অধীররঞ্জন চৌধুরীএকদা একটি অঘটন ঘটিয়েছিলেন তিনি। সে ১৯৯৯ সালের কথা। ঠিক তার আগের বছরেই মুর্শিদাবাদ জেলায় বহরমপুর লোকসভা আসনে ২২ শতাংশেরও কম ভোট পেয়েছিল কংগ্রেস। তৃতীয় স্থানে ছিল। আরএসপি প্রায় ৩ লক্ষ ৮৬ হাজার, বিজেপি প্রায় ২ লক্ষ ৬২ হাজার এবং কংগ্রেস প্রায় ১ লক্ষ ৮৯ হাজার ভোট পেয়েছিল।
হঠাত্ ফিনিক্স পাখির যেন উত্থান হল কংগ্রেসে ১৯৯৯ সালে। সেই উত্থানের কাণ্ডারি ছিলেন অধীররঞ্জন চৌধুরী। একবছরের মধ্যে ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন অধীর। আরএসপি প্রার্থী প্রমথেশ মুখোপাধ্যায় পেয়েছিলেন সাড়ে ৩৬ শতাংশের সামান্য বেশি ভোট। বিজেপির সব্যসাচী মাত্র সাড়ে ১৪ শতাংশ। ২৮ বছর আগেকার সেই লোকসভা নির্বাচনে তৎকালীন বিধায়ক অধীর পেয়েছিলেন ৪ লক্ষ ৩৪ হাজারেরও বেশি ভোট। সকলে আশ্চর্য হয়েছিলেন অধীরের ক্যারিশমায়। একবছরে এভাবেও ঘুরে দাঁড়ানো কীভাবে সম্ভব! অতিবড় রাজনৈতিক বিশ্লেষকও সে বার মাথা চুলকেছিলেন।
কাট টু ২০২৬
এবারও সেই একই রকম লড়াইয়ে নেমেছিলেন অধীর। কংগ্রেসকে তৃতীয় স্থান থেকে তুলে আমার লড়াই। সম্ভবত অধীরের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই ছিল ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচন। পারলেন না। হেরে গেলে অধীর। ২০২৪ সালের লোকসভায় হারের পরে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তৈরি হয়েছিল, অধীরের রাজনৈতিক কেরিয়ায় শেষ। কিন্তু তিনি সহজে হার মানতে রাজি হননি। শেষ চেষ্টা করলেন বিধানসভা নির্বাচনে। মুর্শিদাবাদের 'অধীরদাদা'র কাছে চ্যালেঞ্জটি ছিল ১৯৯৯ সালের মতোই। বরং তার চেয়েও কঠিন। কংগ্রেসকে তোলার দায়িত্ব ও সর্বোপরি নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। কিন্তু ব্যর্থ হলেন।
আসলে অধীরের পতন শুরু হয়ে গিয়েছিল ২০২৪ সালেই
২০২৪ সালে বহরমপুর বিধানসভায় লিড ছিল অধীরের। লোকসভার বাকি ৬টি আসনে পিছিয়ে থাকলেও। সেই ভরসাতেই বহরমপুর বিধানসভায় ছাব্বিশে দাঁড়িয়েছিলেন অধীর। কিন্তু দিনের শেষে অধীরের স্থান দ্বিতীয়। তৃতীয় স্থানে রয়েছেন বহরমপুর পুরসভার চেয়ারম্যান তথা তৃণমূল প্রার্থী নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায়। জয়ী হল বিজেপি। আসলে অধীরের পতন শুরু হয়ে গিয়েছিল ২০২৪ সালেই। টানা ৫ বারের সাংসদ অধীর তৃণমূল কংগ্রেসের ইউসুফ পাঠানের কাছে ৮৫ হাজারের বেশি ভোটে হারের পর থেকেই।
ছাব্বিশই কি অধীরের শেষ নির্বাচনী লড়াই?
অধীর জীবনের প্রথম নির্বাচনেও হেরেছিলেন। ১৯৯১ সালের কথা। রাজ্যজুড়ে তখন প্রবল বাম হাওয়া। মুর্শিদাবাদের নবগ্রামে সিপিএম প্রার্থী শিশির সরকারের কাছে হেরেছিলেন অধীর। জীবনের প্রথম নির্বাচনই নয়, বিধানসভার ভোট ছিল সেটি। এরপরের ৫ বছরে বড় অত্থান হয় অধীরের। যে অধীর নবগ্রামে দেড় হাজার ভোটে হেরেছিলেন, পরের বিধানসভায় ২০ হাজারের বেশি লিড নিয়ে নবগ্রাম থেকেই জয়ী হন। প্রথমবার বিধায়ক হন অধীর। এরপর ১৯৯৯ সালে লোকসভায় বহরমপুরে জিতে সাংসদ হলেন।
প্রায় ৩০ বছর পরে অধীর নেমেছিলেন এক অগ্নিপরীক্ষায়। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হল। ১৯৯১ সাল ও ২০২৬ সাল মিলেমিশে গেল। শুধু তফাত্ হল, এবারে রাজ্যজুড়ে পরিবর্তনের ঝড়। যে ঝড়ে মুর্শিদাবাদে খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসও। নবাবের গড়ে মিল একটাই, অধীররঞ্জন চৌধুরী। ছাব্বিশই কি অধীরের শেষ নির্বাচনী লড়াই? রাজনীতিতে নাকি অবসর বলে কিছু হয় না!