
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম পর্বে ১৫২ আসনে ভোটগ্রহণের পর এখন চূড়ান্ত পর্বের পালা। ১৪২টি আসনে দ্বিতীয় পর্বের ভোটগ্রহণ ২৯ এপ্রিল। এই দফায় একদিকে যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্ত ঘাঁটিগুলি রয়েছে, তেমনই BJP-র জন্য রাজনৈতিক পরীক্ষার জায়গা। BJP এবং তৃণমূলের মধ্যে এটি মরণ-বাঁচন লড়াই। এই কেন্দ্রগুলিতে যে জিতবে, সে-ই কি বাংলা শাসন করবে?
বাংলার যে ১৬টি জেলায় প্রথম দফার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে, সেগুলিকে BJP-র শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রথম দফায় উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলের আসনগুলিকে কেন্দ্র করে নির্বাচন হয়েছিল, দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এবং কলকাতার আশপাশের আসনগুলো অন্তর্ভূক্ত ছিল।
দ্বিতীয় পর্ব দক্ষিণবঙ্গের 'মূল বলয়ে' অনুষ্ঠিত হবে। যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েপ দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত। তাই এই পর্বটি BJP-র জন্য প্রথম পর্বের চেয়েও বড় পরীক্ষা হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন তাঁর শক্ত ঘাঁটি রক্ষার জন্য লড়ছেন, তেমনই BJP-ও বাংলায় ক্ষমতা দখলের জন্য চেষ্টা করছে।
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্ব
৮টি জেলার ১৪২ আসনে ভোটগ্রহণ চলছে। যেখামে ১ হাজার ৪৪৮ জন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ভর করছে। ২৯ এপ্রিল ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেবেন। তৃণমূল দ্বিতীয় পর্বের ১৪২টি আসনেই প্রার্থী দিয়েছে। অন্যদিকে, ১৪১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে BJP। কংগ্রেসও সমস্ত আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। বামেরা লড়ছে ১০০ আসনে।
দ্বিতীয় পর্বে কলকাতার সমস্ত শহরাঞ্চলের আসন অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। এ ছাড়াও উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা এবং হাওড়া, নদিয়া, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় আসন রয়েছে। একই ভাবে পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমানেও আসন রয়েছে। যেখানে ২০২১ সালে TMC নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছিল। এই আসনগুলিই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাংলায় ক্ষমতার হ্যাটট্রিক করতে সাহায্য করেছিল।
দ্বিতীয় পর্বের রাজনৈতিক সমীকরণ
২৯ এপ্রিল বঙ্গ নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্বের ১৪২ আসনের মধ্যে ২০২১ সালের নির্বাচনে BJP জিতেছিল মাত্র ১৮টি। অপরদিকে, TMC ১২৩টি আসন জিতেছিল। শুধু কলকাতাতেই নয়, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় BJP একটিও আসন জিততে ব্যর্থ হয়েছে। এটি এই এলাকায় মমতার শক্তিশালী প্রভাবের প্রমাণ দেয়।
২০২১ সালে উত্তরবঙ্গ এবং জঙ্গলমহল এলাকার আসনগুলিকে BJP তৃণমূলের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও দক্ষিণবঙ্গে পিছিয়ে পড়েছিল। এ বার BJP পুরোপুরি এই অঞ্চলের উপরই মনোযোগ দিয়েছে। যেখানে তারা গত ৫ বছর ধরে বিভিন্ন ইস্যুতে তৃণমূলকে আক্রমণ করে আসছে। তা সে ২৪ পরগনার সন্দেশখালির ঘটনাটিই হোক বা মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য।
নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্ব BJP-র কাছে বড়সড় পরীক্ষা। পশ্চিম ও পূর্ব বর্ধমান শিল্প ও কয়লা অঞ্চলস অন্যদিকে, ২৪ পরগনা প্রধানত মুসলিম অধ্যুষিত। নদিয়া জেলার করিমপুর, তেহট্ট, চাপড়া ও কৃষ্ণগঞ্জের মতো আসনগুলির সীমান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত। একই ভাবে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাগদা, স্বরূপনগর ও বসিরহাটের সীমান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে আর দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন অঞ্চলের হিঙ্গলগঞ্জ ও সন্দেশখালির মতো এলাকাগুলি বাংলাদেশ সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত।
আর এই বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে বিপুল সংখ্যক মুসলিম ভোটার রয়েছে। যার ফলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জয়ী হয়েছেন। BJP বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসনের বিষয়টিও জোরাল ভাবে তুলে ধরছে। নদিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে, যেখানে CAA একটি বড় ইস্যু। BJP একদিকে যেমন অনুপ্রবেশকারীদের বিতা়নের অ্যাখ্যানও সক্রিয় ভাবে প্রচার করছে।
BJP এই এলাকাগুলিতে অনুপ্রবেশ ও তোষণকে প্রধান ইস্যু বানিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনৈতিক কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। এভাবে BJP ধর্মীয় মেরুকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি স্থাপনের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই কেন্দ্রগুলিতে শুধুমাত্র নিজের আসনগুলি ধরে রাখার দিকেই মনোনিবেশ করেছেন। সেখানে BJP পরীক্ষা দিতে নেমেছে। রাজনৈতি ভাবে এখন কে লাভবান হবে, সেটাই দেখার বিষয়।