scorecardresearch
 
 

পুজোয় 'পিরামিডের দেশে', এক টুকরো মিশরের গপ্পো

অক্টোবর মাসের পাঁচ তারিখ সবে। এখানে শীতকাল আসতে এখনো মাসখানেক বাকি। তাই বেশ গরম। এটাই স্বাভাবিক। অথচ আমার দেশে এখন ভরপুর শরৎ। নীল আকাশে থোকা থোকা সাদা মেঘ। ভোরের দিকে হালকা ঠাণ্ডার ছোঁয়া। পুজোর ঢাকে কাঠি পড়ে গেছে। আজ মহা সপ্তমী। রাস্তায় জনজোয়ার। ভিড় ছেড়ে আমরা এসে হাজির হলুম এলুম মরুভূমির দেশে।

মণিমেখলা মাইতি মণিমেখলা মাইতি
হাইলাইটস
  • অক্টোবর মাসের পাঁচ তারিখ সবে
  • এখানে শীতকাল আসতে এখনো মাসখানেক বাকি, তাই বেশ গরম
  • পুজোর ঢাকে কাঠি পড়ে গেছে, ভিড় ছেড়ে আমরা এসে হাজির হলুম এলুম মরুভূমির দেশে

তুঁতে রঙে হোরাসের মুখ আঁকা ইজিপ্ট এয়ারের ফ্লাইটটা তীব্র রোদ সরাতে সরাতে এগিয়ে যাচ্ছিল দ্রুত গতিতে সীমানা পার হতে হতে। নীচে বালির সমুদ্র, মাথাভাঙা  বালির পাহাড়। কোন গাছপালা, রঙের চিহ্ন বলে কিছু নেই। কেবল রুক্ষতা। কিছুক্ষণ পরে দেখি নীল রঙ উঁকি মারছে। এ রঙ বড্ড চেনা। হালকা হালকা মেঘ ভেসে আছে সে জলের ওপর। তাহলে এটা সুয়েজই হবে। কত ইচ্ছে ছিল এশিয়া-আফ্রিকা মহাদেশের সীমান্ত বরাবর এই কৃত্রিম খালটি একদম কাছে গিয়ে চাক্ষুষ করব, সে আর হল না। হুউশ করে পেরিয়ে গেলাম সেই জলরাশি। খুব তো বেশি চওড়া নয়, মাত্র ২০৩ মিটার প্রায়। সুয়েজ খাল পেরোতেই আবার সেই বালু সাম্রাজ্য। কী দেশ রে বাবা! কিছুই কি নেই?

কতটুকু আর দূরত্ব সুয়েজ খাল থেকে। মাত্র ১৩৩ কিঃমিঃ মেরেকেটে। তাই আস্তে আস্তে উচ্চতা কমাচ্ছে হোরাসের মুখ। হোরাস আসলে আইসিস এবং অসিরিসের সন্তান। মুখটা বাজপাখির। এই সৌরজগত, নভোমণ্ডল, বসুন্ধরাকে পাহারা দেয় হোরাস। মানবজাতির পরম সুহৃদও বটে। যখনই মানুষ বিপদে পড়ে উদ্ধারে এগিয়ে আসে হোরাস-- এমনটাই জানা যায় মিশরীয় পুরাণ থেকে। তাই ইজিস্পিয়ান এয়ারলাইন্সের লোগো হল হোরাস। দেখা গেল একটা কালো সরু পিচ্ছিল রেখা মরুভূমির বুক চিরে কোন দিকশূন্যপুরের দিকে ছুটে চলেছে। তার শুরু ও শেষ কোথায় জানি না। মনে পড়ে গেল প্রায় একশ সাতাত্তর বছর আগে বাংলার সেই প্রগতিশীল রাজপুত্রের বিবরণ--' এ পথ গয়া যাওয়ার রাস্তার চাইতে সুগম, এমনকি দমদম রোড ধরে আমার বাগান-বাড়িতে যাবার রাস্তার চাইতে অনেক ভালো।' মন বেলাগাম কল্পনা করেই চলে। তবে কি এই  মরুভূমির রাস্তা ধরে চারটি আরবি ঘোড়ায় টানা ঢাকা গাড়িতে  দ্বারকানাথ সঙ্গীসাথীদের নিয়ে রওনা হয়েছিলেন সুয়েজ থেকে কায়রো ১৮৪২-এর ১২ ফেব্রুয়ারি? হয়তো হ্যাঁ, বা হয়তো না। হয়তো এমন অনেক রাস্তাই চলে গেছে মরুভূমির বুক চিরে এখানে ওখানে শিরা-উপশিরার মত। সুব্রা থেকে কায়রো, পোর্ট সাইদ থেকে গিজা বা অন্য কোনখানে। প্রথম প্রথম তাঁরা চল্লিশ মাইল করে রওনা দিতেন। কিন্তু পেরে উঠছিলেন না গরমে। তাই পরে তিরিশ মাইল অতিক্রম করতেন পান্থনিবাসে আশ্রয় নিতে নিতে। 

স্থানীয় সময় সাড়ে তিনটেতে আমাদের প্লেন রানওয়েতে নেমে এল। দ্বিতীয়বারের জন্য পা দিলাম কায়রোর মাটিতে। দিন তিনেক আগেই এখানে নামতে হয়েছিল মুম্বাই থেকে আম্মান যাওয়ার জন্য ফ্লাইট চেঞ্জ করতে হবে বলে। মুখে একটু গরম হাওয়ার ঝাপটা লাগলো যেন। অক্টোবর মাসের পাঁচ তারিখ সবে। এখানে শীতকাল আসতে এখনো মাসখানেক বাকি। তাই বেশ গরম। এটাই স্বাভাবিক। অথচ আমার দেশে এখন ভরপুর শরৎ। নীল আকাশে থোকা থোকা সাদা মেঘ। ভোরের দিকে হালকা ঠাণ্ডার ছোঁয়া। পুজোর ঢাকে কাঠি পড়ে গেছে। আজ মহা সপ্তমী। রাস্তায় জনজোয়ার। ভিড় ছেড়ে আমরা এসে হাজির হলুম এলুম মরুভূমির দেশে। যা আমার কাছে সীমাবদ্ধ ছিল চণ্ডীচরণের মানচিত্রের মধ্যে। এয়ারপোর্ট যে জায়গায় তার নাম হেলিওপোলিস। হেলিওপোলিস মিশরের প্রাচীন শহর, যাকে ডাকা হত 'সিটি অফ দ্য সান' বা সূর্যের শহর বলে। এখানে নাকি প্লাটো পড়তেন। এই হেলিওপোলিসেই পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো ওবেলিস্কটি আছে। ওবেলিস্ক হল পাথরে তৈরি চারকোনা একটা উঁচু স্তম্ভ যার মাথাটিও ছোট পিরামিডের মত। সাধারণত প্রাচীন মিশরের মন্দিরগুলির সামনে জোড়ায় জোড়ায় থাকে। প্যারিস শহরের বুকে সেইন নদীর তীরে প্রশস্ত চত্বর প্যালাইস দ্যু কনকর্ডেও একটি ওবেলিস্ক মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ওবেলিস্ক  মিশরের সূর্যদেবতা 'রা'-এর প্রতীক। মিশরীয়রা বিশ্বাস করে  'রা' এই পৃথিবীতে সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, দেবতাদের রাজা। ফ্যারাওরা 'রা'-এর সম্মতি ছাড়া কোন সিদ্ধান্তই নিত না। ' রা'  হলেন রক্ষাকর্তা।

আবু সিম্বেলের মন্দির
আবু সিম্বেলের মন্দির

 সমস্ত রকম ফর্মালিটি সেরে বাইরে বেরোলাম। দাঁড়িয়ে আছে মো, ওরফে মোহাম্মদ--  আমাদের কায়রোর গাইড। বেশ হাসিখুশি, কথা বলে অনর্গল। পিছনে লা মেরিডিয়েন হোটেলের পেল্লায় বিল্ডিং। স্কাইওয়াক ধরে কয়েকশো পা হাঁটলেই সোজা হোটেলে পৌঁছে যাওয়া যায় এয়ারপোর্ট থেকে। একটা  বড় হোন্ডাসিটির পেটের ভিতর ঢুকে পড়লুম আমরা। সোজা গিজা। সন্ধেতে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো। সেরকমই প্ল্যান।

 গাড়ি যত এগোচ্ছে একটা অস্বস্তি টের পাচ্ছি কোথাও যেন-- ভেতরে এবং বাইরে। গরম হাওয়া এসে নাকে মুখে লাগছে। ঘেমে উঠছি। ড্রাইভারকে বললাম--এসি তো কাজ করছে না। বার বার ওরা নব ঘুরিয়ে দেখল। বলল--'ঠিকই তো আছে, ম্যাম। এ তো নতুন গাড়ি।' আমি আরো ঘেমে উঠছি। সন্দেহ প্রবল হচ্ছে যে এসি খারাপ। বাইরে ইঁটের অদ্ভুত সব সারি সারি বাড়ি। লম্বা লম্বা। কোন ছিরিছাঁদ নেই। সবচেয়ে বড় কথা বাড়িগুলোর কোনও জানালা নেই প্রায়। থাকলেও ছোট ছোট কাঠের বাড়ির জানালার মত জানালা।  ইঁটের পর ইঁট গাঁথা দেওয়াল সর্বস্ব বাড়ি। প্লাস্টারই নেই। রঙ তো দূর অস্ত। যেন এক একখানা গুম ঘর, বিবর্ণ। মনটা খারাপ হয়ে গেল। লু থেকে বাঁচতে এমন ভাবে জেলখানার মত বাড়িতে থাকতে হয় বুঝি? এদিকে গাড়ির ভিতর তো আমি ঘেমে নেয়ে অস্থির। ভীষণ বিরক্ত হয়ে বার বার বলাতে ড্রাইভার দেখি হঠাৎ আমার দিকে দরজার কাছে কী একটা সুইচ পরীক্ষা করে টিপে দিল। উফফ, কুলকুলিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া। 'ম্যাডাম, আপনি হিটার অন করে দিয়েছিলেন।' বোঝো কাণ্ড। মমির দেশে শুরুতেই ভুতুড়ে কাজকারবার শুরু হয়ে গেছে।

আহা, একটু পরেই চিত্রপট বদলাতে লাগল। উঁচু উঁচু আধুনিক বাড়ি, ধাঁ চকচকে অফিস, নেড়া নেড়া খেজুর গাছ লাগানো পরিকল্পনা করে, হাল্কা সবুজের ছোঁয়া। এটাই আধুনিক কায়রো। সামনে চওড়া ব্রিজ। গাড়ি ছুটছে। মন বলছে দেখা হচ্ছে তবে শেষ পর্যন্ত। বহুযুগের অপেক্ষার অবসান। দেখা হল তবে কয়েক মিনিটের জন্য। দ্বারকানাথ যার বর্ণনায় প্রথমবার বিলেত যাওয়ার সময় তৃতীয় চিঠিতে ১৮৪২-এ লিখেছিলেন --" ভারি চমৎকার এই নীল নদ, চওড়ায় হবে গঙ্গার অর্ধেক, খুবই পরিষ্কার নদীর জল।' উগান্ডার লেক ভিক্টোরিয়া থেকে উৎপন্ন হওয়া হোয়াইট নাইল এবং ইথিওপিয়ার লেকে টানা সঞ্জাত ব্লু নাইল এসে মিলে গেছে সুদানের রাজধানী খার্তুমের কাছে। একটা ধারা ঘোলাটে, অপরটি হাল্কা নীল। তাদের যুগ্ম রূপই হল এই নীল নদ। 

নাসের লেক
নাসের লেক

আধুনিক কায়রো পেরিয়ে গাড়ি ঢুকলো ঘিঞ্জি রাস্তায়। দেখলেই বোঝা যায় এ শহর বেশ পুরোনো। বাড়ি, দোকান সব ঠেসাঠেসি করে আছে। রাস্তা অপরিসর। সেখানে গাড়ির কমতি নেই। হঠাৎ করেই চমক। বিবর্ণ বাড়িঘর দু হাতে ঠেলে উঁকি মারছে দু খানা ত্রিভুজের ডগা। আরে, আকাশ থেকে যাকে তন্ন তন্ন করে খোঁজার চেষ্টা করছিলাম বার বার, সফল হইনি। এখন কেমন ধরা দিল আচম্বিতে।  ওদের কাছে যাব বলেই তো এত তোড়জোড়। এভাবে ছুটে আসা মনে আশা নিয়ে। কী আনন্দ!

বিস্তৃত ফাঁকা চত্বরে সারি সারি চেয়ার পাতা। দু-চোখে বিস্ময়। সন্ধে নামছে। দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছি আমি। পেরিয়ে যাচ্ছি হাজার থেকে হাজার বছর। নীলের পশ্চিম তীরের বালুকাময় এক মরু  শহরে। চারিদিকে রাতের  অন্ধকার  আকাশে তখন শত তারার মহোৎসব। গমগমিয়ে আনন্দধ্বনি ভেসে এল প্রাচীন সভ্যতার অন্তঃস্থল থেকে --" You have come tonight  most fabulous and celebrating place of the world here in the Plateau of giza"। ধমনী থেকে শোণিতধারা কি চলকে এল একটু? দেখি বেগুনি রঙের আলো চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে সেকালের অন্যতম সপ্তম আশ্চর্যের ওপর। আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে একে একে খুফুর তৈরি গ্রেট পিরামিড, খাফ্রে এবং মেনকুরের তৈরি বিস্ময়, মানবমুখী সিংহ স্ফিংস। সামনে থেকে দেখলে মনে হয় খাফ্রের পিরামিডটাই বড়। কিন্তু আসলে তা নয়। গ্রেট পিরামিড বহরে, আকারে অনেকটাই বড়। তবু ভ্রম জাগে এবং সম্ভ্রম।

প্রাচীন মিশরের চতুর্থ রাজবংশের দ্বিতীয় রাজা খুফুর জন্য তৈরি হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পিরামিডটি। প্রত্যেক দিকের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩০মিটার। উচ্চতা ১৪৭ মিটার। হলুদ রঙের বড় বড় লাইমস্টোন দিয়ে তৈরি। শোনা যায় তেইশ লক্ষ ব্লক কেটে, বয়ে এনে, সাজিয়ে তৈরি হয়েছিল গ্রেট পিরামিড। মধ্য যুগে এত বার পিরামিডগুলি আক্রান্ত হয়েছিল ডাকাত ও দস্যুদের দ্বারা যে পিরামিডগুলির বাইরে যে মসৃণ আস্তরণ ছিল তা আর নেই। ফলে গ্রেট পিরামিডের দৈর্ঘ্য কমে হয়েছে এখন প্রায় ১৩৮মিটার। পিরামিডের ভিতর বার বার ঢুকে তারা সব লুঠ করেছে। এমনকি লুক্সোরের  ভ্যালি অফ কিংসে যে সমাধিগুলি রয়েছে, সেগুলিও বারংবার লুণ্ঠিত হয়েছে। বিস্ময়করভাবে রক্ষা পেয়েছিল তুতেনখামেনের সমাধিটি। এই গ্রেট পিরামিডের মধ্যে ঢুকে কিংস চেম্বারে যাওয়া যায় সরু পথ বেয়ে। কিন্তু সে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ঢোকার সমান, তায় ভীষণ শ্বাসরুদ্ধকর। এর এক গল্প আছে। 

আবু সিম্বেলের মন্দিরের কারুকার্য
আবু সিম্বেলের মন্দিরের কারুকার্য

লুক্সোর থেকে ফিরে আবার যখন কায়রো ফিরে আসি তখন গ্রেট পিরামিডের ভিতরে ঢুকব বলে তিনজনে পিরামিডের গায়ের পাথরের ধাপ ডিঙিয়ে সেই গর্তের কাছে পৌঁছেছিলুম প্রবল উৎসাহ নিয়ে। গুহার মুখ অবধি যেতে বেশ উঁচু উঁচু ধাপ। সে না হয় চড়ে পড়লুম। তারপর শুরু হল সুড়ঙ্গ। প্রথমটা ঠিকই ছিল কিন্তু একটু যাওয়ার পরেই দেখি আলো নেই, একটা টিমটিমে বাল্বের আলো আর সরীসৃপের মত যেতে হবে কিছুটা, সেই বৈষ্ণোদেবী মন্দিরের মত। ভীষণ গরম, পিছনে লোক গিজগিজ করছে। যে পথে যাওয়া, সেই পথেই আসা। এসব দেখলে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। আমি রণে ভঙ্গ দিলাম।  চুপচাপ সুড়ঙ্গের মুখের সামনে একটা জায়গা দেখে দাঁড়িয়ে আছি। একটু পরে এক অস্ট্রেলিয়ান মহিলা ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে 'ইমপসিবল' বলতে বলতে হেসে আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। উনিও রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। দুজনে গল্প করছি। আমার শাড়িখানা ওনার খুব পছন্দ। কিছুক্ষণ পরে গুহার সামনে প্রবল হট্টগোল। একটি বড় মিশরীয় পরিবার সদলবলে ঢুকছে। সঙ্গে চার পাঁচটি ছোট বাচ্চা। দুটো কোলের, একটি কোনরকমে হাঁটতে পারে, তিন চারজন মহিলা। হৈ হৈ করতে করতে সুড়ঙ্গে চলে গেল সবাই। আমি রঙ্গ দেখব বলে প্রমাদ গুনছি। এমন সময়ে প্রবল কান্নার আওয়াজ ভেসে এল ভিতর থেকে। দু তিনটি বাচ্চা তারস্বরে কাঁদছে। আমি জানতুম এ হওয়ারই কথা। অত্যুৎসাহী পিতা মাতা। ওপথে ওদের যাওয়া সম্ভব কোনদিন নয়। দেখি সেই ভদ্রলোক তিনটে বাচ্চাকে নিয়ে বেরিয়ে আসছেন মাথা নাড়তে নাড়তে। বাচ্চাগুলো কেঁদে চোখমুখ লাল করে ফেলেছে একেবারে। তিনি গুহা থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। যারাই ভিতরে গিয়েছিল তারাই জিভ বের করে হাঁপাতে হাঁপাতে আসছে। পিরামিডের মধ্যে জ্যান্ত ঢোকা--- হুঁ হুঁ, এত সোজা নয়।

মাঝের পিরামিডটি চতুর্থ রাজা খাফ্রের জন্য তৈরি। উচ্চতা ১৪৩ মিটার। আর পাশের ছোটটি মেনকুরের। উচ্চতা আরো কম, মাত্র ১০৯ মিটার। খুফু এবং খাফ্রের পিরামিডের মাঝে  পশ্চিমদিকে মুখ করে অবস্থিত বিশালাকৃতি স্ফিংসের মূর্তি। স্ফিংসের প্রসঙ্গ পাওয়া যায় ইওরোপ, আফ্রিকা, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। দেহটি সিংহের, মাথাটি মানুষের, বাজ অথবা বিড়ালের। দুটি ডানা আছে। গ্রীসে স্ফিংসের মাথাটি এক মহিলার কিন্তু গিজার স্ফিংসের মাথাটি পুরুষের। অদম্য শক্তির প্রতীক এই সিংহ পুরুষ। সম্ভবত খাফ্রের আমলে খ্রিষ্ট পূর্ব আড়াই হাজার বছর আগে তৈরি। জনশ্রুতি স্ফিংসের মুখটি রাজা খাফ্রের মত তবে নাকটি ভাঙা। আবার কেউ কেউ বলেন খুফু এই মূর্তি তৈরি করেন তাই মূর্তির সঙ্গে খুফুর মিল বেশি।  ইতিহাসে এসব বিবাদের অন্ত নেই।

সম্মোহিত হয়ে বসেছিলুম প্রায় এক ঘন্টা। দর্শকাসন নিশ্চুপ। তারা ভর্তি আকাশ নির্বাক। শুধু গল্প করে গেল ইতিহাস। এ গল্প থেকে সে গল্প, এক রূপকথা থেকে আরেক রূপকথা, এক কুসংস্কার থেকে আরেক কুসংস্কার, বিস্ময় থেকে বিস্ময়। নেপথ্যে কিন্তু থেকে গেল সেই নীল নদ। মিশরের সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ, জীবন-মৃত্যু। হোটেলে ফিরলুম রাত কাটাতে। নামেই রাত কাটানো কারণ মাঝরাতে উঠতে হবে ভোর ভোর ফ্লাইট ধরার জন্য। যাব সোজা কায়রো থেকে আসোয়ান। মিশর তার সমস্ত রহস্য লুকিয়ে রেখেছে তার এই বালুময় শহরগুলির মধ্যে। 

নেফেরতারির মন্দির, আবু সিম্বেল
নেফেরতারির মন্দির, আবু সিম্বেল

রাতে ঘুম হল না। প্রায় মাঝ রাতেই চেক আউটের জন্য লাউঞ্জে এসে বসলুম। যেহেতু সকালে ব্রেকফাস্ট করতে পারছি না তাই হোটেল কিছু শুকনো খাওয়ার প্যাক করে দেবে। অপেক্ষা করছি। কোথা থেকে প্রবল হট্টগোল ও হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে। নারী পুরুষের কলকাকলি। নিশ্চয়ই কোন অনুষ্ঠান চলছে। এই ধরণের পাঁচতারা হোটেলগুলিতে বিভিন্ন রকম অনুষ্ঠান লেগে থাকে। চমকে উঠলাম প্রবল উলুধ্বনি শুনে। বারে বারে উলুধ্বনিতে কেঁপে উঠছে লাউঞ্জ। নিশ্চিত হলাম নিশ্চই কোন বাঙালি পরিবার ডিসট্যান্ট ওয়েডিং এর স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে কায়রোর এই সুন্দর হোটেলটি। মনে মনে ভাবলুম, আহা কী রোম্যান্টিক! সেই উলুধ্বনি নামছে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে। যুবক যুবতীদের হইহল্লা, হাসির ছররা। দারুণ ঝলমলে সব পোষাক। ক্যামেরার ফ্লাশ। উৎকীর্ণ হয়ে বসে আছি বর কনেটিকে দেখব বলে। ঘনঘন উলু পড়ছে। বিদ্যুত খেলে গেল। ও বাবা, কোথায় বাঙালি! এ তো পুরোপুরি মিশরীয় পরিবার। কনেটি খ্রিস্টান কনের বেশে। সাদা গাউন, মাথায় ভেইল। হাতে ফুল। ছেলেটি কোট প্যান্ট। গলায় বাটারফ্লাই।  মিশরীয়রাও তবে উলু দেয় শুভ অনুষ্ঠানে! চোখের সামনে দেখলুম কেমন সিন্ধু, নীল আর পদ্মা তিরতির করে মিশে যাচ্ছে পরস্পরের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে। বেঁচে থাকুক সভ্যতা। সংস্কৃতি হোক চিরন্তন।

আসওয়ান এয়ারপোর্ট থেকে যখন বাইরে বেরিয়ে এলাম সূর্য আড়মোড়া সবে ভাঙছে। চারিদিকে বেশ ঘুমঘুম ভাব। ভোর ভোর হাজির হয়ে গেছি। বাইরে দেখি গাড়ির সঙ্গে তিনজন লোক। একজন গাইড সঙ্গে দুজন হেল্পার। ড্রাইভার তো আছেই। ইজিপ্টের এটা একটা সমস্যা। খামোখা লোক এসে জুটে যায় গাড়ির হেল্পার বা গাইডের হেল্পার বলে বখশিসের আশায়। তারা কোন অনুমতি ছাড়াই উঠে পড়ে গাড়িতে। একটু কঠিন হয়ে এ সমস্ত ছুটকো ঝামেলা থেকে মুক্তি নিতে হয়। কিছু করার থাকে না। 

বেশ ভি আই পির মতো সঙ্গে সামনে পিছনে গাইডদল নিয়ে ছুটলুম সোজা আসওয়ান ড্যাম। পথে পড়ল আরব-সোভিয়েতের বন্ধুত্বের স্মারক স্বরূপ উঁচু পাঁচটি সরু সরু পাপড়িওয়ালা স্মারক 'লোটাস ফ্লাওয়ার' বা পদ্ম। এখানেও পদ্ম। নীলের ওপর বিশাল বাঁধ দিয়ে তৈরি হয়েছে কৃত্রিম লেক নাসের। নাসেরই নীলের জল ধরে রাখে বছরভর। সেই জলে শস্যশ্যামলা হয়ে উঠেছে মিশর, সুদান। পুরোনো আসওয়ান ড্যামটি যেটি ১৯০২তে তৈরি হয়েছিল তা চাষবাসে সুবিধে করলেও বন্যা আটকাতে পারছিল না। তাই ১৯৫০-এ আরেকটি অপেক্ষাকৃত উঁচু বাঁধের প্রস্তাব করেন মিশরের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি গামাল আব্দেল নাসের। আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল এর পিছনে। উদ্দেশ্যটি হল মিশরের কোণে কোণে বিদ্যুত পৌঁছে দেওয়া। অনেক টানাপোড়েনের পর ১৯৬০-এ আসওয়ানের এই বাঁধ তৈরি শুরু হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য নিয়ে শেষ হয় ১৯৭১-এর জানুয়ারিতে। দৈর্ঘ্যে ৩৮৩০মিটার। ভিতের কাছে ৯৮০ মিটার চওড়া। সর্বোচ্চ উচ্চতা ১১১ মিটার। আর বাঁধ দিয়ে নীলের জল ধরে রাখার জন্য তৈরি হয় ৩০০ মাইল লম্বা ও ১০মাইল চওড়া কৃত্রিম হ্রদ লেক নাসের। যা অবশ্যই এই বাঁধের অন্যতম রূপকার গামাল নাসেরের নামেই উৎসর্গীকৃত। বাঁধ নির্মাণ করার জন্য নীলকে ঘুরিয়ে দিতে হয়েছিল ১৯৬৪-র ১৫ মে। যে নদ এককালে ছিল 'মিশরের দুঃখ', তা প্রায় এক লক্ষ হেক্টর মরু অঞ্চলকে শস্যশ্যামলা করে তুলল। পাল্টে গেল মিশর এবং সুদানের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি। পাহারারত পুলিশেরা পথ আটকাল। এত ভোর ভোর  কেউ আসে না বেড়াতে। বাঁধের ওপর যেতে গেলে টিকিট কাটতে হয়। একদিকে নীলের অপেক্ষাকৃত শীর্ণ ধারা আরেকদিকে টইটম্বুর লেক নাসের। গভীর নীল তার জল। দূরে হ্রদের পশ্চিম তীরে এক দ্বীপে দেখা যাচ্ছে  দেবী আইসিসের মন্দির 'দ্য টেম্পল অফ ফিলা'। আইসিস হলেন উর্বরতা, মাতৃত্ব, ম্যাজিক, মৃত্যু, পুনর্জন্মের দেবী। নৌকো করে যাওয়া যায় ওই দ্বীপে। লেক নাসেরের ওপারে যতদূর চোখ যায় ধু ধু করছে হলুদ রঙের বালি। প্রকৃতির কী অদ্ভুত রঙের খেলা। যেদিকে নীল নদ আটকা পড়েছে জলবিদ্যুত তৈরি হচ্ছে অনেক নীচে। নিচের দিকে তাকালে মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে ওঠে। 

লুক্সোরের মন্দিরের ওবেলিস্ক যার অপরটি রয়েছে প্যারিসে
লুক্সোরের মন্দিরের ওবেলিস্ক যার অপরটি রয়েছে প্যারিসে

সারা দিনটা কেটে গেল নীলের বুকে ভেসে জামিলা ক্রুইজে আসওয়ানের বোট পোর্টে। এই পোর্ট থেকেই সারি সারি বিলাসবহুল নৌকো ছাড়ে লুক্সোরের উদ্দেশ্যে। দুদিন ধরে নীলের ওপর ভেসে চলে। নীলের তীরে যে সমস্ত পৃথিবী বিখ্যাত মন্দিরগুলি আছে সেগুলি নোঙর করে দেখায়। বড্ড সুন্দর এই আসওয়ানের বোট পোর্ট। পোর্টের ধারে বাঁধানো রাস্তার ওপর হোটেল, ব্যাঙ্ক, অফিস। অপর পারে ধু ধু বালুময় পাহাড়। বালির পাহাড়ের ওপরে কী যেন একটা বাড়ি, দেখে মনে হয় কোন সমাধি বা মন্দির। রাতে আলো জ্বলে সেখানে। দূরে সাদা পাল তুলে দাঁড়িয়ে প্রচুর ছোট ছোট নৌকো যার পোশাকি নাম ফেলুক্কা। নীলের বুকে ঘুরে বেড়ায় এরা। নুবিয়াদের গ্রাম ঘুরিয়ে আনে। আমরা কোথাও যাইনি। খোলা ডেক থেকে দেখলাম আকাশে অদ্ভুত গোলাপি রঙ ছড়িয়ে সূর্য টুপ করে নেমে গেল দূরের বালুপাহাড়ের পিছনে। থরে বিথরে আলো জ্বলে উঠল প্রদীপের মত পাহাড়ের গায়ে, দূরের আসওয়ান শহরে। সে আলো ঝিকমিক করছে নদীর জলে। সব সঙ্গীত কার ইঙ্গিতে থেমে গেছে অকস্মাৎ। শুধু যেন আরতির ক্ষীণ ঘন্টাধ্বনি শুনতে পাচ্ছি দূর থেকে। চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মনে পড়ল আজ মহাষ্টমী। সন্ধেটা লাউঞ্জে দারুণ জমে উঠল। একদল স্থানীয় সঙ্গীত শিল্পী এসে নানারকম স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র নিয়ে অদ্ভুত ভাষায়, অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে গান করছে। কয়েকজন বিদেশি তাদের দেখে মজা করে নকল করছে। সবাই হাসিতে ফেটে পড়ছে। এ কি আরবি গান নাকি মিশরের লোকসঙ্গীত বুঝিনি। মনে পড়ছে 'পথে ও পথের প্রান্তে'তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬এ  তাঁর দীর্ঘ ইউরোপ ট্যুর সেরে ইজিপ্ট ভ্রমণ সম্বন্ধে লিখছেন--" ক্কানুন ও বেহালাযন্ত্রযোগে আরবি গান শোনা গেল-- স্পষ্টই বোঝা গেল ভারতের সঙ্গে আরব- পারস্যের রাগরাগিনীর লেনদেন এক সময় খুবই চলেছিল।..." তিনি রবীন্দ্রনাথ। তাঁর পঞ্চেন্দ্রিয়ে যা অনুরণিত হয়, আমার কাছে তা অনুভূত হয় না।  সন্ধে হতেই ক্রুইজ পুরো সরগরম। ট্যুরিস্টে ভর্তি হয়ে গেছে। পরের দিন ভোর তিনটের সময় বেরোতে হবে। গন্তব্য আবু সিম্বেল।

 
আসওয়ান শহর ঘুমোচ্ছে অথচ বোট পোর্টে কর্মব্যস্ততা। একে একে ট্যাক্সি, বাস ছেড়ে যাচ্ছে রাতের অন্ধকার ভেদ করে। রাস্তার টিমটিমে আলো পথ দেখিয়ে নিয়ে চলছে। ক্রুইজ থেকেই আমাদের টিফিন দিয়ে দিয়েছে প্যাক করে। পাঁউরুটি, ডিম সেদ্ধ, কলা, জ্যুস, খেজুর। আসওয়ান থেকে আবু সিম্বেলের দূরত্ব প্রায় তিনশ কিলোমিটার। অন্ধকারে কোথায় যাচ্ছি বুঝিনি। কিন্তু পুবের আকাশে সেই গোলাপি  রঙ ধরতে চমকে গেলাম। এ কোথায় যাচ্ছি রে বাবা। দুদিকে যতদূর চোখ যায় বালি আর বালি, মাঝে মাঝে কালো পাথর দু একটা। একটা বাড়ি নেই, একটা গাছ নেই, একটা প্রাণ নেই। এ তবে মরু না মৃত্যুপুরী! মনে আছে আইসল্যান্ড গিয়ে এমন নির্জনতা দেখে বুক ফেটে জল বেরিয়ে এসেছিল। মনে হয়েছিল এই বিশাল পৃথিবীর শেষ প্রান্তে আমি কেবলই একা। আগের দিন গাইড গল্প করছিলেন। আসওয়ানে বছরে বৃষ্টি হয় কয়েক দিন মাত্র। তাও আহামরি কিছু নয়। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা পৌঁছে যায় পঞ্চাশের কাছে। লেক নাসের বাঁচিয়ে দিয়েছে আসওয়ানকে মৃত্যুর হাত থেকে। দারুণ সুন্দর ইংরেজি বলেন এই মিশরীয় ভদ্রলোক। আসওয়ান এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকবেন লুক্সোর অবধি। অনেক কিছু জানেন। উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন। হায়রোগ্লিফি গড় গড় করে পড়তে পারেন। বাড়িতে ছেলে মেয়ে মা বাবা। এইভাবেই সংসার চলে তাঁর। কথা প্রসঙ্গে বললেন এই ট্যুরিস্ট সিজনেই ( অক্টোবর থেকে মার্চ) তাঁদের যা আয়। গরমে তো কেউ এ মুখো হয় না। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম --' আপনি অফ সিজনে কী করেন?'খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন-- 'আমি তখন পড়াশুনা করি।' কথাটি জ্বলন্ত বারুদের  মত ঠিকরে এসে পড়ল আমার ভেতরে। এর প্রমাণ পেয়েছিলাম লুক্সোরে। লুক্সোর মন্দির দেখতে দেখতে  যখন জানতে চেয়েছিলাম কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ফ্রান্সকে মিশরের রাষ্ট্রপতির দান করা মন্দিরের জোড়া ওবেলিস্কের একটা ওবেলিস্ক ফ্রান্সের কোথায় আছে? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন-- 'পালাইস দ্যু কনকর্ডে'। একদম সত্যি কথা। ষোল বছর আগে সে ওবেলিস্ক আমি দেখেছিলাম প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে সেইন নদীর পাশে। জানতাম না ওটাকে ওবেলিস্ক বলে। ষোল বছর পর লুক্সোরে এসে অনুভব করলাম সেইন আর নীল হাত ধরাধরি করে হাঁটছে।

গাড়ি থেকেই মরুভূমিতে সূর্যোদয় প্রত্যক্ষ করলাম। এতদিন কাকভোরে উঠে কাঁপতে কাঁপতে টাইগার হিল গিয়ে সূর্যকে গগনপটে লাফ দিতে দেখেছি , বঙ্গোপসাগরের বালুকাবেলায় ঝিনুক কুড়োতে কুড়োতে  লাল জল ঠেলে অরুণদেবকে সিক্ত হয়ে উঠে আসতে দেখেছি, কিন্তু মরুভূমিতে অরুণোদয় দেখার সৌভাগ্য কখনো হয়নি। এখানে দেখলুম দিকচক্রবাল রাঙিয়ে শিউলির ওপর শরতের প্রথম শিশিরবিন্দুর মত উষার সোনার বিন্দু 'প্রাণের সিন্ধুকূলে' নয়, বালির সমুদ্রে দেখা দিল। নেমে দেখার অনুমতি নেই। সকাল সকাল পৌঁছে গিয়ে দশটার মধ্যে আবু সিম্বেল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। না হলে গরমেই পঞ্চত্বপ্রাপ্তি। 

খুফুর তৈরি গ্রেট পিরামিড
খুফুর তৈরি গ্রেট পিরামিড

গাড়ি থেমে গেল রাস্তার পাশে। ধু ধু বালুপ্রান্তরে একটা সাদামাঠা দোকান ঘর। নীল রঙে রাঙানো কয়েকটা ইঁটের স্তম্ভ। তার ওপর পাতার ছাউনি। সামনে ব্রেজিল, আর্জেন্টিনা, মিশর প্রভৃতি বিভিন্ন দেশের পতাকা উড়ছে। পাশে একটা চালার নীচে একটা ঘোড়া কিছু শুকনো পাতা চেবাচ্ছে। মরুভূমির বুক ফুঁড়ে চলেছে সারি সারি হাই টেনশান বিদ্যুতের খুঁটি। বালির ওপর সভ্যতার চিহ্ন রেখে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি একে একে এসে দাঁড়াচ্ছে।  দালানের মেঝেতে ছোট ছোট নুড়ি পাতা। তার ওপর কয়েকটা বেতের চেয়ার। চায়ের বন্দোবস্ত আছে। স্যুভেনির, মিশরীয় পোশাক বিক্রি হচ্ছে। মিশরের সবকিছু -- পোশাক আশাক, গয়নাগাঁটি, জিনিসপত্র খুব বর্ণময়। ধূসর মরু অঞ্চলে বাস করতে করতে সবাই রঙিন করে নিয়েছে নিজেদের জীবনযাত্রাকে অজান্তে। সুন্দর রঙের ব্যবহার সর্বত্র। বেশ লাগে। ভিতরে মেঝেতে রঙিন কার্পেট পেতে, রঙিন কাপড়ে চারিপাশ মুড়ে হুঁকো খাওয়ার ব্যবস্থা। বাথরুম আছে। ইজিপশিয়ান ডলার দিয়ে ব্যবহার করতে হয়। তবে সেখানে জলের ব্যবস্থা নেই। আশা করাও বাতুলতা।

কিছুক্ষণ পর দৃশ্যপট বদলাচ্ছে। সবুজ সবুজ গন্ধ চারিদিকে। বাড়ি ঘর। পেট্রোল পাম্প। বাম দিকে একটা রানওয়ে। একটা প্লেন দাঁড়িয়ে আছে। আবু সিম্বেল তবে ফ্লাইটেও আসা যায়। সারি সারি খেজুর গাছ। ওই দূরে উঁকি দিচ্ছে নীল জল। লেক নাসের। লেক নাসেরের তীরেই পৃথিবী বিখ্যাত আবু সিম্বেল মন্দির। গাড়ি থেকে নেমে এলুম। ঘড়িতে প্রায় আটটা বাজে। তখনি সূর্যের ঝাঁঝ বোঝা যাচ্ছে। সারি সারি স্যুভেনিরের দোকান। টুপি, রিং অফ হ্যাপিনেস-- যা মিশরীয় দেবীদের হাতে শোভা পেত, গেঞ্জি, ছেলেদের  মিশরীয় লম্বা গা ঢাকা পোশাক বিক্রি হচ্ছে। দ্রুত চললুম মন্দিরের দিকে। লেক নাসেরের ধার বরাবর ঘোরানো রাস্তা ধরে মন্দির পৌঁছাতে হয়। পুবমুখী এ মন্দির ১৯৭৯ থেকে ইউনেস্কোর হেরিটেজ তালিকায়।

সাংবাদিক Laura Kiniry একবার লিখেছিলেন --" If Abu Simbel had not been saved, places like Vienna's historic centre, Combodia's Angkor Vat and other UNESCO sites might only live in history books."  উত্তর পূর্ব আফ্রিকার নীল নদের উপত্যকা থেকে রেড সী অবধি অঞ্চলটি প্রাচীনকালে পরিচিত ছিল 'নুবিয়া' নামে। ইতিউতি দেখা যেত খেজুর গাছে ঘেরা মরুদ্যান। আর নীলে বন্যা হলে মাঝে মাঝে গজিয়ে উঠত এক সাময়িক একটা জল প্রবাহ। তারপর আবার তারা ঢেকে যেত স্বর্ণরেণু  অর্থাৎ বালিতে। আদতে এটি মরু অঞ্চল। এছাড়া নুবিয়াতে সোনা পাওয়া যেত বলে এই অঞ্চলকে  বলা হত স্বর্ণভূমি। বর্তমানে এটি দক্ষিণ ইজিপ্ট আর উত্তর সুদানে অবস্থিত। এখানেই গড়ে উঠেছিল আবু সিম্বেল মন্দির কমপ্লেক্স আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০ সালে। রাজা দ্বিতীয় রামসেস এবং তাঁর রানি নেফেরতারি তাঁদের স্মৃতি মন্দির তৈরির জন্য বেছে নিয়েছিলাম নুবিয়ার এই প্রত্যন্ত অঞ্চল। তাই এই নদীপ্লাবিত স্বর্ণভূমিতে গড়ে উঠেছিল দুটো মন্দির। একটি বড়। একটি ছোট। বড়টি দ্বিতীয় রামসেসের। ছোটটি রানি নেফেরতারির। মন্দির তো নয়, বিস্ময়। পুব মুখো মন্দির। সূর্যের প্রথম আলো এসে বড় মন্দিরের সামনে রাখা চারটি বড় বড় রামসেসের মূর্তির ওপর( একটি মূর্তি অবশ্য ভাঙা)। ভেতরে রামসেসের বীরত্বের কাহিনি দেওয়াল জুড়ে খোদাই করা এবং হায়রোগ্লিফিতে লেখা। ছাদে চমৎকার নকশা। প্রচুর দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করা রয়েছে। কী বিশাল বিশাল থাম। মন্দিরের প্রবেশদ্বারে রামসেসের চারটি বিশাল বিশাল মূর্তির  পায়ের তলায় বেশ কয়েকটি ছোট ছোট পুতুলের মত মূর্তি। ওগুলো রানি এবং সন্তানদের মূর্তি। তারও সামনে সারি সারি হোরাসের প্রতিকৃতি। প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে দুপাশে বড় বড় গোল থামওয়ালা করিডোর পেরিয়ে এগিয়ে গেলে দেখা যায় পুবদিকে মুখ করে আছে দ্বিতীয় রামসেসের পাথরের মূর্তি। গাইড অবাক করে দিয়ে জানালেন --- প্রায় কুড়ি বছর ধরে নির্মিত এই মন্দিরের গঠনশৈলি এমনই বিস্ময়কর যে ২২ ফেব্রুয়ারি ( রামসেসের সিংহাসন আরোহণের দিন) এবং ২২ অক্টোবর ( রাজার জন্মদিন) নবীন রবির আলো ৬০ মিটার সরাসরি মন্দিরের ভিতরে এসে রামসেসের মূর্তির মুখে এসে পড়ে এবং মন্দিরকে আলোকিত করে। হিসেব কত নিঁখুত হলে একটা সরলরশ্মি এতটা পথ পেরিয়ে এভাবে সোজা ঢুকে আসতে পারে। বড় মন্দিরে ছোট বড় কক্ষ। হায়রোগ্লিফিতে কীসব লেখা। দেবতা আমেনের মূর্তি যত্রতত্র। পাশে রানি নেফেরতেরির মন্দির। সামনে রানির দুটো মূর্তি আর চারটি রামসেসের। আকৃতিতে মন্দিরটি একটু ছোট। এখানেও সমস্ত দেওয়ালে প্রাচীন দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করা, দেওয়াল জোড়া হায়রোগ্লিফি।  মন্দির দুটি বালির তলায় চাপা পড়েছিল বহু বছর। ১৮১৩ নাগাদ সুৎজারল্যান্ডের জন লুডউইগ এটি বালির মধ্যে আবিষ্কার করেন এবং ১৮১৭ নাগাদ বালি সরিয়ে মন্দিরটিকে উদ্ধার করা হয়। তবে আমার কাছে অনেক বেশি রোমহর্ষক ছিল গাইডের কাছে শোনা এই দুই বৃহৎ মন্দিরের রিলোকেশানের কাহিনি। একটু সে গল্প শোনাই। না হলে আবু সিম্বেলের কাহিনি অসম্পূর্ণ।

খাফ্রের পিরামিড
খাফ্রের পিরামিড

 ১৯৫৯ নাগাদ ইউনেস্কোকে চিঠি দিল মিশর এবং সুদান সরকার এই বৃহৎ আবু সিম্বেলের মন্দিরকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য। কারণ আশঙ্কা ছিল পরের বছর আসওয়ানে নীলের ওপর বাঁধ তৈরি শুরু হলে লেক নাসেরের জলের তলায় তলিয়ে যাবে দ্বিতীয় রামসেসের তৈরি এ বৃহৎ মন্দির কারণ মন্দিরটি একটু নীচে অবস্থিত। অন্তত মূল স্থান থেকে ২০০মিটার ভিতরে এবং ৬৫মিটার উঁচুতে না তুললে রামসেসের এ কীর্তি অচিরে কালের গর্ভে বিলীয়মান হবে। কিন্তু এত বড় মন্দিরকে সরিয়ে ফেলা সহজ কথা নয়। ভেঙে চৌচির হয়ে যেতে পারে নকশা, আদল নষ্ট হয়ে যেতে পারে, বৈজ্ঞানিক সূক্ষ্ম মাপজোকগুলি নড়ে যেতে পারে। টাকার কথা তো ছেড়েই দিলাম। তাছাড়া এ মন্দির তো পাথর দিয়ে নির্মিত নয় পিরামিডের মত। এ মন্দির তৈরি হয়েছিল মরুভূমির বুকে পাহাড় খোদাই করে। তাই পাহাড় কেটে  মন্দিরকে উঁচুতে তুলে আনতে হবে অতি সাবধানে। সোজা নয় কাজটি।

ইউনেস্কো এই মন্দির রিলোকেশানের জন্য অর্থভাণ্ডার তৈরির কাজ শুরু করল ১৯৬০ থেকে। এগিয়ে এল সুইডেন, পোল্যান্ড প্রভৃতি বহু দেশ। এই রিলোকেশানের মূল স্থপতি হলেন পোলান্ডের মিকেলোস্কি। সঙ্গে বহু ইঞ্জিনিয়ার, জলবিজ্ঞানী, নৃতত্ত্ববিদ প্রমুখ। আগে যে স্থানে মন্দিরটি ছিল সেখান থেকে আরো ২০০মিটার  ভিতরে ও প্রায় ৬৫ মিটার উঁচুতে বর্তমান স্থানটি নির্বাচন করা হয়। এরপর শুরু হয় পৃথিবীর অন্যতম দুঃসাহসিক ও অভূতপূর্ব উদ্ধার। মন্ত্রমুগ্ধের মত সে গল্প শুনছিলাম। মন্দিরের পাশে একটি ঘরে বড় পর্দায় দেখানো হচ্ছিল সেই উদ্ধারপর্ব। কীভাবে বড় বড় ক্রেন কেটে রাখা পাথরের ব্লক, মূর্তিগুলিকে  তুলে আনছে। মাথায় হেলমেট পরে শতশত লোক কাজে ব্যস্ত। এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। এ মরুভূমিতে প্রখর সূর্যালোকে এমন সূক্ষ্ম ও নিঁখুত কাজ করাটাই ছিল ইউনেস্কোর কাছে চ্যালেঞ্জ। যেহেতু আবু সিম্বেলের মন্দির বহুছিদ্রযুক্ত বেলেপাথরে খোদাই করা, তাই বিস্ফোরক ব্যবহার না করে পুরো মন্দিরটিকে ব্লক করে কেটে কেটে সরানোর ব্যাবস্থা হয়। প্রথমে মন্দিরের ছাদটিকে বুলডোজার দিয়ে সরিয়ে ফেলা হয়। তারপর মন্দিরের সম্মুখভাগ ও দেওয়ালগুলি বড় বড় হাত করাত দিয়ে ব্লক ব্লক করে কেটে ফেলা হয়। বড় মন্দিরটি প্রায় ৮০৭টি ব্লকে ভাগ করা হয় এবং রানি নেফেরতেরির ছোট মন্দিরটি ২৩৫টি ব্লকে। এক একটির ওজন প্রায়  ২০--৩০টন। যেহেতু মূল স্থান  থেকে মন্দিরটি খুলে আনা হয়েছিল তাই বর্তমানে যেখানে মন্দির তার ব্যাকগ্রাউন্ডটা তৈরি হয় কিছুটা কৃত্রিম পাথরে। আর্চের মত বড় ছাদ তৈরি করতে হয় মন্দিরের ওপর বর্তমান আকৃতি দেওয়ার জন্য। এবং আগের মন্দিরের জায়গা থেকে কিছু পরিত্যক্ত পাথর এনে মন্দিরের পিছনে কৃত্রিম পাহাড় তৈরি হয় যাতে করে একঝলকে মনে হয় বর্তমান আবু সিম্বেলের মন্দিরটিও পাহাড়ের খাঁজে পাথর কেটে তৈরি। এরপর নিঁখুতভাবে ব্লকগুলিকে জুড়ে ফেলা হয় ড্রিল করে। খাঁজগুলো ভরে ফেলা হয় একধরণের কৃত্রিম পদার্থে। আগের মন্দির ঠিক যে দ্রাঘিমা ও অক্ষাংশে ছিল ঠিক সেভাবেই এমনভাবে প্রতিস্থাপন করা হয় যে এখনো প্রত্যেক বছর ২২ ফেব্রুয়ারি ও ২২ অক্টোবর সূর্যের আলো সোজাসুজি ৬০ মিটার ঢুকে রামসেসের মূর্তিকে আলোকিত করে। 

এ গল্প শোনার পর শুধু মাথাটা উঁচু করে মন্দিরটি একবার অবলোকন করে ভাবছিলাম বিজ্ঞান দিনে দিনে নিজেকে এগিয়েই নিয়ে গিয়েছে। আজ থেকে প্রায় তিনহাজার বছর আগে বিজ্ঞান যেমন এগিয়ে ছিল, এখনো তাই। নীলের বন্যার হাত থেকে মিশর বেঁচেছে আর মন্দির বেঁচেছে লেকের উচ্চ জলস্তর থেকে। সামনে লেক নাসেরের নীল জল। ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। রোদের মাত্রা চড়তেই আছে ঘড়িতে যদিও দশটা বাজেনি। দ্রুত পটপরিবর্তন ঘটবে। উত্তপ্ত হবে বালু। তখন ঘোরাফেরা করা দায়। মনে হিসেব করে নিচ্ছিলাম মন্দিরের আগের অবস্থান ঠিক কোথায় ছিল? সে স্থান নাসেরের তলদেশে কোন গভীর নিদ্রায় মগ্ন কী জানি! বুকে আগলে রেখেছে কত অজানা ইতিহাস, পরিশ্রম, দীর্ঘশ্বাস-- বোঝার উপায় নেই। আসওয়ান থেকে প্রায় তিনশ কিমি দূরের এই মন্দিরটিই এখন অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত। স্বর্ণভূমির প্রাচীন প্রতিনিধি। মন্দিরের পাশে নাসেরের ধারে একটা ছায়া ঘেরা জায়গায় সবাই বসে পড়েছে হাত পা ছড়িয়ে। মূলত বিদেশিরা। বাঙালি খুব একটা নেই। দূরে জলরেখার ওপর ইতিউতি পাহাড়ের মাথা চোখে পড়ছে। বক উড়ছে। প্রচুর মাছ আছে নাসেরের জলে, কুমিরও। নাসেরের জল এই মরুভূমিকে করেছে প্রাঞ্জল। চাষ হচ্ছে। আবু সিম্বেল তাই মরুভূমির মাঝে এক টুকরো মরুদ্যান।

দু চারটে স্যুভেনির কিনে বেরিয়ে এলাম। জানি না এ জন্মে মরুভূমির বুক চিরে আবার কোনদিন দ্বিতীয় রামসেসে, নেফেরতেরির অতিথি হয়ে ফিরে আসব কিনা, তবুও বিদায়। শ্রান্ত হয়ে গাড়িতে উঠে ঠাণ্ডা হাওয়ায় ধাতস্থ হতে শুরু করেছি, গাইড বলল আপনাদের জন্য এক চমক আছে। এ দেশে পা দেওয়া ইস্তকই তো চমকের পর চমক, পুলকের পর পুলক। আবার কী তবে? চোখদুটো মুদেই এসেছিল। খুলে গেল গাইডের কথায়--' ম্যাডাম, জাস্ট সি'। এ কী! এ কোন মন্ত্রবলে পাল্টে গেল সবকিছু! পথ হারালাম, নাকি পথ হারানোর জন্যই এ পথে আসা!  তবে যে পথে পাঠান এসেছিল সে পথে ফিরছে না! সকালে যে পথে দেখেছিলাম দুদিকে বিস্তীর্ণ বালির সমুদ্র, সে পথে এখন জলদেবী খেলা করতে করতে কালো পিচরাস্তা এবং রাস্তার দুদিক ধুইয়ে দিচ্ছে। যতদূর চোখ যায় জল আর জল। স্থান কাল সব বিস্মৃত হলাম। এই অঞ্চলেও তবে কচ্ছের রানের মত বিস্তীর্ণ লোনা জলের জমি রয়েছে? ভূগোলে তো কোনদিন পড়িনি। কচ্ছের রানে দেখেছিলুম নেড়া রাস্তার দুপাশে  এমন বিপুল জলরাশি। বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকুই বা জানি। কিন্তু জল ঠেলে এগিয়ে যেতেই  গিলি গিলি হোকাস পোকাস। জল ভ্যানিশ। কী হল তবে? গাইড হেসে বললেন -- 'ম্যাডাম, মিরেজ।'  ম-রী-চি-কা? সে তো বিজ্ঞান  বইএর পাতায় থাকে। এখানেও? এই কি তবে পরম পাওয়া? এত সুন্দর! রবীন্দ্রনাথ তবে এসব দেখেই ফিরে গিয়ে লিখেছিলেন --
                                                                 " কী হল না কী পেলে না, কে তব শোধেনি দেনা 
                                                                       সে সকলই মরীচিকা মিলাইবে পিছে।"
দূরে দেখছি রাস্তা কেউ ধুইয়ে দিয়েছে জলে। সেখানে বড় বড় গাড়ির উল্টো প্রতিবিম্ব। কাছে যাচ্ছি মিলিয়ে যাচ্ছে। দূরের পানে চেয়ে যা দেখছি, কাছে এসে হারিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে একছুটে নেমে পড়ি। অথচ গাড়ি ছুটছে জোরে, আরো জোরে। যা চাই তা পাই না। গলায় উঠে এল দুটো লাইন-- 
                                              " হৃদয়ে জ্বালায়ে বাসনার শিখা    নয়নে সাজায়ে মায়া মরীচিকা
                                                                           শুধু ঘুরে মরি মরুভূমে।"
যে দোকানে সকালে সাময়িক বিরতি নিয়েছিলাম, সেটি  জনশূন্য। কেবলমাত্র সেই ঘোড়াটি একা একা সভ্যতার চিহ্ন বহন করে চলেছে। 

বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে এলাম। একদল স্থানীয়  মেয়ে চলেছে আসওয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে।  রাস্তাঘাট ফাঁকা। রোদের তাপ বাড়ছে। ক্রুইজে ফিরে আসার ঘন্টা দুয়েক পরে নীলের জলে কোলাহল ছড়িয়ে সশব্দে আমাদের বিলাসবহুল ক্রুইজ জামিলা নোঙর তুলে ভেসে পড়ল নীলের জলে। দূরে চলে যাচ্ছে রাস্তা ঘাট, নোঙর ফেলা বিলাসবহুল সব ক্রুইজ, সাদা সাদা পাল তোলা ফেলুক্কা বোট, দূরের মরু পাহাড়টা যার মাথায় কী আছে এ বারে অন্তত জানা হল না। এ জন্মে হবেও কিনা জানি না। দূরে যাচ্ছি, ভেসে চলে যাচ্ছি নীলের জলে। এরপর দুদিন ভেসে যাব পৃথিবীর দীর্ঘতম নদীপথ ধরে  প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার বুক বেয়ে।  পৃথিবীর অনন্য এক যাত্রাপথ অপেক্ষা করছে আমার সামনে। 
                                                           " বিশাল বিশ্বে চারি দিক হতে প্রতি কণা মোরে টানিছে।
                                                                আমার দুয়ারে নিখিল জগৎ শতকোটি কর হানিছে।
                                                                        ওরে মাটি, তুই আমারে কি চাস?
                                                                          মোর তরে, জল, দু হাত বাড়াস?
                                                                নিশ্বাসে বুক পশিয়া বাতাস চির - আহ্বান আনিছে।
                                                           পর ভাবি যারে তারা বারে বারে সবাই আমারে টানিছে।"
 এ এক চমকপ্রদ ভেসে চলার গল্প। রূপকথার মত। আজ থাক। পরে হবে। অন্য কোন দিন, অন্য কোনখানে।

ঋণ: 
১. Britannica
২. Reports of Atlas Copco,Stockholm
৩. Gods of the Nile by Christine Hemschemeyer
৪. দ্বারকানাথ ঠাকুর- বিস্মৃত পথিকৃৎ --- কৃষ্ণ কৃপালনী
৫. রবীন্দ্র জীবনী ( তৃতীয় খণ্ড)-- প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়।

(মতামত লেখকের একান্তই নিজের, আজতক বাংলা এর দায়ভার নেবে না)