
'বাবা, আমাকে বাঁচাও।' ফোনের ওপার থেকে ছেলের এই অসহায় আর্তনাদ কানে বাজছে বরাবাঁকির ফতেহপুরের বাসিন্দা মহম্মদ শাহজাহানের বাবার। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যায়। লখনউয়ের একটি কমার্সিয়াল বিল্ডিংয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারালেন শাহজাহান। তাঁর মতো আরও বহু ছাত্রছাত্রী, তরুণ কর্মী ও প্রশিক্ষণরত যুবক-যুবতী সেই আগুনে আটকে পড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৫ জনের মৃত্যু হল জীবন্ত দগ্ধ হয়ে। এখনও চলছে উদ্ধারকাজ। মানুষের পোড়া মাংসের গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠার মতো পরিবেশ। চারদিকে শুধুই হাহাকার।

ঘটনাস্থল লখনউয়ের আলিগঞ্জ এলাকার একটি তিনতলা বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স। একটি অ্যানিমেশন ট্রেনিং সেন্টার, কোচিং সেন্টার, পেট শপ ও ভেটেরিনারি ক্লিনিক চলত। আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যে ঘন কালো ধোঁয়া উপরের তলাগুলি গ্রাস করে নেয়। বহু ছাত্রছাত্রী এবং কর্মী কার্যত ফাঁদে পড়ে যান। বাঁচানে যায়নি কুকুর, বেড়াল সহ পোষ্য প্রাণীদেরও।

শাহজাহান যখন বাবাকে ফোন করেছিলেন, তখন তিনি ভবনের ভেতরে আটকে ছিলেন। খবর পেয়েই তাঁর বাবা ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু ততক্ষণে আগুন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা ভবনের ভিতরে প্রবেশ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ছেলেকে বাঁচানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত কিছুই করতে পারেননি তিনি।

শুধু শাহজাহান নন, এমন অসংখ্য হৃদয়বিদারক ঘটনা উঠে এসেছে এই অগ্নিকাণ্ডের পর। ২৫ বছরের আদিত্য শ্রীবাস্তব, যিনি ওই অ্যানিমেশন স্টুডিওতে কাজ করতেন, তিনিও শেষ মুহূর্তে সহকর্মী ধীরজ মেহরাকে ফোন করে বলেছিলেন, 'বাঁচাও।' ধীরজ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছন, কিন্তু ততক্ষণে ভবনটি ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছে। আদিত্য আর ফিরতে পারেননি।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আগুন লাগার কিছুক্ষণের মধ্যেই ভবনের ভেতর থেকে চিৎকার, কান্না আর সাহায্যের আর্তি শোনা যাচ্ছিল। অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে জানালার ধারে চলে আসেন। কেউ পাইপ বেয়ে নামার চেষ্টা করেন, কেউ আবার বাথরুমের ভেতরে নিজেদের আটকে রেখে উদ্ধারকর্মীদের অপেক্ষা করতে থাকেন।

পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, এক যুবক আগুনের তাপ সহ্য করতে না পেরে উপরতলা থেকে ঝাঁপ দেন। তিনি নীচের একটি গ্রিলে আছড়ে পড়ে গুরুতর জখম হন। স্থানীয় মানুষজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।

আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়তেই পরিবারের সদস্যরা ছুটে আসেন। অনেক মা-বাবা পুলিশের কাছে কাকুতি-মিনতি করতে থাকেন, যাতে তাঁদের ভেতরে যেতে দেওয়া হয়। এক মাকে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলতে শোনা যায়, 'আমাকে আমার ছেলের কাছে যেতে দিন।' কিন্তু আগুন ও ধোঁয়ার কারণে কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দেওয়া সম্ভব হয়নি।

উদ্ধারকারীদের কাজও সহজ ছিল না। ভবনটিতে ছিল মাত্র একটি প্রবেশ ও নির্গমন পথ, যা খুব দ্রুত আগুনে ঢেকে যায়। ফলে আটকে পড়া মানুষদের বের হওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত পাশের একটি ভবনের দেওয়াল ভেঙে উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়। এনডিআরএফ, এসডিআরএফ, পুলিশ এবং দমকল বাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অভিযান চলে।

প্রথমে উদ্ধার অভিযান হিসেবে শুরু হলেও পরে তা দেহ উদ্ধারের কাজে পরিণত হয়। একের পর এক দেহ বের করে আনা হলে অপেক্ষারত পরিবারগুলির কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। এই দুর্ঘটনায় আরও একটি করুণ অধ্যায় হল নীলেশ কুমার এবং অনামিকা সামন্তর মৃত্যু। খুব শিগগিরই তাঁদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। অনামিকার পরিবার কয়েকদিন আগেই বিয়ের প্রস্তুতির জন্য এসেছিল। আনন্দের সেই পরিবেশ মুহূর্তে শোকের ছায়ায় ঢেকে যায়।

অগ্নিকাণ্ডে নিচতলার পেট শপ এবং ক্লিনিকও সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। উদ্ধারকারীরা ধোঁয়া ও ছাইয়ে ঢাকা বিড়ালসহ কয়েকটি প্রাণীকে উদ্ধার করেন। তবে কত প্রাণী মারা গেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ঘটনার পর ভবনটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে।

প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, ভবনটি মূলত আবাসিক হিসেবে অনুমোদিত হয়েছিল। পরে সেটিকে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা শুরু হয়। এছাড়াও অগ্নি নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কিং জর্জ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি জানিয়েছে, এই দুর্ঘটনায় ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং একাধিক আহতের চিকিৎসা চলছে। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে নিহতদের পরিবারগুলির প্রশ্ন একটাই, যদি সময়মতো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হত, যদি যথাযথ নজরদারি থাকত, তাহলে কি এতগুলি প্রাণ বাঁচানো যেত না? সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছে লখনউ, আর শোকস্তব্ধ পরিবারগুলির কাছে রয়ে গিয়েছে শুধুই শেষ ফোনকলের আর্তনাদ, 'আমাকে বাঁচাও'।