
রবিবার রাতে ভারতের রাত! রবিবার রাত ছিল সূর্যকুমারদের দখলে। হ্যাঁ, ক্রিকেট বিশ্বে রবিবার 'রাত দখল' করল গোটা দেশ। আহমেদাবাদে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে ম্যাচ হলেই নাকি ভারত হেরে যায়, এই কুসংস্কারকে উড়িয়ে সূর্যকুমারের নেতৃত্বে টিম ইন্ডিয়া বুঝিয়ে দিল, অপয়া স্টেডিয়াম বলে কিছু হয় না। পারফর্ম্যান্সই শেষ কথা বলে।

বস্তুত, রবিবার T20 বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতের জয়ের ভিত গড়ে দেন অভিষেক শর্মা। পুরো টুর্নামেন্টে খুব একটা বড় রান না পেলেও ফাইনালে ছন্দ খুঁজে পেলেন।

অন্যদিকে দুরন্ত ফর্মে থাকা সঞ্জু স্যামসন আরেকটি দাপুটে ইনিংস খেললেন। সেই ইনিংসই তাঁকে এনে দিল ‘প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট’এর সম্মান।

ঈশান কিশানও দুর্দান্ত ফর্ম ধরে রাখলেন ফাইনালেও। আর শেষের দিকে শিবম দুবের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে ভারত পৌঁছে গেল বিশাল ২৫৪ রানের স্কোরে। এই বিশাল লক্ষ্যই শুরুতেই নিউজিল্যান্ডকে চাপে ফেলে দেয়।

যার নির্যাস, প্রথম থেকেই মানসিক চাপে থাকা নিউজিল্যান্ড একের পর এক উইকেট খুইয়ে ফেলল। ফাইনাল মোটের উপর একতরফা হল। যেনিউজ্যান্ডকে নিয়ে এত চর্চা হচ্ছিল, ভারতের সামনে একেবারে তাসের ঘরের মতো ভেঙে গেল কিউইদের ব্যাটিং লাইন আপ।

টার্গেটটা যেমন কঠিন ছিল, তেমনই ভারতের বোলিং আক্রমণে ছিলেন যশপ্রীত বুমরাহ। ম্যাচের শুরুতেই বুমরাহ জ্বলে ওঠেন।

অন্যদিকে অক্ষর প্যাটেলের স্পিন আরও শক্ত করে দেয় ভারতের দখল। নিউজিল্যান্ড ধীরে ধীরে ম্যাচ থেকে ছিটকে যেতে থাকে।

শেষ পর্যন্ত ৯৬ রানের বড় জয়ে ভারত জিতে নেয় নিজেদের তৃতীয় T20 বিশ্বকাপ টাইটেল। নিউজিল্যান্ডের অবস্থা দেখে সেলিব্রেশন শুরুই হয়ে গিয়েছিল মাঠে। গোটা দেশেও। ম্যাচ শেষ হওয়ার জাস্ট অপেক্ষা, খেলোয়াড়, সাপোর্ট স্টাফ থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্য, সবাই নেমে পড়েন উদযাপনে।

ভারতের শিরোপা নিশ্চিত হতেই হার্দিক পান্ডিয়া, তিলক বর্মা এবং ঈশান কিশান ছুটে যান অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবের কাছে। আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে তখন শুরু হয়ে গেছে উৎসব।

ঠাসা গ্যালারির সামনে সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বে ভারত হয়ে গেল প্রথম দল, যাঁরা নিজেদের দেশের মাটিতে T20 World Cup জিতলেন। শুধু তাই নয়, নিজেদের শিরোপাও সফলভাবে ধরে রাখলেন তাঁরা।

এরপর শুরু হল বিজয় মিছিল। আবেগে ভেসে যাওয়া অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব দলের বাকি সদস্যদের নিয়ে স্টেডিয়াম জুড়ে ঘুরে ঘুরে দর্শকদের অভিনন্দন গ্রহণ করেন। হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে চারদিকে তখন উল্লাসের গর্জন।

উৎসব মানেই নাচগান, ভারতীয়রা সেই সুযোগ খুব কমই হাতছাড়া করেন। মহম্মদ সিরাজ, তিলক বর্মা, অভিষেক শর্মা এবং ঈশান কিশানও উদযাপনের মাঝে নাচে মেতে ওঠেন। কেউ কেউ ভাঙড়া নাচলেন।

চাপের মুখেও যিনি সব সময় নিজের সেরাটা দেন, সেই যশপ্রীত বুমরাহ ফাইনালেও ঠিক সেটাই করলেন। ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচের সেরা তিনি। ট্রফি জিততেই স্ত্রী সঞ্জনা গণেশন ও মা দলজিৎ বুমরাহকে নিয়ে উদযাপন করলেন সাফল্য।

ভারতের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর ট্রফি জয়ের পর জড়িয়ে ধরেন টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটার সঞ্জু স্যামসনকে। শেষ তিন ম্যাচে টানা ৮০-এর বেশি রান, যার মধ্যে ফাইনালে ৮৯। স্যামসনের এই প্রত্যাবর্তন ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গল্প।

নিউজিল্যান্ড যখন ২৫৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করছে, তখন তাঁদের একেবারে কার্যত থামিয়ে রাখলেন অর্শদীপ সিংয়ের নিখুঁত বোলিং। অন্যদিকে অক্ষর প্যাটেলের ৩ উইকেট কার্যত শেষ করে দিল কিউইদের লড়াইয়ের আশা।

ভারতের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের মর্যাদা পেয়ে স্ত্রী দেবিশা শেট্টি এবং পরিবারের সঙ্গে আনন্দের মুহূর্ত ভাগ করে নিলেন। পরিবারকে নিয়ে মাঠেই উচ্ছ্বাসে মাতলেন।

দুবারের টি২০ বিশ্বকাপজয়ী হার্দিক পান্ডিয়াও আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে বান্ধবী মাহিয়েকা শর্মার সঙ্গে উদযাপনে মেতে ওঠেন।

এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আবেগঘন গল্পগুলির একটি রিঙ্কু সিংকে ঘিরে। মাঝ টুর্নামেন্টেই বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে তাঁকে দল ছাড়তে হয়েছিল। কিন্তু ছেলের দায়িত্ব পালন করার পরই তিনি আবার দ্রুত দলে ফিরে আসেন। জানতেন, হয়তো প্রথম একাদশেও সুযোগ নাও পেতে পারেন। এই দৃঢ় মানসিকতাই ক্রিকেটের বাইরেও অনেক বড় উদাহরণ হয়ে রইল।

ভারতের উদযাপনের সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া মুহূর্তগুলির একটি দেখা যায় যখন ভারতীয় ক্রিকেটের কিংবদন্তি সুনীল গাভাস্কার সূর্যকুমার যাদবের সঙ্গে নাচে যোগ দেন। ভারত জিতলে নাচবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। আর সেই কথা রেখেছেনও।

এদিকে ভারতের কোচ গৌতম গম্ভীরের মুখেও দেখা যায় বিরল হাসি। সাধারণত খুব কমই হাসেন গম্ভীর। পদবীর সঙ্গে স্বভাবের মিল অনেক। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি এবং টি২০ বিশ্বকাপজয়ী কোচ হিসেবে তিনি এই মুহূর্ত উদযাপন করেন স্ত্রী নাতাশা জৈন এবং দুই মেয়ে আজিন ও আনাইজা গম্ভীরকে নিয়ে।