
পূর্ণ মর্যাদায় হরিশ রানার শেষকৃত্য সম্পন্ন হল দিল্লিতে। ভারতের প্রথম নাগরিক, যাঁকে সুপ্রিম কোর্ট পরোক্ষ নিষ্কৃতি মৃত্যুর অধিকার দিয়েছিল। সেই হরিশ রানার দেহ আজ অর্থাত্ বুধবার দাহ করা হল। মঙ্গলবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। হরিশের চোখ দান করা হয়েছে। দক্ষিণ দিল্লির গ্রিন পার্কে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হল।

শেষ বিদায়ের সময় হরিশের মা নির্মলা দেবী হাত জোড় করে আবেগনঘন বিদায় জানালেন ছেলেকে। অন্যদিকে হরিশের বাবা অশোক রানা উপস্থিত শোকাহতদের কাঁদতে বারণ করে বলেন, তাঁর ছেলে এখন “শান্তির জায়গায় রয়েছে”।

হরিশের শেষকৃত্যে তাঁর পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি ব্রহ্ম কুমারীর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। রাজ এম্পায়ার সোসাইটি, গাজিয়াবাদে বসবাসকারী প্রতিবেশীরাও সেখানে এসে সমর্থন জানান। এছাড়াও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, AIIMS Delhi-এর কর্মী, আত্মীয় ও বন্ধুরা এই শোকসভায় যোগ দেন। শেষবারের মতো ছেলেকে বিদায় জানাতে গিয়ে তাঁর বাবা-মা তাঁকে একজন ‘ভাল ছেলে’ হিসেবেই স্মরণ করেন। ব্রহ্ম কুমারী সংস্থার সিস্টার লাভলি, যিনি দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের সঙ্গে যুক্ত, জানিয়েছেন, পরিবার হরিশের চোখ দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ভারতের প্রথম পরোক্ষ নিষ্কৃতি মৃত্যুর অধিকার পাওয়া হরিশ রানা মঙ্গলবার দিল্লির AIMS হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হরিশ। ২০১৩ সাল থেকে কোমাতে ছিলেন হরিশ রানা। ছেলের নিষ্কৃতি মৃত্যু চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন মা-বাবা। গত ১১ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে নিষ্কৃতি মৃত্যুর রায় দেয়। এটাই ভারতের প্রথম প্যাসিভ ইউথেনেসিয়া বা পরোক্ষ নিষ্কৃতি মৃত্যু।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মতো, যাবতীয় শর্ত মেনে হরিশ রানার লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়। ৩২ বছর বয়সি হরিশ রানা সেই দিন থেকেই খাবার ও জল ছাড়াই বেঁচেছিলেন। এই ভাবেই ১০ দিন কেটেছে। অবশেষে আজ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। দীর্ঘ ১৩ বছর কোমায় থাকা হরিশ চিকিত্সায় আর সাড়া দিচ্ছিলেন না।

সুপ্রিম কোর্ট যে দিন নিষ্কৃতি মৃত্যুর রায়দিল, সেদিন হরিশ রানার বাবা অশোক রানার বলেছিলেন, 'আমরা অনেক লড়াই করেছি। কোন মা-বাবা চায়, ছেলের মৃত্যু? আমরা গত ৩ বছর ধরে এই মামলার জন্য লড়ে যাচ্ছি। পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের টপার ছিল আমার ছিল। পড়াশোনায় সর্বদাই প্রথম হত।'

১১ মার্চের রায়ে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, AIIMS-এ হরিশ রানাকে ভর্তি করে লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম প্রত্যাহারের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করতে হবে। সেই মতোই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর আইনজীবী মণীশ জৈন জানান, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১-এর অধীনে আদালত হরিশ রানাকে পরোক্ষ নিষ্কৃতি মৃত্যু দিয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি ১১ মার্চ ANI-কে জানান, এক সপ্তাহের মধ্যেই রানাকে AIIMS-এ স্থানান্তর করা হবে, যেখানে সমস্ত লাইফ সাপোর্ট টিউব খুলে দেওয়া হবে, যাতে তিনি আর কোনও চিকিৎসা হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করতে পারেন।

তিনি আরও জানান, এই সিদ্ধান্ত ২০১৮ সালের কমন কজ অফ গাইডলানস অনুসরণ করেই নেওয়া হয়েছে, যেখানে প্যালিয়েটিভ অবস্থায় সম্পূর্ণ অচল রোগীদের চিকিৎসা সংক্রান্ত দিশা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁর কথায়, “বিশ্বজুড়ে প্যাসিভ ইউথানেশিয়া তুলনামূলকভাবে বেশি প্রচলিত হলেও, এই রায় ভারতে একটি ছোট হলেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।” একই সঙ্গে তিনি জানান, সুপ্রিম কোর্ট সমস্ত রাজ্যের চিফ মেডিক্যাল অফিসারদের প্রাথমিক ও দ্বিতীয় স্তরের ইউথানেশিয়া বোর্ড গঠন করতে এবং নিয়মিত রিপোর্ট দিতে নির্দেশ দিয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অনিল নায়েক, IMA-এর সভাপতি, বলেন, মানবিক দিক বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কারণ হরিশ রানা গত ১৩ বছর ধরে গুরুতর মাথার আঘাতের পর শারীরিক অক্ষমতার সঙ্গে লড়াই করছেন। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির জন্য একটি নির্দিষ্ট নীতিও তৈরি করা প্রয়োজন, কারণ এই ধরনের পরিস্থিতি পরিবারগুলির ওপর অর্থনৈতিক ও মানসিক, দু’ধরনেরই চাপ সৃষ্টি করে।