
রীতি মেনে ঘট বিসর্জন হওয়ার পরেই মণ্ডপে মণ্ডপে সিঁদুরখেলা শুরু হয়ে গিয়েছে। কলকাতা ও জেলায় জেলায় প্যান্ডেলে সিঁদুরখেলায় মেতেছেন মহিলারা। মা দুর্গার কপালে, পায়ে সিঁদুর ছুঁইয়ে তাঁকে বিদায় জানানোর পাশাপাশি একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে উৎসবে মেতেছেন তাঁরা।

উমার বিদায়বেলায় এই রীতির মধ্যে যেমন রয়েছে বিষাদের ছায়া, তেমনই রয়েছে আনন্দ, সম্প্রীতি ও মিলনের বার্তা। কিন্তু জানেন কি, বাংলার দুর্গাপুজোর সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা এই সিঁদুরখেলার কোনও নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় বিধান নেই?

পুরাণবিদ নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ির ব্যাখ্যায়, রামায়ণ কিংবা মহাভারতে সিঁদুরখেলার কোনও উল্লেখ পাওয়া যায় না। অর্থাৎ, প্রাচীন মহাকাব্যগুলিতে বিজয়া দশমীর এই বিশেষ রীতির উপস্থিতি নেই।

নৃসিংহপ্রসাদ জানাচ্ছেন, বিজয়া দশমীতে সিঁদুরখেলা মূলত একটি সামাজিক আচার। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার লৌকিক সংস্কৃতি, নারীদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং দুর্গাপুজোকে ঘিরে গড়ে ওঠা সামাজিক পরম্পরা।

সিঁদুরখেলার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশিষ্ট পণ্ডিত নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ির বক্তব্য বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর মতে, বিজয়া দশমীতে সিঁদুরখেলার পিছনে কোনও অমোঘ শাস্ত্রীয় বা বৈদিক অনুশাসন নেই। বরং এটি বাংলার লোকাচার ও সামাজিক উৎসবের একটি অংশ।

এই রীতির মধ্যে নারীদের নিজস্ব উদ্যোগ ও সাংস্কৃতিক ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি পুরুষপ্রধান ধর্মীয় পরিসরের মধ্যে সিঁদুরকে কেন্দ্র করে নারীদের নিজস্ব আচার গড়ে ওঠা তাঁদের সামাজিক ক্ষমতারই প্রকাশ বলে ব্যাখ্যা করেছেন নৃসিংহপ্রসাদ। তাঁর মতে, এই প্রথাকে জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠিত করে তোলার পিছনে মহিলাদের অবদান অনস্বীকার্য।

বিজয়া দশমী মানেই মা দুর্গার কৈলাসে ফিরে যাওয়ার সময়। চার দিনের আনন্দের শেষে প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে মণ্ডপে নামে বিষাদের আবহ। সেই বিদায়বেলার মনখারাপকে ছাপিয়ে সিঁদুরখেলা তৈরি করে আনন্দ ও মিলনের এক বিশেষ পরিসর।

একে অপরের কপালে সিঁদুর পরিয়ে, মিষ্টিমুখ করিয়ে এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে মহিলারা এই উৎসবকে সামাজিক বন্ধনের উদ্যাপনে পরিণত করেন। তাই সিঁদুরখেলা কেবল ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শাস্ত্রীয় বিধান থাকুক বা না থাকুক, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই রীতি বাঙালির দুর্গাপুজোর আবেগের সঙ্গে মিশে গিয়েছে।

উমার বিদায়ের মুহূর্তে সিঁদুরখেলা তাই একদিকে যেমন বিচ্ছেদের বিষাদ বহন করে, অন্যদিকে তেমনই মিলনেরও বার্তা দেয়।