
'শিবজ্ঞানে জীবসেবা'। এটাই স্বামী বিবেকানন্দের একমাত্র আদর্শ। জীবেই ঈশ্বর। তাই জীবকে প্রেম কর। জীবনে সাফল্য পেতে আজ মানুষ নানা উপায়ের পথ নিচ্ছে। কেউ যাচ্ছেন জ্যোতিষীর কাছে। কেউ ছুটছেন মন্দিরে। -- সব ছবি সৌজন্য: বেলুড় মঠ রামকৃষ্ণ মিশন

তবুও অনেকে সাফল্য পাচ্ছেন, অনেকে পাচ্ছেন না। ঠিক এই জায়গাতেই স্বামীজিকে আঁকড়ে ধরা যায়। সফল হওয়ার একমাত্র ও নিশ্চিত পথটি তিনিই দেখিয়েছেন।

স্বামীজি বেলুর মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, একথা নতুন করে বলার নয়। কিন্তু 'মিশন' কেন? কখনও মন্দির বলা হয় না। মিশনেই লুকিয়ে আছে সাফল্যের মূলমন্ত্র। যেখানে স্বামীজি বলছেন, 'ওঠো, জাগো এবং লক্ষ্যে পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না।' এই অদম্য জেদকেই আসলে মিশন বলে। একটি উদ্দেশ্য, এবং সেই উদ্দেশ্য সফল না হওয়া পর্যন্ত কাজ করে যাও।

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ গৃহভক্তদের বলতেন, ভক্তিযোগে ঈশ্বরের হাত ধরে রাখতে। অর্থাত্ একটি হাত থাকুক সংসারে, অন্য হাত থাকুক ঈশ্বরে। যার নির্যাস, সংসারের সব কর্তব্য করেও মন ঈশ্বরে রাখো।

স্বামীজি বিশ্বাস করতেন কর্মযোগে। অর্থাত্ কাজ করে যেতে হবে। ফল আসবে নিজেই। কর্মযোগেই ঈশ্বরপ্রাপ্তি। আধ্যাত্মিক মুক্তি ও আত্মউপলব্ধির পথ, যেখানে প্রতিটি কাজকেই ঈশ্বরের প্রতি উৎসর্গ করা হয়। এটি হিন্দুধর্মের একটি প্রধান আধ্যাত্মিক পথ, যেখানে কাজকে প্রার্থনার সমতুল্য মনে করা হয় এবং স্বার্থহীনভাবে দায়িত্ব পালন করা হয়।

রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে গত তিন দিন ধরে সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন। আজ ১২ জানুয়ারিও একাধিক অনুষ্ঠান। অন্যদিকে স্বামীজির কলকাতায় সিমলা স্ট্রিটের বাড়িতেও সকাল থেকে রাজনৈতিক নেতাদের ভিড়।

ইতিমধ্যেই বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদাররা কলকাতায় সিমলা স্ট্রিটের বাড়িতে স্বামীজির মূর্তিতে মাল্যদান করেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসও রাজ্যজুড়ে বিবেক জয়ন্তী পালন করছে। ২০২৬ সালে ভোট। তাই বিবেক জয়ন্তী ঘিরেও রাজনৈতিক তর্জা চলছে বঙ্গে।

স্বামীজির রামকৃষ্ণ মিশনের মতো সংস্থা তৈরির ভাবনা শুনে সিস্টার নিবেদিতা বলেছিলেন, 'আপনি মহান মানুষ। ধন্য আপনার ভাবনা। যে জাতিতে আপনি জন্মগ্রহণ করেছেন সেই জাতি ধন্য । যাঁরা আপনার সান্নিধ্য পেয়েছেন তাঁরা আজ ধন্য। যে গুরুর চরণতলে বসে, যাঁকে সামনে রেখে আপনি এই সংস্থা খুলতে চলেছেন তিনিও ধন্য। যাঁরা আগামীতে আপনাকে নিয়ে চর্চা করবে তাঁরাও সমৃদ্ধ হবেন।'

আজ যে বেলুড় মঠ আমরা দেখছি, এর বীজ বপন হয়েছিল ১৮৯৭ সালের ১ মে। স্বামী বিবেকানন্দ উত্তর কলকাতায় বলরাম বসুর বাড়িতে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন।

যেদিন রামকৃষ্ণ মিশন তৈরি হয়, সে দিন সন্ধ্যায় বিবেকানন্দ বলেছিলেন, 'আমি তিন পা এগিয়েছি। ৫ পা পিছিয়ে এসেছি। সম্প্রদায় যুক্ত পৃথিবীতে আরও একটি সম্প্রদায় তৈরি করার জন্য শ্রীরামকৃষ্ণের জন্ম হয়নি। তিনি প্রত্যেকটি ধর্মের সমৃদ্ধির জন্য তিনি তাঁর জীবন দিয়ে গিয়েছেন। এমনকী সর্বধর্ম সমন্বয়ের ব্রতও নিজের জীবনে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে যত মত তত পথের দিশারি হয়ে উঠেছেন। রামকৃষ্ণ মিশনের সার্থকতা এখানেই যে তাঁরা শুধু তাদের সদস্যেদের নিজেদের মুক্তির জন্য সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করেননি। জগতের কল্যাণের মধ্য দিয়ে নিজের মুক্তি খোঁজা তাঁদের মূল উদ্দেশ্য।'

তাই সাফল্যের জন্য যাঁরা মন্দির, মসজিদ, গির্জা, জ্যোতিষীর স্মরণে যাচ্ছেন, তাঁদের এই ব্যাকুলতা কাটতে পারে একমাত্র স্বামীজির মন্ত্রেই।

স্বামীজি বলছেন, 'তোমরা বিশ্বাস কর যে তোমরা বড় বড় কাজ করবার জন্য জন্মেছ। ওঠ, জাগো, আর ঘুমিও না; সকল অভাব, সকল দুঃখ ঘুচাবার শক্তি তোমাদের ভিতরেই আছে। এ কথা বিশ্বাস করো, তা হলেই ওই শক্তি জেগে উঠবে।'

যাঁরা মানসিক অবসাদে ভুগছেন। কোনও একটি বিষয় বা মানুষকে ঘিরে দীর্ঘদিন কষ্ট পাচ্ছেন, সেই মানসিক চিন্তা বা অবসাদ দূর করারও উপায় বলে দিয়েছেন স্বামীজি।

তা হল, 'যে কোনও কিছু যা তোমাকে শারীরিকভাবে, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এবং আধ্যাত্মিকভাবে দুর্বল করে তোলে, তাকে বিষের মতো প্রত্যাখ্যান করো।' আসলে মনই যে ঈশ্বর, এটাই বারবার বুঝিয়েছেন তিনি। দিনের শেষে আত্মবিশ্বাসই শেষ কথা। স্বামীজির জন্মদিন ঘিরে বেলুড় মঠে নানা অনুষ্ঠান চলছে। তিন দিন ধরেই। রবিবার সন্ধ্যায় স্বামীজির মঙ্গলারতি করা হয়। আজ অর্থাত্ সোমবারও সকাল থেকে ভক্তদের ভিড় বেলুড় মঠে। স্বামীজির স্মরণে বেলুড় মঠে শোভাযাত্রা হবে।