শুভেন্দু অধিকারী, শমীক ভট্টাচার্য, দিলীপ ঘোষ১৫ বছর পর পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। BJP সরকারের শপথগ্রহণের তারিখও চূড়ান্ত। রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথমবার BJP বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করছে। ফলস্বরূপ সকলের মনে একটাই প্রশ্ন, BJP কাকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেবে? কার হাতে বাংলার ক্ষমতার রাশ তুলে দেওয়া হবে?
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্বয়ং বাংলার পর্যবেক্ষক হিসেবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতায় আসছেন। এই সফরে তিনি BJP বিধায়কদের সঙ্গে আলোচনা করবেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করবেন। মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে বেশ কয়েকজন নেতার নাম শোনা যাচ্ছে। যার মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে হারিয়ে দেওয়া শুভেন্দু অধিকারী সবচেয়ে এগিয়ে।
বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে শুধু শুভেন্দু অধিকারীই নন, BJP-র রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পল এবং সুকান্ত মজুমদার সহ আরও প্রায় ৬ জন নেতা রয়েছেন। এতে প্রশ্ন উঠছে, কোন নেতা অমিত শাহের রাজনৈতিক মানদণ্ডের সঙ্গে খাপ খাবেন?
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর জন্য শাহের মানদণ্ড কী?
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটের পর কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন, সে বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন অমিত শাহ। কলকাতায় এক সাংবাদিক বৈঠকে অমিত শাহকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, BJP ক্ষমতায় এলে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন। উত্তরে তিনি বলেন, 'যিনিই মুখ্যমন্ত্রী হন না কেন, তাঁকে বাংলার সন্তান, বাংলায় শিক্ষিত, বাংলাভাষী এবং BJP-র কর্মী হতে হবে।'
অমিত শাহ বলেছিলেন, 'আমি বাংলার জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই, পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী এমন একজন হবে যিনি বাংলায় জন্মগ্রহণ করেছেন, শিক্ষালাভ করেছেন এবং অনর্গল বাংলায় কথা বলতে পারেন।' এভাবেই অমিত শাহ মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের জন্য BJP-র মানদণ্ড তুলে ধরেন। এখন যেহেতু BJP ক্ষমতায় এসেছে, সেই অনুযায়ীই নতুন মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হবেন। এটি বাস্তবায়নের জন্য শাহ নিজে পর্যবেক্ষক হিসেবে কলকাতায় আসছেন। যেখানে তিনি বিধায়কদের সঙ্গে কথা বলবেন এবং নতুন মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করবেন।
শুভেন্দু অধিকারীকেই বেছে নেবেন শাহ?
অমিত শাহের মানদণ্ডের সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীই সবচেয়ে যথাযথ। ভবানীপুর আসন থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে তিনি নিজের শক্তি প্রমাণ করেছেন। বাংলা থেকে দিল্লি পর্যন্ত রাজনৈতিক মহলে শুভেন্দুই সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী। ২০২১ সালে শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে বিরোধী দলের নেতা হয়েছিলেন। এবার তিনি শুধু নন্দীগ্রামেই জয়ী হননি, ভবানীপুর আসনেও মমতকে ১৫ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত করেছেন। তাই শুভেন্দু অধিকারীর নাম উপেক্ষা করা কঠিন।
শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে মিলে যাচ্ছে অমিত শাহের দেওয়া ক্রাইটেরিয়াও। তিনি বাংলায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং এখানেই শিক্ষালাভ করেছেন। তিনি ৬ বছর ধরে BJP-তে রয়েছেন। অমিত শাহ এমন নেতাদের পছন্দ করেন যাঁরা একদিকে যেমন আক্রমণাত্মক, তেমনই প্রশাসনের উপর তাঁদের দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ আছে। শুভেন্দুর মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতাও রয়েছে এবং তিনি রাজ্যের প্রতিটি দিকের সঙ্গে পরিচিত। হিন্দুত্ব এবং উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য তিনি শাহের প্রথম পছন্দ হতে পারেন।
শমীক ভট্টাচার্য কি অপ্রত্যাশিত ভাবে দৌড়ে এগিয়ে যেতে পারেন?
শুভেন্দু অধিকারীর ঠিক পরেই রয়েছে শমীক ভট্টাচার্যের নাম। তাঁকে BJP-র 'বুদ্ধিজীবী মুখ' হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নির্বাচনের ফলাফলের পর কলকাতায় আমিত শাহ যখন মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী নিয়ে ভাবছিলেন, তখনই শমীক ভট্টাচার্যের নাম অপ্রত্যাশিত প্রার্থী হিসেবে উঠে আসে। তাঁকে RSS এবং BJP, উভয়েরই প্রিয়পাত্র বলে মনে করা হয়।
শমীক ভট্টাচার্যের বাংলা-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং সকল গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখার ক্ষমতা রয়েছে। রাজ্যে দলীয় সভাপতি হওয়ার পর থেকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। অমিত শাহ এবং সুনীল বনসলের নির্দেশে তিনি সফল ভাবে দলের পুরনো নেতাদের একত্রিত করেছেন এবং দলকে জিতিয়েছেন। শমীকের মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষমতা রয়েছে। অমিত শাহও বোঝেন, বাংলা শাসন করার জন্য শুধু আগ্রসনই যথেষ্ট নয়। বাংলার বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে আনাও অপরিহার্য।
কর্মীদের প্রিয়পাত্র দিলীপ ঘোষও
দিলীপ ঘোষকেও মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলায় BJP-কে শূন্য থেকে শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি খাঁটি বাঙালি ঢঙে কথা বলেন এবং দলীয় কর্মীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। অমিত শাহ সেই সব ব্যক্তিদের প্রশংসা করেন, যাঁরা কঠিন সময়ে দলের পাশে দাঁড়িয়েছেন। যদিও দিলীপ ঘোষের স্পষ্ট ভাষী স্বভাব কখনও শৃঙ্খলায় ব্যআঘাত ঘটায়। তাঁর সংগ্রামী মনোভাবে তাঁকে একজন শক্তিশালী প্রতিযোগী করে তুলেছেন।
সুকান্ত মজুমদারেরও সংগঠনের দক্ষতা রয়েছে
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদে অমিত শাহ এমন একজনকে খুঁজছেন যিনি বিতর্ক এড়িয়ে চলছে এবং সংগঠনের সমন্বয় করতে পারবেন। তাই সুকান্ত মজুমদার একজন যোগ্য প্রার্থী। তিনি প্রাক্তন অধ্যাপক, পশ্চিমবঙ্গের অভিজাত সমাজে তাঁর সুনাম রয়েছে। সুকান্ত একজন প্রচারবিমুখ কিন্তু পরিশ্রমী নেতা। যিনি RSS এবং দলের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারেন।
অগ্নিমিত্রা পলকেও মুখ্যমন্ত্রী করা হতে পারে
পশ্চিমবঙ্গে BJP যদি মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর তাস খেলে, তবে অগ্নিমিত্রা পল হবেন এক শক্তিশালী প্রতিযোগী। তিনি দ্বিতীয়বারের মো BJP-র টিকিটে বিধায়ক হয়েছেন। বাংলায় তিনি নারী সুরক্ষা এবং আরজি করের মতো বিষয় নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বাংলার নারী শক্তি BJP-কেই ভোট দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর ফের বাংলায় অগ্নিমিত্রার মতো কাউকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার বসিয়ে BJP-ও চমক দিতে পারে।
উৎপল মহারাজ 'বাংলার যোগী'
পশ্চিমবঙ্গে আরও একটি নাম নিয়ে চর্চা চলছে। তিনি বলেন উৎপল মহারাজ। যিনি বাংলার যোগী নামেই পরিচিত। তিনি BJP কর্মীদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় না হলেও RSS এবং গেরুয়া বলয়ে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তিনি ধর্মীয় সংগঠন থেকে পদত্যাগ করে কালিয়াগঞ্জ বিধানসভা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হন। বাংলায় হিন্দু ভোট একত্রিত করার ক্ষেত্রে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে চমক দেখাবেন?
অমিত শাহের মাপকাঠিতে শুভেন্দু অধিকারীই সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ তাঁর ঝুলিতে রয়েছে বিজয়ী সেনাপতির খেতাব। তবে শাহের এমন একটি ইতিহাস রয়েছে যেখানে তিনি প্রায়শই এমন একজনকে সামনে নিয়ে আসেন যিনি গণমাধ্যমে একদমই আনকোরা মুখ। BJP মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করে অনেক রাজ্যেই চমক দিয়েছে। একই ভাবে কি তারা বাংলাতেও একজম আনকোরা নেতার নাম ঘোষণা করবে?