
বিষেন সিং বেদী ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ চলছে। এর মধ্যে প্রয়াত ভারতীয় দলের প্রাক্তন অধিনায়ক এবং কিংবদন্তি বাঁহাতি স্পিনার বিষেন সিং বেদী। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। ৬০-৭০ এর দশকে বেদী ছিলেন ভারতীয় দলের মুখ। তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তো ছিলই। সঙ্গে নেতৃত্ব গুণ তাঁকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। দেশের মাটির পাশাপাশি বিদেশেও তিনি স্পিনার হিসেবে সাফল্য পেয়েছিলেন। তাঁর লেগ স্পিনের ফাঁদে পড়তেন বিশ্বের তাবড় তাবড় ব্যাটসম্যানরা।
১৯৬০ থেকে ৭০ দশক ছিল বেদীর রাজত্বকাল। টিম ইন্ডিয়ার জন্য তিনি খেলেছিলেন ১২ বছর। এই সময়কালে এমন একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যার জেরে বেশ বিতর্কও হয়েছিল। তাঁকে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়।
এমনই এক ঘটনার সাক্ষী থেকেছিল ক্রিকেট বিশ্ব। একবার ক্যাপ্টেন বেদী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এক ম্যাচে গোটা টিমকে মাঠ থেকে তুলে নিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এমন ঘটনা সেই প্রথম। সেই ওয়ানডে ম্যাচে জয়ের জন্য ভারতের প্রয়োজন ছিল ১৪ বলে ২৩ রান। হাতে ছিল ৪ উইকেট। সামনে পরাজয় দেখে পাকিস্তানি দল অসততার অবলম্বন করেছিল।
হার অবধারিত বুঝে বেইমানি করে পাকিস্তান
১৯৭৮ সালের ৩ নভেম্বর। পাকিস্তানের শাহিওয়ালের জাফর আলি স্টেডিয়ামে নির্ণায়ক ম্যাচ ছিল। আম্পায়ারিংয়ের দায়িত্ব ছিলেন জাভেদ আখতার ও খিজার হায়াত। তাঁরা দুজনই ছিলেন পাকিস্তানের।
৪০ ওভারের সেই ম্যাচে প্রথম ব্যাট করে পাকিস্তান তোলে ২০৫ রান। সুনীল গাভাস্কারের অনুপস্থিতিতে ভারতের হয়ে ওপেনিং করেন চেতন চৌহান ও আংশুমান গায়কওয়াড়। দুজনেই ভালো শুরু করেন। ৪৪ রানের পার্টনারশিপ গড়েন তাঁরা। চেতন ২৩ রান করে আউট হন। তারপর ব্যাট করতে নামেন সুরিন্দর অমরনাথ। তিনি ৬২ রান করেন। গাওকোয়াড়ের সঙ্গে স্কোরকে ১৬৩-এ নিয়ে যান। ভারত ক্রমশ জয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

পাকিস্তানি আম্পায়াররা বেইমানি শুরু করেন
গায়কোয়াড়ের সঙ্গে তখন ক্রিজে গুন্ডপ্পা বিশ্বনাথ। ৩৮ তম ওভার শুরু হয়। ভারতের জয়ের জন্য মাত্র ২৩ রান প্রয়োজন ছিল। পাকিস্তানের অধিনায়ক মুশতাক মোহাম্মদ সরফরাজ নওয়াজকে বোলিং করাতে আনেন। তারপরের ঘটনা ক্রিকেটের ইতিহাসের এক কলঙ্ক। সরফরাজ নওয়াজ ওই ওভারে পরপর চারটি বাউন্সার করেন। কিন্তু আম্পায়ার একটিও ওয়াইড দেননি। পাকিস্তানের পরিকল্পনা ছিল গায়কোয়াড়কে বিব্রত করা। কারণ তিনি সেট ব্যাটসম্য়ান ছিলেন। আর বোলার ব্যাটসম্যানের থেকে অনেক দূরে বল ফেললেও আম্পায়াররা ওয়াইড দেননি।
অংশুমান গাওকোয়াড় বনাম সরফরাজ নওয়াজ
এদিকে পরপর চারটি ওয়াইড করার পরও আম্পায়ার তা না দেওয়ায় বেজায় ক্ষুব্ধ হন অংশুমান। তিনি অবাক হয়ে যান। ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বেদীও। তখনই তিনি খেলোয়াড়দের মাঠ থেকে উঠে চলে আসতে বলেন। অসহায় ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা প্যাভিলিয়নের দিকে তাকাতে থাকেন।
এরপর কী হল?
ক্যাপ্টেন বেদীর কল শুনে উভয় ব্যাটসম্যান মাঠ ছেড়ে দেন। নিয়ম অনুযায়ী পাকিস্তানকে জয়ী ঘোষণা করা হয়। ঘরের মাঠে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জেতে পাকিস্তান।
বেদীর বোলিংয়ের বিশেষত্ব
ভারতীয় বোলারদের মধ্যে বেদীকে অন্যতম দক্ষ স্পিনার বলে মনে করা হয়। তাঁর আর্ম বল ভয় পেতেন ব্যাটসম্যানরা। কোনও ব্যাটসম্যান তাঁর উপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করলেই সেই আর্ম বলকে ব্রহ্মাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন বেদী। এমন নয় যে তিনি যতবারই আর্ম বল করেছেন ততবারই সফল হয়েছেন। তবে এই বল তাকে অনেক উইকেট এনে দিয়েছে। বিশেষ করে টিম যখন বিপদে, বিপক্ষ দলের কোনও বড় পার্টনারশিপ গড়ে উঠেছে তখনই এই আর্ম বল ব্যবহার করতেন।
বেদী ১৯৬১-৬২ রঞ্জি ট্রফিতে উত্তর পঞ্জাবের হয়ে খেলেন। মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকে তিনি খেলতে শুরু করেন। আবার কাউন্টি ক্রিকেটে তিনি নর্দাম্পটনশায়ারের জন্য খেলতেন। সেখানেও সাফল্য পেয়েছিলেন।
ক্ষুরধার বলের সঙ্গে সঙ্গে বেশ ঠোঁটকাটা হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। সেজন্য বারবার বিতর্কেও জড়িয়েছেন। ইংল্যান্ডের ফাস্ট বোলার জন লিভারের ভ্যাসলিন ব্যবহার এবং ১৯৭৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভয়ঙ্কর বোলিংয়ের কারণে কিংস্টনে ভারতের দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা করার জন্যও তিনি শিরোনামে আসেন। জয়ের কাছাকাছি এসেও ইচ্ছাকৃতভাবে ম্যাচ হেরেছিলেন বেদী। বিশ্বের প্রথম অধিনায়ক তিনিই যাঁর দল জয়ের কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও ভুল আম্পায়ারিংয়ের প্রতিবাদ করে ম্যাচ হেরেছিলেন।