স্বরূপ, পাপিয়া শিরোনামে স্টুডিওপাড়া। টলিউডের জট যেন কাটছিলই না। ফেডারেশন বনাম ছোট পর্দার প্রযোজকদের দ্বন্দ্ব, টেকনিশিয়নদের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ, বকেয়া পারিশ্রমিক, কলাকুশলীদের অতিরিক্ত সময় কাজ করানো থেকে থ্রেট বা ব্যান কালচার ইত্যাদি নানা সমস্যা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে বারবার উত্তপ্ত হয় টলিপাড়া।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। টলিপাড়ায় বদল হতে শুরু করেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, টলিউডের নানাবিধ সমস্যা সমাধানের দায়িত্বভার দিয়েছেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, পাপিয়া অধিকারী ও হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের উপর। বলা চলে, টলিউডের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন 'বিশ্বাস ব্রাদার্স' অরূপ এবং স্বরূপ বিশ্বাস। ব্যান কালচার, ফেডারেশনের 'দাদাগিরি' সব বন্ধ হবে, শিল্পী- কলাকুশলীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন এবং বাকি সব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন রূপা, রুদ্রনীলরা। আগেই জানিয়েছিলেন, বদল আসতে পারে ইন্ডাস্ট্রির একাধিক সংগঠনে। সিনেপাড়ায় সুস্থ কাজের পরিবেশ গড়তে, বুধবার, টেকনিসিয়ান্স স্টুডিওতে বৈঠক ডাকেন টালিগঞ্জের নবনির্বাচিত বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী। এদিন টলিপাড়ায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল।
টলিউডের কর্মপরিসরে প্রভাব বিস্তার করে আসা ফেডারেশন অব সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া (Federation of Cine Technicians and Workers of Eastern India/ FCTWEI) ভেঙে এক যুগান্তকারী ঘোষণা করলেন পাপিয়া। পুরনো কাঠামো ভেঙে এবার বাংলা সিনে শিল্প এগোতে চলেছে নতুন পরিচয়ে- ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স অ্যান্ড কালচারাল কনফেডারেশন (Eastern India Motion Pictures & Cultural Confederation/EIMPCC)-র হাত ধরে।
নতুন কনফেডারেশন তৈরির পাশাপাশি, টালিগঞ্জের এদিনের বৈঠকে ঘোষণা হয়, এতদিন ফেডারেশনের আওতায় থাকা ২৬ গিল্ডের বর্তমান কাঠামো আর বজায় থাকবে না। পরিবর্তে পরিচালক, সিনেমাটোগ্রাফার, প্রোডাকশন ম্যানেজার এবং কস্টিউম বিভাগের মতো কয়েকটি মূল স্তম্ভকে কেন্দ্র করে নতুন কর্মপদ্ধতি গড়ে তোলা হবে। এই বিভাগগুলির সঙ্গে সমন্বয় রেখে অন্যান্য শিল্পী ও কলাকুশলীদের কাজের সুযোগ তৈরি হবে বলে জানানো হয়। আগামী শুক্রবার থেকেই নতুন ব্যবস্থার অধীনে বিভিন্ন গিল্ডকে একত্রিত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। বাংলা বিনোদন জগতকে আরও সুসংগঠিত, স্বচ্ছ এবং কর্মমুখী করে তুলতেই সরকারের এই উদ্যোগ বলে জানান টালিগঞ্জের বিধায়ক।
তিনি বললেন, “ডবল ইঞ্জিন সরকারের সহায়তায় দিল্লির ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স কনফেডারেশনের (কনফেডারেশন) আওতাভুক্ত হবেন টলিউডের সমস্ত কলাকুশলী। লক্ষ্য, দুর্নীতিমুক্ত ইন্ডাস্ট্রি।”
পাপিয়া আরও জানান, সমস্ত কলাকুশলীদের এই কনফেডারেশনের আওতায় আনা হবে। এই কনফেডারেশন, আগের ফেডারেশনের করা সমস্ত কাজ খতিয়ে দেখবে এবং কোনও আনিয়ম হয়ে থাকলে তা সরাসরি সরকারকে জানাবে। সেই সঙ্গে, কনফেডারেশনের আওতায় যারা থাকবেন, তাদের প্রত্যেকের কাজ সুনিশ্চিত করা ও কাজের সময়সীমা ও সাম্মানিক ঠিক করা হবে। এদিন জানানো হয়, 'ব্যান কালচার' আর থাকছে না টলিউডে। এছাড়াও, কলাকুশলী ও তাদের পরিবারের বিভিন্নভাবে চিকিৎসাজনিত সমস্যার সমাধান হবে। সর্বোপরি টলিউডকে অন্যতম ফিল্ম সিটি হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন পাপিয়া।
অভিনেত্রী- বিধায়ক জানান, একটি শ্যুটিং ইউনিটে কতজন কর্মী প্রয়োজন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকবে শুধুমাত্র প্রযোজক এবং এক্সিকিউটিভ প্রযোজকের হাতে। সেই বিষয়ে অন্য কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের হস্তক্ষেপ আর দেখা যাবে না। এছাড়া, এবার থেকে ফের পরিচালকদের হাতে তুলে দিতে হবে সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা এবং পূর্ণ দায়িত্ব। সহকারী পরিচালকদের কাজ হবে পরিচালকের ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে সাহায্য করা। বিভিন্ন কারিগরি বিভাগের ক্ষেত্রে, ক্যামেরা বিভাগের দায়িত্ব যারা সামলান, তারাই ঠিক করবেন তাদের কাজের জন্য কী ধরনের পরিকাঠামো প্রয়োজন। অন্যান্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট বিভাগের মধ্যেই থাকা উচিত। স্টুডিওর বাইরে শ্যুটিং হলেও অপ্রাসঙ্গিকভাবে কিছু নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
পাপিয়া অধিকারীর দাবি, এই ক্ষেত্রগুলিতে দায়িত্ব যেমন অনেক, তেমনই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগও সামনে এসেছে। সেখানে যেমন উঠেছে টাকা দিয়ে কাজ পাওয়ার অভিযোগ, সেরকম অযোগ্য ব্যক্তিদের সুযোগ করে দেওয়ার মতো বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখা হবে। তবে এখনই কাউকে আইনি জটিলতায় জড়ানোর পথে না হেঁটে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
পাপিয়ার বলেন, এই উদ্যোগের সঙ্গে কোনও ভোটব্যাঙ্কের সম্পর্ক নেই। তাঁর কথায়, কে কাকে ভোট দেবেন, তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। অভিনেত্রী- বিধায়ক দাবি করেন, এই লড়াই শুধুমাত্র শিল্পের স্বার্থে, কোনও রাজনৈতিক সমীকরণের জন্য নয়। তবে সত্যিই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা টলিপাড়ার এই জট এবার কাটবে নাকি বিষয়টা সাময়িক স্বস্তি এনে পরে একই পরিস্থিতি হবে, তা সময়ই বলবে।