scorecardresearch
 

Kartik Puja 2021: ধান-ধনুক আর নাচ-গানে বাংলার মেয়েদের কার্তিক পুজো, লোকগানে লুকিয়ে সে ইতিহাস

Kartik Puja 2021: কার্তিক পুজো আসলে যেন সৃজন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট ছন্দে এগিয়ে চলে তিরতির করে।

বাংলার লোকগানে ধরা কার্তিক পুজোর ইতিহাস (প্রতীকী ছবি) বাংলার লোকগানে ধরা কার্তিক পুজোর ইতিহাস (প্রতীকী ছবি)
হাইলাইটস
  • প্রতিটি পুজোরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকে
  • যেমন রয়েছে কার্তিক পুজোরও
  • সেই ইতিহাস ধরা রয়েছে বিভিন্ন লোকগানে

প্রতিটি পুজোরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকে। যেমন রয়েছে কার্তিক পুজোরও। গ্রাম বাংলায় মহিলারা আয়োজন করেন এই পুজোর। যোগ দেন সবাই। পুরোহিত নেই, তিথি নেই, উপোস করতে লাগে না। সেই ইতিহাস ধরা রয়েছে বিভিন্ন লোকগানে।

পুজো মানে সৃজন
কার্তিক পুজো আসলে যেন সৃজন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট ছন্দে এগিয়ে চলে তিরতির করে। মহিলাদের পরিশ্রমের বিভিন্ন পর্ব ধরা পড়ে সেখানে। সে ব্যাপারে জানাচ্ছিলন বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি গবেষক চন্দ্রা মুখোপাধ্যায়।

শুরু পুজোর
তিনি বললেন, পুজো শুরু হয় গান দিয়ে। সেখানে সইরা জড়ো হয়েছেন, আর লেগে পড়েছেন পুজোর তোড়জোড়ে। ''আমার চ্যাংড়া বন্ধু রে আমার ভাবের বন্ধু রে আমার সোনা বন্ধু রে আমার বাড়ি কার্তিক পুজো, ঢাকের বায়না দে''-

গোয়ালপাড়ায় বড় উৎসব কার্তিক সংক্রান্তিতে। কিন্তু একদিনে পুজো করলে সবাই মিলে মজা করা তো হয় না। তাই মেয়েরা নিজেদের মতো করে আনন্দের উপাদান খুঁজে নেন,এক একদিন  একেক জনের বাড়িতে পুজোর আয়োজন করেন; কার্তিক মাসের শুরু থেকে শুরু হয়ে যায় পুজো। দরকার হলে চলে অগ্রহায়ণ সংক্রান্তি পর্যন্ত, ওই সময়কালের যে কোনও দিন।

সেখানে জড়ো হন, সবাই  শুধু  গ্রামের  মেয়েরা নন,অন্য গ্রামের মেয়েরাও। পুরোহিত নেই, তিথি নেই, উপোস নেই। নীহার বড়ুয়া 'প্রান্তবাসীর ঝুলি' বইতে একে বলেছেন  "নমলা কাতি"। গোয়ালপাড়া তো বটেই কোচবিহার, উত্তরবঙ্গের অন্যান্য অংশেও এ পুজোর প্রচলন।একটা করে ঘট আর ধনুক পুজোর  জায়গায় রাখেন । কার্তিকপুজো শুরু হয় 'কাতি সিজ্জন' দিয়ে। সিজ্জন- মানে সৃষ্টি। চণ্ডী শিবের বিয়ে থেকে শুরু হয় সেই পর্ব।

মেয়েরা গেয়ে ওঠেন, ''কাতি রে তোর মাথা বানাইল কোন জনে, আর জনমে রে,
বেল বিলাইছি রে
মাথা বানাইল বাসুদ্যাবে''

তিনি জানাচ্ছন, এর পর কার্তিক বড় হয়ে উঠবে। পরিবারের সদস্যরা বলবেন, ধান চাষ করো-
''কার্তিক মাসে নিড়োলি ধান রইলাম জাগোলি, ও কার্তিক শোনো না ধান কেন বোনো না রে।''

তিনি জানান, মনে অনেক প্রশ্ন উঠেছিল, খোঁজাখুজি করে সেগুলির জবাব পাওয়া গিয়েছে। জাগোলি নামে ধান সত্যি ছিল। কার্তিক মাসে বোনা হত নদীর চরে, খালবিলের ধারে। যাতে সহজে জল পেয়ে বেড়ে ওঠে।

"নাঙল নিলাম জোঙাল নিলাম নিত্য চরের মাঠে"

এখন সেই ধান বিলুপ্ত। শিশুকন্যাদের গরু সাজানো হয়। একজন চাষী সাজে। এভাবে পুরোটা চলে। চাষের কাজে গরু নিয়ে চাষি মাঠে আসে,আর গরুকে ধরতে আসে বাঘ সেজে আরেক জন। গান শুরু হয়-

"শোন সোয়ামি সোনার ধান বাইরাসো না বাঘায় ঘুন্দুলি ছাড়ে"।
এবার নিড়ানি। মেয়েরা দল বেঁধে  কাজ করে--
"মাইয়া ঘরের নিড়ানি, খানিক নাই দেয় জিরানি, খানেক করি নিলিয়া যাই, ঘড়ায় ঘড়ায়
জল খাই রে।"

মেয়েরা কাজ  করতে করতে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েন, তখন গেয়ে ওঠেন,
"দিন গেলে মাইদানি খাই 
তারা উঠলে,বাড়ি যাই রে"
মানে, সকালে বাড়ি থেকে এসেছেন, কাজ করেছেন। বাড়ি ফিরে আবার ঘরের কাজে ঢুকতে হবে।

এভাবে ধান চারা বড় হয়। ধান বাড়ি আসে-
"গলারও গজমতী দেব বর্তি তোমারে, 
দরজা ছাড়ি দাও,  ভারা যাউক ঘরে।"

এরপর  তো ধান শুকোতে দিতে হবে। চড়াই পাখি আসবে না!
রয়েছে তাকে নিয়েও গান--
'চিল মারিয়া বাউই রে ধান খায় খুটিয়া রে'
যেমন শুনি গোয়ালপাড়ায়,তেমন ফরিদপুরে শুনি-
'সাত পাহাক বাউই রে, যুক্তি করে রে খাইয়া গেল কার্তিকে ধান, বাউই রে বাউই রে'

পাখি থাকতে থাকতে ফুড়ুৎ করে উড়ে যায়, সেটাও ধরা পড়ে গানে।
ধান গোলায় তোলার জন্য তৈরি। এবার সমস্যা অন্য। চলে আসবে বাদুড়। তবে মহিলারাও প্রস্তুত তাদের আটকাতে। ধুনক নিয়ে এসেছেন তাঁরা। যা পুজোর উপাচারে দিয়েছিল। ধুনকধারী হয়েছেন তাঁরা। বাদুর হানা চলতে থাকে-
'তীর পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে বাটুল পড়ে রয়।'

মায়েরা শস্যকে রক্ষা করছেন, পাখিও। বাদুড় মারছেন না, তাড়িয়ে দিচ্ছেন। নিজেরা বাঁচছেন, সমাজকে বাঁচাচ্ছেন।

 

 
; ; ;