মমতা ও শুভেন্দু, দিনভর ভবানীপুর ছাব্বিশের 'নন্দীগ্রাম' হয়ে উঠল ভবানীপুর। তবে এ বার পারদ একুশের থেকে আরও কয়েক ধাপ ঊর্ধ্বে উঠল। বুধবার রাজ্যের দ্বিতীয় দফা ভোটের 'শোস্টপার' ছিল ভবানীপুর। রীতি ভেঙে ভোটের দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়া হোক, চক্রবেরিয়ায় দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্মুখ সমর কিংবা দিনের শেষে তৃণমূলের ক্যাম্পে শুভেন্দুর কোল্ডড্রিঙ্ক খাওয়া, সব মিলিয়ে দিনভর খবরের শিরোনামে ছিল এই হাইভোল্টেজ কেন্দ্র।
দিনভর কী কী ঘটল ভবানীপুরে?
> ভোটের সকালে ভবানীপুরে নজিরবিহীন চিত্র দেখা যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি সাধারণত ভোটের দিন দুপুরে নিজের কালীঘাটের বাসভবন থেকে বেরিয়ে ভোট দিতে যান পাড়ার মিত্র ইনস্টিটিউশন স্কুলের কেন্দ্রে, বুধবার সকাল সকাল গাড়িতে বেরিয়ে পড়েন।
> অন্যদিকে, শুভেন্দু অধিকারী খিদিরপুরের হনুমান মন্দিরে পুজো দিয়ে দিন শুরু করেন। আত্মবিশ্বাসের সুরে সকালেই জানান, সব মানুষ ভোট দিচ্ছে BJP-কেই।
> মন্দির থেকে বেরিয়ে শুভেন্দু বলেন, 'ভবানীপুরে সকলে BJP-কে ভোট করছেন। হিন্দুরা ঢেলে ভোট দিচ্ছেন।' মমতার বুধ পরিদর্শন নিয়ে শুভেন্দুর কটাক্ষ, 'ঠেলায় না পড়লে বিড়াল গাছে ওঠে না।'
> সকালে মমতা বলেন, ‘ববির বাড়িতে মাঝরাতে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। মহিলারা আতঙ্কিত!’ তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূল কাউন্সিলর অসীম বসুকে বেরতে দেওয়া হচ্ছে না। তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে গতকাল রাত দেড়টায় হেনস্থা করা হয়েছে। ধাক্কা দেওয়া হয়েছে। মমতা আরও বলেন, 'মুখ্যমন্ত্রী নয়, প্রার্থী হিসাবে ঘুরছি। কাল সারারাত যা তাণ্ডব করেছে, আপনারা জানেন না। অভিষেক, আমি জেগে ছিলাম।'
> শুভেন্দু দুপুরে চলে যান মিত্র ইনস্টিটিউশনে। তাঁর কথায়, ‘এই বুথেও আমি জিতব।’ এদিকে জয় হিন্দ ভবনের সামনে শুভেন্দু অধিকারী পৌঁছতেই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়। সেইসঙ্গে শুভেন্দুকে 'চোর' স্লোগানও দেওয়া হয়।
> কালীঘাটে যেতেই শুভেন্দু অধিকারীকে ‘চোর-চোর’ স্লোগান দিতে থাকেন তৃণমূল কর্মী-সমর্থকেরা। কনভয় আটকে যায়। কালীঘাট রোড এবং হরিশ মুখার্জি রোডের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু অভিযোগ করেন, বহিরাগতরা অশান্তি তৈরির চেষ্টা করছেন। এদিকে তৃণমূল কাউন্সিলর কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, শুভেন্দু ভোটারদের প্রাভাবিত করার চেষ্টা করছিলেন।
> দুই পক্ষের স্লোগানে তপ্ত হয়ে ওঠে এলাকা। তৃণমূল কর্মীদের জমায়েতের দিকে তেড়ে যান শুভেন্দুও। কমিশনে ফোন করে অভিযোগও জানান। তাঁর একটা ফোনের পরই জটলা ভাঙতে চলে আসে বিশাল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী।
> কালীঘাট রোড এবং হরিশ মুখার্জি রোডের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু অভিযোগ করেন, তাঁর উপর বহিরাগতরা আক্রমণ করছেন।
> মমতা এবং শুভেন্দু ছাড়াও এদিন খবরের শিরোনামে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভ্রাতৃবধূ তথা ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মমতার ভাই কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়। জমায়েতের অভিযোগে তাঁদেরও কেন্দ্রীয় বাহিনী তুলে দেয়।
> সকালে ভোট দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোট দিয়ে বেরিয়ে অভিষেক অভিযোগ করেন নানা জায়গায় হুমকি, হুঁশিয়ারি দিয়ে ভোট করানো হচ্ছে। কমিশনকে তোপ দেগে অভিষেক বলেন, 'ভারতীয় সেনার রাফাল আর যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা শুধু বাকি আছে। ওটাও করে দিন না। বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যা করা উচিত তা আপনারা বাংলার বিরুদ্ধে করছেন। দ্বিতীয় দফাতেই দফারফা হবে BJP।'
> মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিকেলে ভোট দেন মিত্র ইনস্টিটিউশনে। তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, 'গতকাল রাত থেকে ওরা হিংসা চালাচ্ছে। আমাদের অনেক লোককে গ্রেফতার করেছে। এই ধরনের গণতন্ত্র কখনও দেখিনি। ১৯৮৪ সাল থেকে আমার নির্বাচনে লড়ছি। আর এবারের অত্যাচার ভয়াবহ। অনেক নৃশংসতা চলছে।'
> এদিকে ভোটের শেষবেলায় উত্তপ্ত হয় একবালপুর এলাকা। ভবানীপুরের প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী এবং কলকাতা বন্দরের BJP প্রার্থী রাকেশ সিং একবালপুরে পৌঁছতেই উত্তেজনা শুরু হল। ভোটের একদম শেষলগ্নে এসে উত্তপ্ত হয়ে উঠল কলকাতার এই এলাকা। শুভেন্দু এবং রাকেশকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন একদল তৃণমূল কর্মী। 'জয় বাংলা' স্লোগানিং শুরু হয়। শুভেন্দু এবং রাকেশ এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরই কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান এবং কলকাতা পুলিশের RAF যৌথ ভাবে লাঠিচার্জ করে জটলা সরিয়ে দেয়।
> আবার দিনের শেষে দেখা যায় সৌজন্যর চিত্র। ভবানীপুরেই তৃণমূলের একটি ক্যাম্প অফিসে পৌঁছে গেলেন BJP প্রার্থী। সকলের সঙ্গে হাত মেলালেন, খেলেন ঠান্ডা পানীয়ও। বেনজির সৌজন্য দেখল হাইভোল্টেজ ভবানীপুর কেন্দ্র।