
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে রসনার বৈচিত্র্য। গ্রীষ্মের দাবদাহ শুরু হওয়ার আগেই বাজারে আম-আনারসের আনাগোনা শুরু হয়েছে। তবে কেবল চাটনি বা মাখা নয়, প্রতিটি হেঁশেলে নতুন চমক নিয়ে হাজির ‘পোড়া স্বাদে আনারস’ বা গ্রিলড পাইনঅ্যাপল। নুন-মশলার ঝাল আর ফলের নিজস্ব মিষ্টি রসের এই অপূর্ব যুগলবন্দি ছোট-বড় সবার মন কাড়তে বাধ্য। বিকেলের আড্ডায় বা ঘরোয়া পার্টিতে পনির বা চিকেন টিক্কাকে টেক্কা দিতে এখন সাধারণ মানুষের ড্রয়িং রুমেও জায়গা করে নিচ্ছে এই স্বাস্থ্যকর ও মুখরোচক পদটি।

এই রাজকীয় ডিশটি তৈরি করা অত্যন্ত সহজ এবং সাশ্রয়কারী। মূলত মাঝারি মাপের দুটি টাটকা আনারসের সঙ্গে প্রয়োজন ঘরোয়া কিছু মশলা। এর প্রধান উপকরণ হিসেবে থাকছে চাট মশলা, লেবুর রস, বিট নুন, সরষে গুঁড়ো, গুঁড়ো করা শুকনো লঙ্কা, গোলমরিচ এবং সামান্য আইসিং সুগার। ২০২৬-এর এই ব্যস্ত সময়ে দাঁড়িয়ে ঝটপট কিছু মুখরোচক বানাতে চাইলে ১২টি সাসলিক কাঠি বা টুথপিক থাকলেই কেল্লাফতে। উত্তরবঙ্গের চা বলয়ের শীতল বিকেলেও এই মশলাদার আনারসের ঝলসানো গন্ধ এখন অনেকের নাকেই পৌঁছচ্ছে।

প্রস্তুতির শুরুতেই আনারস দুটির খোসা ছাড়িয়ে লম্বা লম্বা করে মোট ৬টি করে টুকরোয় কেটে নিতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, ফলের মাঝখানের শক্ত অংশটি যেন অবশ্যই বাদ দেওয়া হয়। এরপর প্রতিটি টুকরো একটি করে সাসলিক কাঠিতে গেঁথে নিতে হবে। অন্যদিকে, একটি পাত্রে সমস্ত শুকনো মশলা, লেবুর রস এবং আইসিং সুগার দিয়ে একটি ঘন মিশ্রণ তৈরি করে রাখা প্রয়োজন। এই মশলার প্রলেপটিই আনারসের সাধারণ স্বাদকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যা বিড়লা-রাজের আভিজাত্যের মতোই জিভে জল আনে।

রান্নার মূল পর্যায়টি হলো গ্রিলিং। একটি গ্রিল প্যান গরম করে তাতে আনারসের কাঠিগুলো সাজিয়ে দিয়ে মিনিট দু-তিন হালকা আঁচে ঝলসে নিতে হবে। এক পিঠ হালকা লালচে হয়ে এলে ব্রাশ দিয়ে আগে থেকে তৈরি করে রাখা মশলার মিশ্রণটি আনারসের গায়ে ভালো করে মাখিয়ে দিতে হবে। এরপর উল্টে দিয়ে অন্য পিঠটিও একইভাবে মশলা মাখিয়ে গ্রিল করলেই তৈরি। আগুনের আঁচে যখন মশলা ও আনারসের রস মিলেমিশে যায়, তখন যে সুঘ্রাণ বেরোয়, তাতেই অর্ধেক ভোজন সম্পন্ন হয় বলে দাবি রসিকজনদের।

স্বাস্থ্য সচেতন বাঙালির কাছেও এটি এক চমৎকার বিকল্প। আনারসের মধ্যে থাকা ভিটামিন সি ও হজমে সাহায্যকারী এনজাইম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। বিকেলের আড্ডায় তেলেভাজা বা অস্বাস্থ্যকর খাবারের বদলে এই ধরণের ভেষজ গুণসম্পন্ন ও কম তেলের খাবার এখন বাঙালির অন্দরমহলে এক নতুন ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। গরম গরম এই গ্রিলড আনারস পরিবেশন করলে তা কেবল রসনা তৃপ্তিই করে না, বরং গৃহিণীর রান্নার হাতকেও এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে দেয়।

২০২৬-এর এই মরসুমে ঘরে বসেই এমন রেস্তোরাঁ স্টাইল পদ তৈরির ঝোঁক সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে। ডায়েরি থেকে ডিজিটাল প্লাটফর্ম, সর্বত্রই এখন এই ‘পোড়া স্বাদে আনারস’-এর রেসিপি নিয়ে জোর চর্চা। চৈত্র শেষের রোদের ক্লান্তি ভুলে বিকেলের বারান্দায় চায়ের কাপ আর এক টুকরো ঝলসানো আনারসের স্বাদ যে কোনও মানুষের মনকে চনমনে করে তুলতে পারে। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মিশেলে তৈরি এই ঘরোয়া ফিউশন পদটি আগামী দিনে বাংলার খাবার টেবিলে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলেই মনে করছেন খাদ্য বিশেষজ্ঞরা।