
স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়দুই দশকের বেশি সময় ধরে নিজের অভিনয় দক্ষতায় সকলের মন জয় করছেন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। একাধিক চ্যালেঞ্জিং চরিত্রের মাধ্যমে বারবার দর্শকদের মন ছুঁয়েছেন। বড়পর্দা থেকে শুরু করে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম- টলিউডের পাশাপাশি বলিউডেও দাপিয়ে কাজ করছেন অভিনেত্রী। মনের কথা অকপটেই বলে ফেলেন নায়িকা। ১০ এপ্রিল মুক্তি পেল অর্জুন দত্ত পরিচালিত, নন্দী মুভিজ প্রযোজিত, নতুন ছবি 'বিবি পায়রা'। এবার শিউলি চরিত্রে ধরা দিলেন স্বস্তিকা। ছবির গান, ট্রেলার ইতিমধ্যে বেশ মন ছুঁয়েছে দর্শকের। মুক্তির আগে, আজতক বাংলার (বাংলা ডট আজতক ডট ইন) সঙ্গে মনখোলা আড্ডায় নানা কথা শেয়ার করেছেন নায়িকা।
প্রশ্ন: আপনার মেয়ে অন্বেষা বাড়ি ফিরেছে বিদেশ থেকে এতদিন পরে। আবার নতুন ছবি মুক্তি পেল। এই সময়টা আপনার জন্যে তো ডাবল স্পেশাল?
স্বস্তিকা: হ্যাঁ, ও ছবি মুক্তির পরেই চলে যাবে। সৌভাগ্যক্রমে একটা কোনও রিলিজের সময় থাকবে। তবে মানসিক অবস্থা যা হয়ে আছে, তার মধ্যে কোনটা যে স্পেশাল, আর কোনটা যে স্পেশাল না, সেটা ঠিক বুঝতে পারছি না। এতদিন ধরে শ্যুটিং করে, অর্জুনের সঙ্গে এত বছর ধরে ছবিটা করার প্ল্যান হচ্ছিল, গত বছর আমরা সেটা করতে পেরেছি। তার পর একটা দীর্ঘ সময় পেরিয়ে একটা ছবি মুক্তি পাচ্ছে, নিশ্চয় চাইব মানুষ ছবিটা দেখুক। আমার খুব পছন্দের কাজের তালিকায় থাকবে 'বিবি পায়রা'। এদিকে আমার মেয়ে প্রায় দু'বছর পরে বাড়ি এসেছে। কিন্তু আনন্দটা যতটা হওয়ার কথা, সেটা কোথাও গিয়ে অনেকটাই ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য (রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক মৃত্যু)।

প্রশ্ন: ছবিতে দু'জন একেবারে পরনির্ভরশীল মহিলা, কোথাও গিয়ে ভাল থাকার রসদ খুঁজে নেয়, আবার কোথাও গিয়ে সমস্যায় পড়ে… কীভাবে গল্পটা বোনা হয়েছে?
স্বস্তিকা: গৃহকর্মে নিপুণা মহিলারা যাদের আয় অনেকটা কম, বা এলআইজি অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন, তাদের স্বপ্নগুলোও ওই রকম 'লোয়ার ইনকাম গ্রুপের' মতোই। বা তাদের ওপর সেগুলো চাপিয়ে দেওয়া হয়। রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে যেমন সেট মেনু থাকে, যার বাইরে অন্য কিছু অর্ডার করা যায় না। অনেক বেশি অপশন নেই, এদের জীবনটা এরকমই সেট মেনুর মতো। বাড়ি বা ছোটবেলা থেকেই সেট করে দেওয়া হয়, এগুলোই তোমার জীবনে হবে, এগুলো হলেই তোমায় মেনে চলতে হবে যে তুমি জীবনে সব কিছু পেয়ে গেছো। তোমার তো আর চাওয়ার কিছু নেই। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের আরও বেশি করে এই 'সেট মেনুটা' মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হয়। কারণ, তাদের নিজের রোজগার করার সুযোগ নেই, বাড়ি ছাড়ার ক্ষমতা নেই, শত লাথি খেয়ে পড়ে থাকতে হয়। এই নানা ধরণের যে জীবনযাপনের মধ্যে দিয়ে মেয়েরা যায়, সবটাই যাদের ওপরে চাপিয়ে দেওয়া। এই ছবির গল্পে এই বিষয়টা নিয়ে অনেকটা কথা বলা আছে।
প্রশ্ন: ছবিতে সমাজের একটা প্রতিচ্ছবি আছে, আবার হাস্যরসও আছে। এক কথায় নানা ফ্লেবারের মিশেল মনে হচ্ছে। কোন জঁনারের ছবি বলতে পারি?
স্বস্তিকা: ফ্যামিলি ড্রামা। আমাদের জীবনটা তো কোনও জঁনারে বেঁধে দিতে পারি না। আমাদের জীবনে নানা ঘটনা ঘটে। ভাল- মন্দ সব কিছুই থাকে। আনন্দও করি- দুঃখও পাই।
প্রশ্ন: গত কয়েক বছরে সমাজের বিভিন্ন ধরণের মহিলাদের চরিত্রে আপনাকে দেখা যাচ্ছে। কী মাথায় রেখে রাজি হন কোনও কাজে হ্যাঁ বলতে?
স্বস্তিকা: যে ধরণের কাজ আমি আগে কখনও করিনি সেটাই একটা চিত্রনাট্যে হ্যাঁ বলার মূল কারণ। আর অর্জুন খুবই সেনসিটিভ একজন মানুষ। ওঁর ছবিগুলোর মধ্যে একটা সংবেদনশীলতা থাকে। মন থেকে গল্প বলার চেষ্টা করে। মানুষ হিসেবে ও খুবই একজন সৎ ও খাঁটি মানুষ। আর একজন সৎ মানুষ হলে সেটা কাজেও ধরা পড়ে।

প্রশ্ন: 'বিবি পায়রা'-র গান, ছবি মুক্তির আগেই সুপারহিট। 'টেক্কা' মুক্তির আগে, আজতক বাংলাকে আপনি বলেছিলেন আইটেম সং-এ পারফর্ম করতে চান। এটা 'পেপি সং'। এই ধরণের গানে কি ফের স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়কে দেখা যেতে পারে?
স্বস্তিকা: 'কালীপটকা'-তে করেছি একটা। হ্যাঁ, গল্পের প্রয়োজনে যদি থাকে, তাহলে অবশ্যই করব আমার খুব ভাল লাগে নাচের সিকোয়েন্স করতে। আই এনজয় দ্যাট।
প্রশ্ন: এই গানটার জন্য কতদিনের রিহার্সাল ছিল?
স্বস্তিকা: আমার মনে হয় আমরা দু-দিন রিহার্সাল করেছিলাম।

প্রশ্ন: অনির্বাণ চক্রবর্তী আপনার ক্রাশ। বিভিন্ন সাক্ষৎকারে আগে বলেছেন। তাহলে 'ম্যানিফেস্টেশন' কাজ করল?
স্বস্তিকা: ম্যানিফেস্টেশন অনেক অনেক ওয়ার্ক করছে। আমি ভাবছি আরও অন্যান্য জিনিস নিয়েও ম্যানিফেস্টেশনটার ওপর জোর দেব। কারণ করলে দেখছি হচ্ছে, কাজ ফলছে।
প্রশ্ন: ক্রাশের সঙ্গে প্রথম কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?
স্বস্তিকা: খুবই দারুণ। দারুণ মানুষ। দক্ষ অভিনেতা। আমার তো বাড়তি ভাল লাগা আছেই। খুবই ভাল লেগেছে। আমরা খুবই সিঙ্কে ছিলাম কাজের সময়, অভিনয়ের ক্ষেত্রে, পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে। আমার মনে হয় যে, আমরা একে অপরের অভিনয়টা হয়তো আরও ভাল করার চেষ্টা করেছি। উনিও চেষ্টা করেছেন, আমিও চেষ্টা করেছি। যেহেতু উনি এখানে আমার স্বামী, আমার বেশিভাগ সিন ওঁর সঙ্গেই। আমি যেটা করতে চাইছি বা উনি যেটা বলতে চাইছেন সেগুলো দু'জনেই বুঝেছি।

প্রশ্ন: পাওলি দামের সঙ্গে এতদিন পরে কাজ...
স্বস্তিকা: হ্যাঁ, 'ফ্যামিলি অ্যালবাম', মৈনাকের ছবি করেছি আগে। যদিও সেটা অনেক, প্রায় ১২ বছর আগের কাজ।
প্রশ্ন: ওঁর সঙ্গেও তো আপনার অনেক দৃশ্য রয়েছে...
স্বস্তিকা: হ্যাঁ, পাওলী খুবই দক্ষ অভিনেত্রী। ভাল পারফর্মার হলে, ভাল অভিনেতা হলে, তাঁদের সঙ্গে আমাদেরও কাজটা ভাল হয়। খুবই উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্য আছে আমাদের একসঙ্গে। খুব ভাল অভিজ্ঞতা হল এত বছর পর আবার একসঙ্গে কাজ করলাম। দু'জনেরই বয়স বেড়েছে, অভিজ্ঞতা বেড়েছে, ম্যাচিওরিটি বেড়েছে। ফলে সেগুলো দু'জনেই চেষ্টা করেছি কাজে লাগানোর।

প্রশ্ন: ছবির মুক্তি একেবারে ভোটের মুখে। সেটা কি কোনও ভাবে দর্শক টানতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে হয়?
স্বস্তিকা: এটা আমি জানি না। কারণ এটা তো প্রযোজকের সিদ্ধান্ত। এখানে আমাদের কথা খুব একটা গ্রাহ্য হয় না। এটা প্রযোজক ঠিক করেন, উনি কখন ছবিটা মানুষের সামনে নিয়ে আসবেন। আমার কাজ মানুষকে জানানো যে ছবিটা আসছে, তাঁরা যাতে সিনেমা হলে গিয়ে ছবিটা দেখে। আমি চাইব যে আমার কাজটা মানুষ দেখুক এবং তাঁরা মতামত জানাক, এটুকুই আমার দায়িত্ব।
প্রশ্ন: বাংলা ইন্ডাস্ট্রি এখন চর্চায়। 'ব্যান', স্ক্রিনিং নিয়ে সমস্যা লেগেই রয়েছে। আপনি এত বছর টলিউডে, এই সমস্যায় কী সমাধান আছে বলে মনে হয়?
স্বস্তিকা: আমি খুবই নগণ্য একজন মানুষ। এবিষয়ে আমার কোনও মতামত নেই। আমি মনে করি, আমি এই ইন্ডাস্ট্রির খুব ক্ষুদ্র একজন মানুষ। ইন্ডাস্ট্রির প্রচুর মাথারা আছেন, যারা ইন্ডাস্ট্রির নিয়মকানুন, ভাল- মন্দ সব নিয়ে আলোচনা- বিবেচনা করেন, সিদ্ধান নেন।
প্রশ্ন: আপনি বলিউডেও এত কাজ করছেন। ওখানে ইন্ডাস্ট্রির ভিতরে এত সমস্যা আছে বলে মনে হয়েছে কখনও?
স্বস্তিকা: না। ওদের অত সময় নেই। ওরা কাজ করতে চায়। কাজটাকেই প্রাধান্য দিতে চায়। সমস্ত কিছু নিয়ে রাজনীতি করার সময় ওদের নেই। আমাদের হাতে প্রচুর সময় আছে। নিয়ম করে এগুলোই করি। এটাই পার্থক্য।