WB Assembly Election Results 2026: শুভেন্দুর সেই ৫% ভোটই ফারাক গড়ে দিল, কীভাবে ঘটল বাংলার রাজনৈতিক রং বদল?

বাংলায় ভোট প্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন 'কয়েকটি জেলায় তৃণমূল খাতাও খুলতে পারবে না।' মোদীর সেই বচন সত্য হয়ে গেল কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, দার্জিলিং, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম বর্ধমান জেলায়। সেইসঙ্গে এবারের নির্বাচনে ৪৬ শতাংশ ভোট পেল বিজেপি। ৪১ শতাংশ ভোট পেল তৃণমূল। মাত্র ৫ শতাংশের ফারাক। আর তাতেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক চিত্র বদলে গেল।

Advertisement
 শুভেন্দুর সেই ৫% ভোটই ফারাক গড়ে দিল, কীভাবে ঘটল বাংলার রাজনৈতিক রং বদল? কীভাবে ভোট বাড়ল গেরুয়া শিবিরের

বাংলায় ভোট প্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন 'কয়েকটি জেলায় তৃণমূল খাতাও খুলতে পারবে না।' মোদীর সেই বচন সত্য হয়ে গেল কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, দার্জিলিং, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম বর্ধমান জেলায়। সেইসঙ্গে এবারের নির্বাচনে  ৪৬ শতাংশ ভোট পেল বিজেপি। ৪১ শতাংশ ভোট পেল তৃণমূল। মাত্র ৫ শতাংশের ফারাক। আর তাতেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক চিত্র বদলে গেল। 

বিজেপি এবার শুধু ভোট বাড়ায়নি, শতাংশের নিরিখেও শাসকদলকে পিছনে ফেলে দিয়েছে অনেকটাই। রাজ্য জুড়ে সার্বিক ভাবে বিজেপির ভোটের হার ৪৫.৮৪ শতাংশ। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটের হার ৪০.৮০ শতাংশ। শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, গত ভোটে  তৃণমূলের দখলে ছিল  ৪৫.৬৭ শতাংশ ভোট। আর বিজেপি পেয়েছিল ৩৮.৬৩ শতাংশ ভোট। একাধিকবার শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছিলেন, 'আর ৫ শতাংশ হিন্দু ভোট দিলেই ওদের উল্টে দেবো' অনেকবার তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, 'আর ৫ শতাংশ ভোট বাড়াতে পারলেই ভারতীয় জনতা পার্টি সরকার গড়বে।' সেই ৫ শতাংশ ভোট এবার ঢুকল বিজেপির ঝুলিতে। তাই এবার সেই ৫ শতাংশ ভোটের ব্যবধানেই তৃণমূলকে পরাজিত করল বিজেপি। 

বিজেপি ‘বহিরাগতদের পার্টি’ বলে প্রচার, স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের (সার) মাধ্যমে প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাদ যাওয়া, গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলায় কথা বলার জন্য নির্যাতনের অভিযোগ, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় এজেন্সি, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর অপব্যবহারের ভূরি ভূরি অভিযোগ— তৃণমূলের এই যাবতীয় প্রচার উড়িয়ে দিয়ে কেন্দ্র–রাজ্যে ডাবল ইঞ্জিন সরকারই গড়তে চলেছে নরেন্দ্র মোদী–অমিত শাহের দল। ২০১৬ সালে মাত্র ২, ২০২১–এ ৭৭ থেকে একলাফে এ বার‍ দু’শো পার করে ফেলল বিজেপি। এবারের ফলাফল বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক পণ্ডিতদের একটা বড় অংশ মনে করছেন, কোনও একটি বা দু’টি নির্দিষ্ট কারণে বঙ্গে এই পালাবদল নয়, এর পিছনে রয়েছে একগুচ্ছ কারণের সমাবেশ। এ বারের ভোটের ফলের সঙ্গে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও কাকতালীয় ভাবে যোগ করছেন তাঁরা। প্রথম, ১৯৭৭–এর পরে এ বছরই প্রথম বাংলায় ভোট হয়েছিল দু’দফায়। সে বার সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কংগ্রেসকে সরিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল বামফ্রন্ট। আর দুই, বাংলায় এ বাবৎ সবচেয়ে বেশি ভোটদানের হার (৮৪.৭২ শতাংশ) ছিল ২০১১–তে, যে বার ৩৪ বছরের বাম জমানার পতন ঘটিয়ে বাংলার তখতে বসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই রেকর্ডকে অনেক পিছনে ফেলে এ বার প্রায় ৯৩ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছেন। এই দুই পরিসংখ্যানকে মিলিয়ে এ বার বাংলায় পালাবদল ঘটতে পারে— এমন সম্ভাবনা দেখছিলেন অনেকে। বাস্তবে বুথফেরত সমীক্ষার হাড্ডাহাড্ডি ফলের ইঙ্গিতকে ধুলোয় মিলিয়ে এমন একপাক্ষিক রেজ়াল্ট যে হতে পারে, তা অবশ্য কেউই ভাবতে পারেননি।

Advertisement

কীভাবে ভোট বাড়ল গেরুয়া শিবিরের?

  • সরাসরি ভোট ট্রান্সফার: তথ্য বলছে তৃণমূলের হারানো ভোটের সিংহভাগ সরাসরি বিজেপির ঝুলিতে গিয়েছে। প্রায় ৬৩ লাখ ভোটের বৃদ্ধি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
  • দ্বিমুখী লড়াই: বাম-কংগ্রেস উল্লেখযোগ্য কিছু করতে না পারায় লড়াই সরাসরি দুই মেরুতে সীমাবদ্ধ ছিল।
  • উচ্চ ভোটদানের হার: ২০২৬-এর রেকর্ড ভোটদান বিজেপির পালে হাওয়া দিয়েছে। নতুন ও অতিরিক্ত ভোটারদের বড় অংশ গেরুয়া শিবিরকে বেছে নিয়েছেন।

এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত ভোট শতাংশের নিরিখে দেখা যাচ্ছে, ২০২১–এর তুলনায় তৃণমূলের (৪৭.৯৪ শতাংশ) ভোট এ বার ৭ শতাংশ কমে হয়েছে ৪০.৮ শতাংশ। আর বিজেপির ভোট শতাংশ ২০২১–এ ৩৮.১ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৪৫.৫২ শতাংশ। বাম–কংগ্রেসের ভোট শতাংশে অবশ্য সেই তুলনায় সামান্যই ফারাক হয়েছে। অর্থাৎ সে দিক থেকে প্রাথমিক ভাবে ধরে নেওয়া যায়, তৃণমূলের ভোটই ভেঙে বিজেপিতে এসেছে। 

ভোট বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এ বার ‘SIR’–এ ৯০ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ায় শাসকদলের পক্ষে ছাপ্পা ভোটের যে সুযোগ ছিল, তা অনেকখানি কমিয়ে দেয়। তার উপরে নির্বাচন কমিশন দু’দফায় কড়া নিরাপত্তায় হিংসামুক্ত ভোট হয়েছে। এর উপরে তৃণমূলের নেতাদের একটা বড় অংশের দুর্নীতি, গত ১৫ বছরে বারবার কাগজেকলমে শিল্পায়নের বার্তা দেওয়া হলেও সে ভাবে কোনও বড় শিল্প না–আসা, সরকারি কর্মসংস্থান কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া— এই সব মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করেছে। শুধু তাই নয়, যে সংখ্যালঘু ভোট গত কয়েক বছরে প্রায় একচ্ছত্র ভাবে তৃণমূলের ঝুলিতে এসেছিল, সেখানেও এ বার থাবা পড়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। বাম, কংগ্রেস, আইএসএফ, আমজনতা উন্ন‍য়ন পার্টির মতো দলগুলিও মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো অনেক জেলায় সংখ্যালঘু ভোটে ভালোরকম থাবা বসিয়েছে।  এই জেলাগুলিতে বিজেপির আসন সংখ্যা যে ভাবে বেড়েছে, তাতে এটা স্পষ্ট, সংখ্যালঘুরাও আর তৃণমূলে পূর্ণ ভরসা রাখতে পারেননি।  ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটের প্রচারে বারবার যতই বলুন, ২৯৪টি আসনে তিনিই প্রার্থী— সেই চিরন্তন মমতা ম্যাজিকও ফিকে হয়ে গিয়েছে।

POST A COMMENT
Advertisement