চম্পাহাটির হারালে ভোটের নিস্তব্ধতা, বন্ধ দোকান-বাজার, জীবিকার পাশাপাশি চিন্তা ভোটাধিকার নিয়েও

হারাল গ্রামে ভোট রয়েছে দ্বিতীয় দফায়। কিন্তু তার আগে এই গ্রামে গিয়ে দেখা গেব, এক অন্য ছবি। বাজি শিল্পের জন্য পরিচিত এই গ্রামে যখন সবসময় বাজি পরীক্ষার জন্য দুমদাম শব্দ হয়, সেই গ্রাম দেখা গেল একেবারে নীরব-স্তব্ধ। বন্ধ বেশিরভাগ দোকানপাট, যেন থমকে গিয়েছে জীবনযাত্রা।

Advertisement
চম্পাহাটির হারালে ভোটের নিস্তব্ধতা, বন্ধ দোকান-বাজার, জীবিকার পাশাপাশি চিন্তা ভোটাধিকার নিয়েওচম্পাহাটির হারালে ভোটের নিস্তব্ধতা
হাইলাইটস
  • কেন থমকে গিয়েছে হারালের বহু মানুষের জীবন?
  • হারালে আশা দেখাচ্ছে একটি আতশবাজির হাব।
  • হারাল গ্রামে এখন কার্যত 'ভোটের নিস্তব্ধতা, সঙ্গে মানুষের নাম বাদ আর জীবিকা নিয়ে চিন্তা।'

নির্বাচন মানেই গণতন্ত্রের মহোৎসব। ভোটররাই যেখানে প্রধান দেবতা। আর তাঁদের খুশি করতে প্রাণপাত করতে 'ভক্তসম' প্রার্থীরা। কিন্তু দক্ষিণ ২৪ পরগনার চম্পাহাটির হারাল গ্রামের বাসিন্দাদের বুঝি তেমন কপাল নয়। ভোটের দিনগুলিতে এখানকার ভোটারদের একটু-আধটু আপ্যায়ন জোটে বটে। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই তাঁরা থাকেন অন্ধকারের আড়ালে। বিশেষ করে গত ছ'মাসে আমুল বদলে গিয়েছে তাঁদের জীবন।

হারাল গ্রামে ভোট রয়েছে দ্বিতীয় দফায়। কিন্তু তার আগে এই গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, এক অন্য ছবি। বাজি শিল্পের জন্য পরিচিত এই গ্রামে যখন সবসময় বাজি পরীক্ষার জন্য দুমদাম শব্দ হয়, সেই গ্রাম দেখা গেল একেবারে নীরব-স্তব্ধ। বন্ধ বেশিরভাগ দোকানপাট, যেন থমকে গিয়েছে জীবনযাত্রা।  অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে হাজার হাজার মানুষের।

কেন থমকে গিয়েছে হারালের বহু মানুষের জীবন?

আসলে বহুদিন ধরেই হারালের পরিচয় আতশবাজির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই শিল্পের ওপর নির্ভর করেই এখানে জীবিকা নির্বাহ করেন বাসিন্দারা। কিন্তু India Today-র প্রতিনিধিরা যখন আজ এই এলাকার গলিগুলো দিয়ে হাঁটালেন, তখন দেখা গেল শূন্যতা, নেই এতটুকু কর্মব্যস্ততা। রাস্তার সারিবদ্ধভাবে বন্ধ দোকানপাট। বাড়ির ভেতরে যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। কয়েক মাস ধরে কাজ পুরোপুরি বন্ধ। আগে দুর্ঘটনা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়াকড়ি এবং এখন ভোটের জন্য থমকে গিয়েছে এখানকার জনজীবন। বিশ্বনাথ মণ্ডল নামে এক বাসিন্দা বলেন, "গত ৬-৭ মাস ধরে কিছুই হয়নি। এটাই ছিল জীবিকা। এখন সব বন্ধ।"

নাম বাদ গিয়েছে, রয়েছে সেই ভয়ও

তবে হারাল গ্রামে যে শুধু অর্থনীতির চাকা থমকে গিয়েছে তা নয়। মানুষের মনে ভয় ঢুকেছে বিপুল সংখ্যক নাম কাটাও। গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ ধন্যে দিয়ে পড়ে রয়েছেন নানা আধিকারিকদের কাছে, কারণ তাঁদের নাম কাটা গিয়েছে। 

একজন স্থানীয় BLO দাবি করেছেন, "বহু মানুষ এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা, কিন্তু তাঁদের নাম নেই। আমরা জানি না, এখন এটা কেন হল?" বেশ কিছু গ্রামবাসীরা দাবি করছেন, আধিকারিকরা ঠিক ভাবে কাগজপত্র জমা দেয়নি, বলেই এমনটা হয়েছে। যদিও তা মানতে রাজি না কর্মকর্তারা।  অনিমা নামে এক বাসিন্দার কথায়, “আধার, বাবার কাগজ সব দিয়েছি। তবু নাম নেই।” একই অভিযোগ শক্তি নামে অপর এক গ্রামবাসীরও।

Advertisement

একদিকে ভোটাধিকার নিয়ে চিন্তা, অন্যদিকে জীবিকাতেও অনিশ্চয়তা। ফলে সব মিলিয়ে নিস্তব্ধ হারাল। স্থানীয়দের দাবি, এখানে বাজি শিল্পের সঙ্গে প্রায় ৪০-৫০ হাজার মানুষ জড়িত। প্রহ্লাদ নামে এক ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার অভিযোগ করে বলেন, লাইসেন্স থাকলেও কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। সবুজ বাজি ও শব্দসীমা মেনেও হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে।

পরিস্থিতির চাপে অনেকেই বাজির দোকান ছেড়ে সবজি বিক্রি, সাইবার ক্যাফে বা অন্য ছোট ব্যবসায় ঝুঁকেছেন। দিলীপ মণ্ডল বলেন, “প্রথমে এখানে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। তারপর এখন ভোট। আমাদের ব্যবসা লাটে উঠে গিয়েছে। নেতারা বলছেন ভোটের পর আবার দোকান খুলবে। কিন্তু বারবার দোকান খোলা, তারপর আবার কিছুদিন পর বন্ধ- এমনটা চলবে না, স্থায়ী সমাধান চাই।” 

একদিকে অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে কাজ বন্ধ—এমন বাস্তবতার মধ্যে দিন কাটছে বিশ্বনাথ মণ্ডলের মতো বহু পরিবারের। তাঁর কথায়, “কেউ কাজ দিলে করব। না হলে না খেয়ে মরতে হবে।”
 
তবে এরমধ্যে তাঁদের আশা দেখাচ্ছে একটি আতশবাজির হাব। আসলে এই এলাকায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আতশবাজি কেন্দ্র গড়ে ওঠার কথা চলছে। যেখানে দমকলের মতো সিকিউরিটিও থাকবে। বাসিন্দারা বলছেন, সময়মতো কাজ শেষ হলে এটি স্বস্তিদায়ক হতে পারে। 

দেবাশিস মণ্ডল নামে এক বাজি প্রস্তুতকারক বলেন, “সাড়ে চার মাস ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। পঞ্চাশ হাজার মানুষ এর ওপর নির্ভরশীল। বাজি হাবটি দ্রুত তৈরি হলে আমাদের উপকার হবে।” তবে আপাতত সে আশা আর কই! ফলে যে গ্রাম একসময় শব্দে মুখরিত থাকত, সেই গ্রামে এখন কার্যত 'ভোটের নিস্তব্ধতা, সঙ্গে মানুষের নাম বাদ আর জীবিকা নিয়ে চিন্তা।'

 

POST A COMMENT
Advertisement