
ধামরাই রথযাত্রা রথযাত্রায় মহা ধুমধামের জন্য শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে দেশজুড়ে। এমনকী ভারতের বাইরেও নানা দেশে রথযাত্রা পালিত হয়। ১৬ জুলাই দেশের সবচেয়ে বড় রথযাত্রা হবে জগন্নাথ ধাম পুরীতে। অনেকেই জানেন না, পুরী প্রথম হলেও ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম রথযাত্রা হয় আহমেদাবাদে। পশ্চিমবঙ্গে রথযাত্রার ইতিহাস বহু প্রাচীন ও ঐতিহ্যশালী।
কিন্তু একটা সময় ছিল, বিশ্বের অন্যতম বড় রথযাত্রা হত বাংলাদেশে। ধামরাই রথযাত্রা। ঢাকার অন্তর্গত ধামরাই উপজেলায় ৫০০ বছরের প্রাচীন রথযাত্রা। একদা বৃহত্তম রথযাত্রা হিসেবে দেখা হত ধামরাই রথযাত্রাকে। আজও পালিত হয়। কিন্তু ১৯৭১ সালের আগে যে ধুমধাম হত, তা অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছে।

পুরীর রথের চেয়েও বড় রথ
ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে ধামরাই। ইতিহাস বলছে, ১৬৭২ খ্রিস্টাব্দের আশেপাশে এই রথযাত্রা শুরু হয়। তারও আগে হতে পারে। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে শ্রীশ্রী যশোমাধবের মূর্তি বিশাল রথে চড়িয়ে মাধববাড়ি মন্দির থেকে গোপীনগর মন্দির পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। রথটি ২৭ ফুট চওড়া ও ৬০ ফুট উঁচু এবং ১৫টি চাকাযুক্ত। ধামরাই রথযাত্রার মূল আকর্ষণ এটাই, সুবিশাল রথ। পুরীর রথ ৪৪ ফুট উঁচু, ধামরাই তার চেয়েও বড়। ১ হাজার কেজি-র দড়ি দিয়ে সেই রথ টানা হয়, যাতে ভক্তরা একবার অন্তত রথের রশি ছুঁতে পারেন।
দেশভাগ ও মর্মান্তিক ইতিহাস
১৯৪৭ সালে দেশভাগ সব কিছু ওলটপালট করে দেয়। ধামরাই পড়ে যায় পূর্ব পাকিস্তানে। পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালে যা স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে তৈরি হয়। দেশভাগের পরেই ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা সম্পূর্ণ ভাবে উঠে যায়। যার নির্যাস, ধামরাইয়ের রথযাত্রার ভবিষ্যত্ ঘিরে আশঙ্কা তৈরি হয়। এই সময় তখনকার দিনের ধনী শিল্পপতি রায় বাহাদুর রণদাপ্রসাদ সাহা এগিয়ে আসেন রথযাত্রার জন্য। তিনিই ধামরাইয়ের রথযাত্রার ভার নেন।

অপারেশন সার্চলাইট সব কিছু তছনছ করল
রণদাপ্রসাদ দায়িত্ব নেওয়ার পরে ঠিকঠাকই চলছিল ধামরাইয়ের রথযাত্রা। কিন্তু ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানের অপারেশন সার্চলাইটে সব শেষ। মুক্তিযোদ্ধাদের খতম করতে পাকিস্তান সেনা নির্মম অত্যাচার শুরু করল। বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুদের খুন, ধর্ষণ, বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া চলতে লাগল। সেই হিংসার শিকার হলেন রণদাপ্রসাদ সাহাও।

১৯৭১ সালের এপ্রিলে রণদা ও তাঁর পুত্র ভবানীপ্রসাদ সাহাকে গ্রেফতার করল পাকিস্তান সেনা। মে মাসে তাঁরা ছাড়া পেলেও কয়েকদিন পরেই ফের আটক। আশ্চর্যভাবে, এর পর থেকে দুজনকে আর দেখা যায়নি। অনেকে বিশ্বাস, পাক সেনাই খুন করে দিয়েছে।

আগুন লাগিয়ে দেওয়া হল রথে
রণদা প্রসাদের অন্তর্ধানের পরেই ১৯৭১ সালের ১০ জুন আগুন লাগিয়ে দেওয়া হল ধামরাইয়ের রথে। পাকিস্তান সেনার সে কী উল্লাস! তার দু সপ্তাহ পরেই ছিল রথযাত্রা। কিন্তু ধামরাইয়ের ৫০০ বছরের প্রাচীন রথ পুড়ে খাঁক। এরপর ১৯৭২ সালে হয়নি ধামরাই রথযাত্রা।
পরে ফের শুরু, কিন্তু সেই ধুমধাম আর নেই
১৯৭৩ সালে ফের শুরু হয় ধামরাই রথযাত্রা। তখন স্বাধীন বাংলাদেশ। পরবর্তীকালেও চলছে সেই রথযাত্রা, কিন্তু জৌলুস হারিয়েছে। ২০০৯ সালে সাহায্যের হাত বাড়ায় ভারত। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি মউ সাক্ষর হয়, তা হল, যশোমাধব মন্দির কমিটির উন্নয়ন ও পুনরায় রথ গড়তে আর্থিক সহায়তা দেবে ভারত।
২০১০ সালে ধামরাইয়ে রথ তৈরি শেষ হয়। এবারে রথের উচ্চতা হয় ৪০ ফুট। ১৬টি চাকা। তারপর থেকে ধামরাইয়ে রথযাত্রা পালিত হচ্ছে। কিন্তু সেই সুবিশাল প্রাচীন রথকে পাক সেনা আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার মর্মান্তিক স্মৃতি আজও ভক্তদের বেদনা।