‘বেনোজল’ রুখতে বিজেপির নয়া কৌশলএবার রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠিত হতে চলেছে, সোমবার দুপুরের পর থেকেই তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। ২০৭টি আসন জিতেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। ১৫ বছর পর রাজ্যে ক্ষমতার হাতবদল ঘটেছে। পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে অটো ইউনিয়নগুলিতেও। রাতারাতি রং বদলে ফেলছে সংগঠনগুলি! বেহালা, ঠাকুরপুকুর, তারাতলা, রাসবিহারী, কসবা, রুবি—প্রায় সব রুটেই দেখা যাচ্ছে অটোর মাথায় গেরুয়া ঝান্ডা উড়ছে পতপত করে। উল্টোডাঙা, কাদাপাড়া, বাগবাজার, বারাকপুরেও একই ছবি। সর্বত্রই গেরুয়া নিশান উড়িয়ে অটো নেমেছে রাস্তায়। অটোর পাশাপাশি ট্যাক্সি ও টোটো ইউনিয়নের দখলও নিয়েছে বিজেপি। তবে দলবদলের হিড়িককে আপাতত লাগাম পরাতে কড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপি শিবির।
অন্য দল থেকে নতুন করে কাউকে দলে নেওয়ার উপর কার্যত ‘নিষেধাজ্ঞা’ জারি করেছে পদ্ম শিবির। ভোটগণনার পরের দিনেই এই নিয়ে বড় মন্তব্য করেন বঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট, রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতাও ধরে রাখতে পারেনি, সেখানে বিজেপি ২০০-র গণ্ডি পেরিয়ে এককভাবে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছে। এই ফল ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন দল, বিশেষ করে তৃণমূলের একাংশের মধ্যে বিজেপিতে যোগদানের আগ্রহ বেড়েছে বলেই দাবি গেরুয়া শিবিরের। কিন্তু দলবদলুদের এখনি নিতে রাজি নন বিজেপি নেতৃত্ব। অতএব সংগঠনের সব স্তরে জরুরি বার্তা পৌঁছে গিয়েছে। অন্য দল থেকে বিজেপিতে কাউকে যোগদান করানোয় ‘নিষেধাজ্ঞা’ জারি করে দেওয়া হয়েছে। যদিও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, তাঁর দলের অনেককে বিজেপিতে যোগদানের জন্য ‘চাপ’ দেওয়া হচ্ছে।
কেন এই কৌশল নিল বিজেপি
বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, যাঁদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই সাধারণ মানুষ বিপুলভাবে বিজেপিকে সমর্থন করেছেন, তাঁরাই যদি রাতারাতি শাসক দলে ঢুকে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন, তাহলে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই আপাতত দলবদলের ‘দরজা’ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত। রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ‘এই মুহূর্তে কোনও যোগদান করানো হবে না। সংগঠনের সব স্তরেই আমরা এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছি।’ একই সুর শোনা গিয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও দলের রাজ্য রাজনীতি বিষয়ক বিভাগের প্রধান সুকান্ত মজুমদারের কথাতেও। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে কী হবে, তা পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিন্তু আপাতত অন্য কোনও দল থেকে কাউকে বিজেপিতে নেওয়া হচ্ছে না।’
বিজেপির দাবি, তৃণমূলের অনেকেই অবিলম্বে বিজেপিতে শামিল হয়ে যেতে চাইছেন। এই ‘স্রোত’ তথা ‘বেনোজল’ আপাতত রুখতে চায় বিজেপি। যাঁদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং ক্রোধের কারণে রাজ্যবাসী বিপুল সংখ্যায় বিজেপি-কে ভোট দিলেন, রাতারাতি তাঁরাই বিজেপিতে ঢুকে পড়লে জনতা বিজেপির উপর ক্রুদ্ধ হবে বলে পদ্মনেতারা মনে করছেন। তাই আপাতত তৃণমূল বা অন্যান্য দল থেকে কাউকে বিজেপিতে শামিল করানোর উপরে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সল্টলেকে বিজেপি দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিজেপি মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার দলে সদস্য অন্তর্ভুক্তিকরণ নীতি এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, অন্য রাজনৈতিক দল থেকে এসে শুধু বিজেপির সঙ্গে যুক্ত থাকার দাবি করলেই কেউ সংগঠনে গৃহীত হওয়ার অধিকারী হন না। বিশেষ করে, অতীতে যারা দুর্নীতি, হিংসা বা সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের জন্য বিজেপির দরজা বন্ধই থাকবে। ভারতীয় জনতা পার্টি তার আদর্শ বা নৈতিক নীতির সঙ্গে কোনও আপোস করবে না।
তিনি আরও বলেন, এটা লক্ষ্য করা গেছে যে কিছু অসৎ ব্যক্তি এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত লোকজন বিজেপির নাম ও পতাকা ব্যবহার করে নিজেদেরকে মিথ্যাভাবে দলীয় কর্মী হিসেবে জাহির করছে। তিনি এই ধরনের কার্যকলাপের তীব্র নিন্দা করেন এবং স্পষ্টভাবে জানান যে এই ধরনের ব্যক্তিদের সঙ্গে বিজেপির কোনও সম্পর্ক নেই। তিনি আরও জানান, রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের নির্দেশেই, আপাতত দলে সমস্ত নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি স্থগিত করা হয়েছে।