প্রথম দফায় ভোটদানের হার ছাড়াল ৯১ শতাংশছেলেবেলায় দক্ষিণেশ্বরে মন্দিরগামী রাস্তায় এক চপ বিক্রেতাকে মনে পড়ছে। তিনি চপ ভাজতে ভাজতে সুর করে করে বলতেন, 'গরম দিলেও জ্বালা! ঠান্ডা দিলেও জ্বালা!' অর্থাত্ ক্রেতাদের মন পাওয়া বড়ই দুষ্কর। ঠান্ডা চপ দিলে তাঁরা নেবেন না। আবার গরম চপ বেচলে অভিযোগ করবে, এত গরম, জিভ পুড়ে যাচ্ছে!
পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার ভোটের ভোটদানের হার নিয়ে যে হারে আলোচনা চলছে, তার নির্যাস অনেকটা সেই চপ বিক্রেতার সুরেলা হতাশার মতোই। বেশি ভোট পড়লেও নানা জল্পনা, কম ভোটের হার হলেও মুশকিল। বৃহস্পতিবার প্রথম দফার ভোটে ব্যাপক হারে ভোট দিল পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। দুপুর ৩টে পর্যন্তই এদিন ৭৮ শতাংশের বেশি ভোটদানের হার ছিল। সন্ধে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত কমিশনের হিসেব বলছে ভোটদানের হার ৯১.৭৪ শতাংশ। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের হারকে অনেক আগেই ছাপিয়ে গিয়েছে। ছাপিয়ে গিয়েছে ২০১১ সালকেও। ভোটদানের যে প্রবণতা প্রথম দফায় দেখা গিয়েছে, তা থাকলে বিকেল ৫টার মধ্যেই গত লোকসভা নির্বাচনে ভোটদানের হারকে ছাপিয়ে যায় প্রথম দফাতেই। যে ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ হল, সেগুলিতে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৮৩.২ শতাংশ।
এত ভোটদানের হার মানে কি সরকার পরিবর্তন হতে চলেছে?
এখন প্রশ্ন হল, এই এত ভোটদানের হার মানে কি সরকার পরিবর্তন হতে চলেছে? নাকি SIR আতঙ্কে দলে দলে বুথমুখী হলেন মানুষ? চায়ের দোকান থেকে শুরু করে মেট্রো রেল, সব জায়গায় একটাই আলোচনা। bangla.aajtak.in কান পেতে শুনল, কী বলছেন সাধারণ মানুষ। রবীন্দ্র সদনের একটি চায়ের দোকানের জটলায় দেখলাম এক যুবক দোকানের মালিককে বোঝাচ্ছেন কেন এত বেশি শতাংশ ভোট পড়ল? প্রতীক শর্মা নামে ওই যুবকের বলছিলেন, 'এই যা ভোট পড়ল, সরকার পরিবর্তন নিশ্চিত। যখন সরকার ফেলে দেয় মানুষ, তখনই এত ভোট পড়ে।' চায়ের দোকানি শুনলেন, কিন্তু মুখ দেখে মনে হল না, তিনি খুব একটা সহমত নন। বিহার থেকে আসা ওই দোকানি হালকা করে মাথা নেড়ে বললেন, 'এ বাত ঠিক নেহি বাবু। SIR কা ডর থা, ইসলিয়ে ইতনে লোগ ভোট ডালা।'
এবার আসা যাক কলকাতা মেট্রোর গল্পে। স্বাভাবিক ভাবেই মেট্রোতেও ভিড়ের মধ্যে অফিস ফেরত যাত্রীদের মধ্যে একটাই আলোচনা, ভোট কেমন হল? শুনছিলাম। এক প্রৌঢ় মোবাইলে রিলস-এ খবরের ক্লিপ দেখছিলেন। দেখতে দেখতে হাসতে হাসতে বললেন, 'SIR-এর ভয়ে সবাই ভোট দিয়েছে। দেখবেন, সেকেন্ড ফেজে আরও বেশি লোক ভোট দেবে।' পাশেই বসে থাকা এক মহিলা যাত্রী দেখলাম মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, 'আসলে ২০ বছর পরে আমাদের ছেলে-মেয়েরা যাতে না বিপদে পড়ে, তার জন্যই লোকে ভোট দিল।'
পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভোটদানের হার ছিল ২০১১ সালেই
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যাত্রীর আবার একটু গলা জোর বাড়িয়ে বললেন, 'দাদা, ও সব বলে লাভ নেই। বিজেপি আসছে। ২০১১ সাল মনে নেই?' আমি ভাবলাম, সত্যিই তো, ২০১১ সালে কত ভোট পড়েছিল, একবার খোঁজ নিতে হয়। পড়াশোনা করে পাওয়া গেল, পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভোটদানের হার ছিল ২০১১ সালেই। সে বারের নির্বাচনে ভোটদানের হার ছিল মোট ৮৪.৬% (বা আনুমানিক ৮৪% এর বেশি)। ২০১৬ সালে ভোট পড়েছিল ৮২.২ শতাংশ। ২০২১ সালে ভোটদানের হার ছিল ৮৪.৬ শতাংশ। কোনওটাই ২০১১ সালকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটে ৯০ শতাংশের উপরে ভোটদানের হার। দ্বিতীয় দফাতেও যদি এরকম হয়, তাহলে তো ২০১১ সালের রেকর্ডকে ছাপিয়ে যাবেই। এবং পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ ভোটদানের হার হয়ে যাবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেই।
তৃণমূলের সিট বাড়বে?
এই সব সাত-পাঁচ ভাবছি যখন, তখনই কানে এল পার্কস্ট্রিট থেকে ওঠা একদল অফিস যাত্রীর আলোচনা। এক ব্যক্তি আরেকজনকে বললেন, 'লোকে ব্যাপক ভোট দিল কিন্তু। কমিশন ফাটিয়ে কাজ করেছে। নওদা আর ডোমকল ছাড়া অশান্তি কিছু হয়নি কিন্তু। কী মনে হচ্ছে?' পাশের ভদ্রলোক খানিক ভেবে বললেন, 'দ্যাখ ভাই, আমার মনে হচ্ছে, তৃণমূলের সিট বাড়বে। কারণ, লোকজন কিন্তু SIR নিয়ে বিরক্ত।' তারপরেই তাঁর সংযোজন, 'TMC, BJP যে-ই আসুক, আমাদের ভাই এই ভিড়েই অফিস থেকে ফিরতে হবে।' এক ভদ্রলোক আধা বাংলা হিন্দি মিশিয়ে বললেন, 'ঠিক বলিয়েছেন। হামরা আম আদমি। তবে এটা ঠিক, এত লোক ভোট দিলেও, এখনও বোঝা যাচ্ছে না, কী হবে।'
দক্ষিণেশ্বর স্টেশনে যখন নামলাম, মাথায় প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে, SIR-এর প্রভাব নাকি 'পরিবর্তন' নাকি 'প্রত্যাবর্তন'? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শুভেন্দু অধিকারী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, তিনজনেই দাবি করলেন, প্রথম দফাতেই জিতে গিয়েছেন। এত ভোটের হার,তারই প্রমাণ।