন স্কুলের ছাত্র অর্ঘ্য-র, ক্যামেরা, শ্যুটিং, ফ্লোর এই সব কিছুর সঙ্গে প্রথমবার পরিচিতি। অভিনয় কিংবা সহ অভিনেতাদের পরিসর সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই ক্ষুদের। কিছু শর্ট খুব ভালো দেওয়ার পর বর্ষীয়ান অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তাকে বলেছিলেন, "তুমি তো খুব ভালো করেছো"। প্রবীণ অভিনেতাকে তার সরল মনে পাল্টা উত্তর, "তুমিও খুব ভালো করেছো"!  

'পোস্ত' ছবির কলা কুশলীরা

এখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে অর্ঘ্য। কথা বার্তা অনেক গুছানো। সেটের কথা জিজ্ঞাসা করায় সে বলল, "সৌমিত্র দাদু খুবই 'পাংচুয়াল'। সেটে আসা, শট দেওয়া, খাওয়া-দাওয়া সবকিছু একদম ঘড়ি ধরে করেন। অনেট কিছু শিখেছি আমি দাদুর থেকে। 'পোস্ত'-তে অভিনয় করার পর সৌমিত্র দাদুর 'বেলা শেষে' আর 'বসু পরিবার' আমি দেখেছি। অর্ঘ্য আরও বলে, "সৌমিত্র দাদু কী সুন্দর ন্যাচেরাল অ্যাক্টিং করেন, আমার সেটা খুব ভালো লাগে"। 

শ্যুটিং চলাকালীন তাহলে দাদুর থেকে সে বকা খেয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করায়, অর্ঘ্যের পরিষ্কার উত্তর, "না না সৌমিত্র দাদু তো খুব ভালো। আমায় কখনও একটুও বকে নি"। 

আজতক বাংলা অর্ঘ্যকে জিজ্ঞেসা করে, তার নিজের দাদুর সঙ্গে কী তাহলে পোস্ত আর তার গুরুজীর মতন সম্পর্ক? অর্ঘ্যের উত্তর "আমার নানির বাড়ির দাদু মানে আমার মামাবাড়ির দাদুর সঙ্গে আমার এরকম সম্পর্ক।"

প্রসঙ্গত, বর্তমানে অর্ঘ্য বসু রায়, 'নান্দিকার'- এ নাটকের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। কোভিড পরিস্থিতিতে চলছে নাটকের অনলাইন ক্লাস। যদিও বড় হয়ে অভিনয়ের পাশাপাশি ডাক্তার হতে চায় সে। তবে বড় পর্দার চেয়ে মঞ্চ তার বেশি পছন্দের।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ে হাসপাতালে ভর্তি ইস্তক ছোট থেকে বড় তাঁর সহ-অভিনেতারা যেমন প্রার্থনা করছিলেন তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনায়, তেমনই তাঁর অসংখ্য অনুরাগীরাও অপেক্ষায় রয়েছিলেন তাঁর দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসার। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না।