ক্যারিশমার নাম শুভেন্দু! ছেলেবেলায় রামকৃষ্ণ মিশনে যেতেন, পরে ছাত্র পরিষদ, আজ CM হওয়ার দৌড়ে

বিজেপির বাংলা জয়ে মোদী-শাহ জুটির ক্যারিশ্মা যেমন ম্যাজিক দেখিয়েছে, তেমনই কামাল করেছেন বাংলার ঘরের ছেলে শুভেন্দু অধিকারীও। পরপর দু'বার মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়কে হারিয়ে তিনি এখন 'জায়ান্ট কিলার'। কিন্তু নন্দীগ্রাম থেকে ভবানীপুর, শুভেন্দুর এই রাস্তা কিন্তু খুব মসৃণ ছিল না। কীভাবে আজ মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে অধিকারী পরিবারের ছেলেটি?

Advertisement
ক্যারিশমার নাম শুভেন্দু! ছেলেবেলায় রামকৃষ্ণ মিশনে যেতেন, পরে ছাত্র পরিষদ, আজ CM হওয়ার দৌড়েকী ভাবে ছাত্র পরিষদ থেকে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে শুভেন্দু অধিকারী?
হাইলাইটস
  • পরপর দু'বার মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়কে হারিয়ে শুভেন্দু এখন 'জায়ান্ট কিলার'।
  • নন্দীগ্রাম থেকে ভবানীপুর, শুভেন্দুর এই রাস্তা কিন্তু খুব মসৃণ ছিল না।
  • কীভাবে আজ মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে অধিকারী পরিবারের ছেলেটি?

বিজেপির বাংলা জয়ে মোদী-শাহ জুটির ক্যারিশ্মা যেমন ম্যাজিক দেখিয়েছে, তেমনই কামাল করেছেন বাংলার ঘরের ছেলে শুভেন্দু অধিকারীও। পরপর দু'বার মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়কে হারিয়ে তিনি এখন 'জায়ান্ট কিলার'। কিন্তু নন্দীগ্রাম থেকে ভবানীপুর, শুভেন্দুর এই রাস্তা কিন্তু খুব মসৃণ ছিল না। কীভাবে আজ মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে অধিকারী পরিবারের ছেলেটি?

বলা হয় ছোটবেলা থেকেই আধ্যাত্মিক ভাবনা চিন্তা করতেন শুভেন্দু অধিকারী। এমনকী প্রতি শনিবার করে রামকৃষ্ণ মিশনে যাওয়াও ছিল শুভেন্দুর নিত্তনৈমত্তিক অভ্যাস। বাড়িতে জমানো খুচরো টাকা নিয়ে মিশনে দিয়ে আসতেন তিনি। এমনকি শুভেন্দুর পরিবারের লোকজন মনে করেছিলেন, যে কোনও সময় বিবাগী পর্যন্ত হয়ে যেতে পারেন শুভেন্দু অধিকারী।

রাজনৈতিক জীবনের শুরু

তবে শেষপর্যন্ত সংসার ত্যাগ করেননি শুভেন্দু। কিন্তু  বিয়ে করে সংসারী হবেন না বলেও পণ করেন তিনি। তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারের শুরু হয় আটের দশকের শেষ দিকে কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজে ছাত্র রাজনীতি দিয়ে। কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ছাত্র পরিষদের হয়ে রাজনীতিতে হাতেখড়ি করেন শুভেন্দু। সেখানে তাঁর নেতৃত্বেই সোমেন-গোষ্ঠীর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

এরপর ১৯৯৫ সালে কাঁথি পুরসভা ভোটে কংগ্রেসের টিকিটে জিতে কাউন্সিলর হন শুভেন্দু। তার তিন বছর পরেই ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গড়েন মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়। শুরুতে সেই দলে শামিল না হলেও, কিছুদিন পর TMC-তে নাম লেখান শুভেন্দু অধিকারী।

১৯৯৯ সাল থেকে তৃণমূলের হয়ে টানা কাজ করতে থাকেন শুভেন্দু। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বাবা শিশির অধিকারীও। ১৯৯৯ সালে কাঁথি কেন্দ্র থেকে লোকসভা ভোটে জেতেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী নীতিশ সেনগুপ্ত। সেই জয়ে বড় অবদান ছিল অধিকারী পরিবারের। এরপর ২০০১ সালে মুগবেড়িয়া বিধানসভা কেন্দ্রে শুভেন্দুকে প্রার্থী করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তৎকালীন বামেদের মৎস্যমন্ত্রী কিরণময় নন্দের কাছে হেরে যান শুভেন্দু।  পরবর্তীতে ২০০৪ সালে লোকসভা ভোটে তমলুক কেন্দ্র থেকে লড়াই করেন শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু সিপিএম-এর লক্ষ্মণ শেঠের কাছে ফের একবার পরাজিত হন শুভেন্দু।

Advertisement

রাজনৈতিক কেরিয়ারে উত্থান শুভেন্দুর

২০০৬ সালের বিধানসভা ভোটে দক্ষিণ কাঁথি কেন্দ্র থেকে জিতে প্রথমবারের জন্য বিধায়ক হন শুভেন্দু অধিকারী। এরপর আসে ২০০৭। বলা চলে এই বছর থেকেই গোটা রাজ্যে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পান শুভেন্দু অধিকারী।  নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠে অধিকারী পরিবারের মেজ ছেলে। ২০০৭ সালে ২৫ নভেম্বর নন্দীগ্রামে তৃণমূল কর্মীদের উপর হামলার অভিযোগ ওঠে সিপিএমের বিরুদ্ধে। সেই সময় অধিকারী পরিবার পাল্টা কর্মসূচির মূল কেন্দ্রে ছিল। 

এরপর ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে শুভেন্দুর নেতৃত্বে সিপিএমকে হারিয়ে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদ দখল করে তৃণমূল কংগ্রেস। ওই বছরই মদন মিত্রকে সরিয়ে শুভেন্দু অধিকারীকে যুব তৃণমূলের সভাপতি করেন মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়। ২০০৯ সালে পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী  লক্ষ্মণ শেঠকে হারিয়ে তমলুক থেকে প্রথমবারের জন্য সাংসদ হন শুভেন্দু অধিকারী। সে বছর কাঁথি পুরসভার চেয়ারম্যান পদেও বাবার স্থলাভিষিক্ত হন শুভেন্দু।

এরপর আসে ২০১১ সাল। পশ্চিমবঙ্গে ঘটে ক্ষমতার পালাবদল। বামেদের হারিয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। মেদিনীপুরে বাড়ে অধিকারী পরিবারের দাপট। ২০১৪ সালে প্রত্যাশা মতোই পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি তমলুক কেন্দ্র থেকে জেতেন শুভেন্দু অধিকারী। তবে এরপরেই শুরু হয়  ডামাডোল। আচমকাই শুভেন্দুকে যুব তৃণমূলের সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে সৌমিত্র খাঁকে বসান মমতা। একইসঙ্গে  অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘যুবা’ নামে একটি সমান্তরাল সংগঠনও তৈরি করা হয়। সেই সময় প্রথম দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি 'শুভেন্দুর ক্ষোভ'এর খবর সামনে আসে।

তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্কে ফাটল

২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম থেকে বিধায়ক হয়ে মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় এন্ট্রি হয় অধিকারী পরিবারের ছেলের। কিন্তু এরপর ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় তৃণমূলের ফল ভাল না হওয়ায় পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব থেকে শুভেন্দুকে সরানো হয়। এমনকি, ২০২০-র অগস্টে তৃণমূলের রাজ্য সরকারি কর্মী সংগঠনের দায়িত্ব থেকে সরানো হয় শুভেন্দুকে। পাশাপাশি, তুলে দেওয়া হয় জেলা পর্যবেক্ষকের পদও। মনে রাখতে হবে, এই সময় একাধিক জেলার পর্যবেক্ষক পদে ছিলেন শুভেন্দু। সেই পদগুলিও হারান তিনি।

তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ শুভেন্দুর

পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর তৃণমূল ছেড়ে  BJP-তে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। এরপর ২০২১ সালে ফের বিধানসভা  নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকেই জয়ী হন শুভেন্দু অধিকারী। সেইবার মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়কে হারিয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম তোলেন তিনি। পরবর্তীতে হন বিরোধী দলনেতা এবং ক্রমশ রাজ্য বিজেপির অন্যতম প্রধান ‘মুখ’ হয়ে ওঠেন তিনিই।

এখন মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে শুভেন্দু অধিকারী

ছাব্বিশের নির্বাচনে বিজেপির বঙ্গ জয়ের অন্যতম কারিগর যে শুভেন্দু অধিকারী তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা থেকে শুরু করে হিন্দু ভোটের একত্রীকরণ করতে শুভেন্দু যে সাফল্য পেয়েছেন, তা ভোটের রেজাল্টেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার উপর আরও এবার মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়কে ভবানীপুরের মাটিতে হারিয়ে নিজের উৎকর্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন শুভেন্দু। বস্তুত তৃণমূলের বিরুদ্ধে যে সমানে সমানে লড়াই করা যায়, সেটা কর্মীদের বোঝাতেও সক্ষম হয়েছেন এই শুভেন্দুই। আর তাই এখন রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়েও নিঃসন্দেহে তাঁর নামই সর্বাগ্রে বিবেচনা করতে বাধ্য হবে দিল্লির গেরুয়া শিবিরও।

 

POST A COMMENT
Advertisement